দল শোধন গ্যাসবেলুন ট্রাজেডি

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ৫ নভেম্বর, ২০১৯ at ১০:৩০ পূর্বাহ্ণ
8

সরকারি দল আওয়ামী লীগে শুদ্ধি অভিযানে চলছে। ডিসেম্বরে দলের কেন্দ্রীয় কাউন্সিল। এর মধ্যে গত অক্টোবর থেকে আকস্মিকভাবে শুরু হয় ক্যাসিনো বিরোধী অভিযান। শুরুতে ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার পরিচালিত ফকিরাপুল ইয়ংম্যান্স ক্লাব থেকে ক্যাসিনো সরন্‌জামসহ আটক হয় শতাধিক। দেশের ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়া ক্লাবগুলোতে রাতে তাস খেলা ও তাসের জুয়া বহুবছর ধরে চলে আসছে। ক্লাবগুলোর নিজস্ব ক্যাম্প বা কার্যালয়ে কর্মকর্তা এবং সিনিয়র খেলোয়াড়েরা নিয়মিত এতে অংশ নেন। বলতে গেলে এটা প্রচলিত ক্লাব কালচারে পরিণত হয়। এ’ নিয়ে কখনো হৈ চৈ আপত্তির রেকর্ড নেই। ক্যাসিনো শব্দটি বাংলাদেশের সংস্কৃতির সাথে যায়না। এটা প্রতিবেশী ভারতের বড় নগরী, গোয়াসহ কিছু রিসোর্টে বিশেষ করে নেপালে বহুল পরিচিত সংস্কৃতি। তা’ছাড়া ইউরোপ- আমেরিকার বাইরে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইনসহ এশিয়ার বহুদেশে ক্যাসিনো, নাইটক্লাব, ডিস্কো ক্লাব,পাব ব্যবসা জমজমাট। বিদেশি পর্যটকদের কাছে এর আকর্ষণও প্রচুর। মালয়েশিয়ার গেন্টিং হাইল্যান্ডতো যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাসকেও পাল্লা দিচ্ছে। এখানে জুয়ার বোর্ডে রাতে বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হাতবদলের কথা শোনা যায়।
ফকিরাপুল ইয়ংম্যান্স ক্লাবে খালেদ মাহমুদের ক্যাসিনো ব্যবসা ধরা পড়ার আগে গত সেপ্টেম্বর মাসেও বাংলাদেশের মানুষ ক্যাসিনো ব্যবসা সম্পর্কে কিছু জানতোনা। এরপরতো বলতে গেলে একেবারে হৈ হৈ, রৈ রৈ কান্ড! পুরো অক্টোবরজুড়ে ক্যাসিনো ও অনলাইন ক্যাসিনো ব্যবসার হাজার হাজার কোটি টাকা দেশে-বিদেশে লেনদেনের মুখ খুলে যায়। গ্রেফতার হয় সরকারি যুব ও অন্য সংগঠনের বহু বড় বড় নেতা। সাথে যুবলীগ নেতা জি কে শামীমের সরকারি বড় বড় কাজের অবিশ্বাস্য টেন্ডার সিন্ডিকেটও আলোতে আসে। দেখা যায়, আটক নেতাদের প্রায় সবাই অন্য দল থেকে সরকারি দল বা ভ্রাতৃ সংগঠনে বড় নেতাদের সহযোগিতায় পদ দখল করে অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসা, টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজির সাথে যুক্ত হয়ে পুঁটি থেকে হাঙ্গর-কুমিরে পরিনত হয়েছে। অবশ্য ঢাকা দক্ষিন যুবলীগ সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাটের মত কিছু ‘অরিজিনাল’ নেতাও এতে যুক্ত হয়। বিষয়টা এতোবেশি আলোচিত যে, দেশের সব মিডিয়ায় বেশ কিছুদিন ভাসতে থাকে ক্যাসিনো এবং সংশ্লিষ্টদের কান্ড কারখানা। মাঝখানে বুয়েটে আরবার হত্যাকান্ড ও ভোলায় ফেস বুকে সামপ্রদায়িক উস্কানীমূলক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে