দারিদ্র দূরীকরণ ও চিকিৎসা সেবায় জিয়াউল হক মাইজভান্ডারী ট্রাস্টের পথচলা

এম এস আকাশ : ফটিকছড়ি

সোমবার , ২০ জানুয়ারি, ২০২০ at ৫:২১ পূর্বাহ্ণ
178

দারিদ্রতা দূরীকরণ ও গরীব দুস্থ অসহায় মানুষের চিকিৎসা সেবায় শাহানশাহ্‌ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভান্ডারী ট্রাস্ট অনবধ্য রেখে যাচ্ছে। গ্রামের নিবৃত পল্লীর গরীব মানুষ যাতে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা পায়, সে বিষয়ে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে ট্রাস্ট পরিচালিত দারিদ্র বিমোচন প্রকল্পসমূহ।
জানা গেছে, “সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা প্রকল্প” এর আওতায় চট্টগ্রাম শহর ছাড়াও শহরের বাইরে গ্রামঞ্চলে ৭টি স্থায়ী দাতব্য চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করেছে শাহানশাহ্‌ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভা-ারী (কঃ) ট্রাস্ট। এর মধ্যে ফটিকছড়িতে তিনটি এবং রাঙ্গুনিয়ায় একটি ও নগরীতে তিনটি চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এসব চিকিৎসা কেন্দ্র থেকে সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে অভিজ্ঞ চিকিৎসক দ্বারা বিনামূল্যে ওষুধসহ চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়। গত কয়েক বছর ধরে পর্যায়ক্রমে প্রতিষ্ঠিত এসব চিকিৎসা কেন্দ্রে শহর গ্রামের প্রায় ৫৫ হাজার মানুষ বিনামূল্যে চিকিৎসা পেয়েছেন। ভবিষ্যতে দাতব্য চিকিৎসা কেন্দ্র আরও বাড়ানোসহ একটি স্থায়ী হাসপাতাল স্থাপন করে আরও বৃহৎ পরিসরে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবায় ভূমিকা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ট্রাস্টের অধীনে শহর ও গ্রামে ৭টি দাতব্য চিকিৎসা কেন্দ্র রয়েছে। যেখানে গরীব-অসহায় রোগীদের বিনামূল্যে ওষুধসহ চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। মানসম্মত চিকিৎসা প্রদানের লক্ষ্যে একদিনে একবারে সর্বোচ্চ ২০-২৫ জন রোগী দেখা হয় এবং চিকিৎসকের দেওয়া ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী দেশের নামী কোম্পানির ওষুধ দেওয়া হয়।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, ফটিকছড়ির মাইজভান্ডার দরবার শরীফ সংলগ্ন “হোসাইনী দাতব্য চিকিৎসালয় ও খৎনা সেন্টারে” চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ জিয়াউল হাসান এবং গাইনী এন্ড অবস বিভাগের নারী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. ফাতেমা ইসলাম চিকিৎসা সেবা দেন। এখানে চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি সুবিধাঞ্চিত পরিবারের কিশোরদের খৎনা ও কিশোরীদের নাক ফুড়ানো ও কর্ণ ছেদন করানো হয়। সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে ২জন চিকিৎসক নিয়মিত এই সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। ফটিকছড়ির প্রত্যন্ত এলাকার একটি গ্রাম আজিমপুর। এই গ্রামেরই সত্তরোর্ধ নারী আমেনা বেগম। লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটেন। আমেনার বাড়ির পাশেই শাহানশাহ হক ভাণ্ডারী দাতব্য চিকিৎসালয়। শরীরে জ্বর নিয়ে চিকিৎসালয়ে ছুটে এসেছেন তিনি।
ডাক্তার আমেনাকে ভাল করে দেখেছেন, ওষুধ দিয়েছেন। শাহানশাহ হক ভাণ্ডারী দাতব্য চিকিৎসালয়ে শহরের বড় ডাক্তারকে দেখাতে পেরে বেজায় খুশি আমেনা। বিনা পয়সায় ওষুধ পাওয়ায় খুশি যেন দ্বিগুণ হয়েছে। ফটিকছড়ি উপজেলার আজিমপুরে প্রতিষ্ঠিত শাহানশাহ হক ভান্ডারী দাতব্য চিকিৎসালয়ে সপ্তাহের প্রতি বৃহস্পতিবার দুপুর ৩টা থেকে সেবা দেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. মিজানুর রহমান। ফটিকছড়ির কাঞ্চন নগরে “সৈয়দ আবদুল গণি কাঞ্চনপুরী (রঃ) দাতব্য চিকিৎসালয়ে প্রতি শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে সেবা দেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. রোবায়েত হাসান। এটিও ফটিকছড়ির প্রত্যন্ত এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় সাধারণ রোগীদের ভরসাস্থলে পরিণত হয়েছে এই কেন্দ্র। এসব চিকিৎসা কেন্দ্রে রোগীরা বিনামূল্যে যেসব সেবা পেয়ে থাকেন তা হচ্ছে (১) এখানে মানসম্মত ওষুধ দেওয়া হয় (২) দরিদ্র পরিবারের কিশোরদের খৎনা ও কিশোরীদের নাক ফুড়ানো ও কর্ণ ছেদ করা হয় (৩) পঙ্গু রোগীদের কৃত্রিম পা লাগানো হয় (৪) শারীরিক প্রতিবন্ধীদের হুইল চেয়ার প্রদান করা হয় (৫) চিকিৎসা সেবা ব্যয়ে অক্ষম রোগীদের চিকিৎসা সহায়তা প্রদান করা হয় । রাঙ্গুনিয়ায় “সৈয়দ ছালেকুর রহমান শাহ্‌ (রঃ) দাতব্য চিকিৎসালয়” কেন্দ্রে সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার বিকাল ৩টা থেকে সেবা দেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক মোহাম্মদ তারেক-উল-কাদের। এই কেন্দ্রটি রাঙ্গুনিয়ার প্রত্যন্ত এলাকায় অবস্থিত। তাই প্রচুর রোগীর ভিড় হয় এই কেন্দ্রে।
কেন্দ্রের প্রত্যেক চিকিৎসকের সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা এসব কেন্দ্রে চিকিৎসা সেবা দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। কারণ গতানুগতিক ফ্রি চিকিৎসা সেবার বাইরে গিয়ে এসব কেন্দ্র থেকে প্রকৃত সেবাটা দিতে পারেন তারা। যেখানে একটি ফ্রি চিকিৎসা কেন্দ্রে একজন চিকিৎসক একবারে শতাধিক রোগী দেখেন সেখানে এই স্থায়ী ফ্রি চিকিৎসা কেন্দ্র থেকে একবারে রোগী দেখা হয় মাত্র ২০-২৫ জন। তাই সময় নিয়ে রোগীদের ভালভাবে সেবা দিতে পারেন বলে জানান চিকিৎসকরা। দাতব্য চিকিৎসা কেন্দ্রে আসা সাধারণ রোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তারাও এসব কেন্দ্রে মানসম্মত চিকিৎসা সেবা পেয়ে সন্তুষ্ট। কারণ বিনামূল্যে চিকিৎসা কার্যক্রম হলেও চিকিৎসকরা রোগীদের সাথে অত্যন্ত ভাল ব্যবহার করেন, সময় নিয়ে চিকিৎসা করেন। স্থায়ী চিকিৎসা কেন্দ্র হওয়ায় একজন রোগী একবার চিকিৎসা নিয়ে তার শারীরিক উন্নতি-অবনতির উপর ভিত্তি করে আবারও একই চিকিৎসকের কাছে এসে সেবা নেওয়ার সুযোগ পান। এছাড়া এসব কেন্দ্রে চিকিৎসার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সব ওষুধও বিনামূল্যে দেওয়া হয় বলে রোগীদের টাকা-পয়সা বা অন্য কোন ভোগান্তিতে পড়তে হয় না। ভাল চিকিৎসার কারণে রোগীরা আশেপাশের সাধারণ জনসাধারণ ও পরিবারের স্বজনদের এই কেন্দ্রে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
ট্রাস্টের দারিদ্র বিমোচন প্রকল্প পরিচালনা পর্ষদের সাধারণ সম্পাদক আবদুল হালিম আল মাসুদ বলেন, শাহানশাহ্‌ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভান্ডারী ট্রাস্ট পরিচালিত দারিদ্র বিমোচন প্রকল্প (যাকাত তহবিল) থেকে এসব কেন্দ্রের প্রয়োজনীয় অর্থের যোগান দেওয়া হয়। ৭টি দাতব্য চিকিৎসা কেন্দ্র থেকে গত কয়েক বছরে সাড়ে ৫৫ হাজার দরিদ্র মানুষ সরাসরি উপকৃত হয়েছেন। প্রতিটি চিকিৎসা কেন্দ্রে সপ্তাহের নির্দিষ্ট একটি দিনে চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন। নিয়মিত চিকিৎসার বাইরে গিয়ে ৪০০ জন শিশুর খৎনা, ৪ হাজারের বেশি কন্যা শিশুর কর্ণ-ছেদন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও দাতব্য চিকিৎসা কেন্দ্র বাড়ানোসহ একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করছে হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (কঃ) ট্রাস্ট।