জনতা-পুলিশ সংঘর্ষে ৪ নিহত ও পুলিশসহ শতাধিক আহতের ঘটনায় পরিস্থিতির সূচিমুখ ক’দিনের জন্য ঘুরে যায়। এসব পরিস্থিতি সামলে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও দলনেত্রী শেখ হাসিনা দলীয় শুদ্ধি অভিযান আরো জোরদার করেন। এটা সত্য,আওয়ামী লীগ টানা প্রায় ১১ বছর ক্ষমতায় থাকায় দল আর সরকার প্রায় পরস্পরের মধ্যে লীন হয়ে গেছে। রাজপথে শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকায় বেশির ভাগ নেতা দ্রুততম সময়ে নিজের ভাগ্য গড়ায় মনোযোগ দিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর নীতি-আদর্শ বক্তৃতা ভাষনের অলঙ্কার হিসাবে প্রয়োগ হলেও দলটি মেদবহুল ব্যক্তি স্বার্থনিষ্ঠ দলে পরিনত হয়েছে। তৃণমূল থেকে কেন্দ্র সবখানেই পদ ও স্বার্থের সংঘাত। অসংখ্য উপদলেও বিভক্ত। উপদলগুলো শক্তিবৃদ্ধি করতে অন্য দলের চিহ্নিতদের দলে ভিড়িয়ে নিজের পক্ষ ভারী করছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে নমুনা হিসাবে নিলে এর একটা প্রামাণ্য চিত্র পাওয়া যায়। চট্টগ্রাম নগর ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ প্রধান দুটো ধারায় বিভক্ত। একটি সিটি মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীনের এবং অন্যটি শিক্ষা উপমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের অনুসারী বলে পরিচিত। চট্টগ্রামে এই বিভক্তি বহুদিনের। সাবেক মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী ইন্তেকাল করার পর তাঁর অনুসারীরা এখন নওফেলের সাথে। বিশ্ববিদ্যালয়ে দু’জনের অনুসারি গ্রুপগুলো আবার ডজনের বেশি অণু গ্রুপে বিভক্ত। নিয়মিতই অণু গ্রুপগুলো নিজেরা নানা অজুহাতে মারপিট, খুনোখুনিতে জড়িয়ে যায়। যা নিয়মিত মিডিয়ায় আসছে। ছাত্রলীগ, যুবলীগের মূল নেতৃত্ব শোধনের পর শীর্ষ নেত্রী মূলদল শুদ্ধ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এরই আওতায় কয়েকশ’ দুর্নীতিবাজ নেতা, ব্যবসায়ী, পেশাজীবির ব্যাঙ্ক হিসাব তলব হয়েছে দুদকে। অর্ধ শতাধিক নেতা, এমপি, ব্যবসায়ীর বিদেশ গমন নিষিদ্ধ হয়েছে। দল থেকে পরজীবি বহিরাগত বালাই নিস্কাশনে ১৫০০ জনের তালিকা দায়িত্বশীলদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। শীর্ষনেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই বিশেষ এজেন্সির সহযোগিতায় একাই দল শুদ্ধির কঠিন দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। দলের অন্য কোন বড় নেতা এমনকী সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকেও এর সাথে যুক্ত করেননি। তিনি আগেই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘আমি ছাড়া দলের সবাইকে কেনা যায়’! কত বেশি আস্থাহীনতার পর একজন শীর্ষনেত্রী নিজ দলের নেতাদের প্রতি এমন বাক্য উচ্চারণ করতে পারেন?
আসলে আওয়ামী লীগ আদর্শিক ট্র্যাক থেকে অনেক দূরে পিছলে পড়েছে। লোভ, ভোগ, মোহ, ক্ষমতার ভাপ, বেশুমার সম্পদ অর্জন বহু নেতার নেশায় পরিণত হয়েছে। নিজের অনুগত ও শক্তি বাড়াতে এরা ইচ্ছেমত ভিন নীতি ও আদর্শের লোকজন ও কুখ্যাত, মাদক ব্যবসায়ী ও মাস্তানদের দলে ভিড়াচ্ছে। তৃণমূলে এই ব্যাধি আরো ভয়ঙ্কর। ইউনিয়ন, উপজেলা নির্বাচনে আগন্তুকদের নৌকা প্রতীক তুলে দিচ্ছে বা মূল প্রার্থীকে হারিয়ে দিয়ে নিজ পছন্দের বিদ্রোহীকে জিতিয়ে আনছে। এত অসঙ্গতি গোঁজামিল, লোভ, ভোগ, দুর্নীতি, অনিয়মের হিমালয় তিনি একা কীভাবে গুঁড়িয়ে দেবেন, জানিনা! দল ক্ষমতায় আসার পরপরই তৃণমূল স্তর থেকে শীর্ষ পর্যন্ত আদর্শিক স্কুলিং এবং কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা থাকলে এত পরজীবি বিষাক্ত লতাগুল্ম আওয়ামী লীগের মত আদর্শিক রাজনীতির মহীরুহের কান্ড আঁকড়ে লতিয়ে উঠতে পারতোনা। তবুও বিশ্বাস, বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসাবে সত্য ও ন্যায়ের যুদ্ধে শেখ হাসিনা নিশ্চিতই জিতবেন। দলকে আবারো আদর্শিক এবং গণমানুষের কল্যাণের মহাসড়কে তুলে আনতে পারবেন।
এমন ট্রাজেডি আর নয়! ঢাকার রুপনগরের বস্তিতে গ্যাস বেলুনের সিলিন্ডার বিস্ফোরণে বড় করুণভাবে মৃত্যু হলো ৮ জনের। আহতের সংখ্যা ২০ জনের বেশি। আফগানিস্তান, পাকিস্তানের জঙ্গিদের আত্মঘাতি বোমা হামলার ঘটনাও এই ট্রাজেডিকে হার মানায়। শিশু- কিশোরের ছিন্নভিন্ন দেহ, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, রক্তস্রোত দেখে পাষাণ হ্নদয়ও গলে যায়। হায়, ভাগ্যবিড়ম্বিত বেলুনওয়ালাতো জানেননা, তিনি নিজেই মানববোমা! পুরানো ও বাতিল সিলিন্ডারে গ্যাস ভরে বেলুন বিক্রি করে পেট চালানোর মত বিপজ্জনক পেশা যে এতো ভয়ঙ্কর, তিনি কীভাবে জানবেন? আগেও এমন ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু ব্যবসা বা জীর্ণ সিলিন্ডার বদল হয়নি। জীবিকার টানে গরীব মানুষদের মৃত্যু ঝুঁকির দিকে টেনে নিচ্ছে। অকালে ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যাচ্ছে বহু কচিপ্রাণ। বিস্ফোরণে বেলুনওয়ালা আহত হলেও ঘটনা ব্যাতিক্রম। বাকি সব বিস্ফোরণে প্রথম শিকার হয়েছেন বিক্রেতা। আশা করি, আর সময়ক্ষেপ হবেনা, গ্যাসবেলুনের প্রতি আকর্ষণ সব শিশুর! নিরাপদ সিলিন্ডার ব্যবহারের বিষয়টা নিশ্চিত করা গেলে ভয়াল বোমা থেকে বাঁচবে বিক্রেতাসহ অসংখ্য শিশু- কিশোর। ভাবুনতো, ট্রাজেডির শিকারেরা আপনার আমার আপনজন হলে কেমন লাগতো? অতএব—!

x