দক্ষ মানব সম্পদ উন্নত দেশের মূল চালিকাশক্তি

বৃহস্পতিবার , ২৫ অক্টোবর, ২০১৮ at ৫:৫৬ পূর্বাহ্ণ
130

মানবসম্পদ সূচকে ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে আছে। বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত এই তথ্যটি শুধু চমকপ্রদ নয়, আনন্দদায়ক। শিশুর শিক্ষার সুযোগ, স্বাস্থ্যসেবা ও টিকে থাকার সক্ষমতা বিচার করে তার ভবিষ্যৎ উৎপাদনশীলতা ও আয় সম্ভাবনার একটি ধারণা এ সূচকের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। মানবসম্পদ সূচকে এ অগ্রগতি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে এখন যাদের বয়স ১৫ বছর, তাদের মধ্যে ৮৭ শতাংশের প্রত্যাশিত আয়ু হবে ৬০ বছরের বেশি। এদিক দিয়ে বাংলাদেশ ও শ্রীলংকা আছে একই কাতারে। ভারতে এই হার ৮৩ শতাংশ, পাকিস্তানে ৮৪ শতাংশ, নেপালে ৮৫ শতাংশ। বালিতে চলমান বিশ্ব ব্যাংক-আইএমএফ বার্ষিক সম্মেলনে এই ‘মানবসম্পদ সূচক’ প্রকাশ করে বিশ্বব্যাংক। অন্যদিকে, বিশ্বব্যাংকের দ্য চেঞ্জিং ওয়েলথ অব ন্যাশন-২০১৮ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মাথাপিছু সম্পদের পরিমাণ ১২ হাজার ৭১৪ মার্কিন ডলার বা ১০ লাখ টাকা। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে এর মধ্যে ব্যক্তির উৎপাদিত সম্পদের বাজারমূল্য ৩ হাজার ৪৩৪ ডলার। প্রাকৃতিক সম্পদের মাথাপিছু মূল্য ২ হাজার ২৩৪ ডলার। বাংলাদেশে যে পরিমাণ চাষযোগ্য জমি রয়েছে তার আর্থিক মূল্য মাথাপিছু ১ হাজার ৫০১ ডলার। আর মানবসম্পদের মূল্য ধরা হয়েছে মাথাপিছু ৭ হাজার ১৭০ ডলার। ১৯৯৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ১৪১টি দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ, মানবসম্পদ, উৎপাদিত সম্পদ ও বিদেশে থাকা সম্পদের তথ্য পর্যালোচনা করে প্রণীত বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী মোট সম্পদের বড় অংশ এখন মানবসম্পদ। আর দরিদ্র দেশগুলোর অর্ধেকের বেশি সম্পদের উৎস প্রকৃতি। অর্থনৈতিক উন্নতির ধারা অব্যাহত রাখতে মানবসম্পদ ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে। ১৯৯৫ সাল থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে দুনিয়াজুড়ে সম্পদের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ওই দুই দশকে মধ্য আয়ের দেশগুলোর দ্রুত উন্নতি হয়েছে। বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলোর উন্নতি ছিল উল্লেখ করার মতো। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, ধনী দরিদ্রের সম্পদের ব্যবধান অনেক বেড়েছে। অর্থনৈতিক উন্নতিতে প্রাকৃতিক সম্পদে একক নির্ভরতার দিন ফুরিয়ে আসছে।
বাংলাদেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের ভূয়সী প্রশংসা করে থাকেন নোবেল বিজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনও। নারীশিক্ষার উন্নয়নে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে আদর্শ বলে তিনি উল্লেখ করেছেন তাঁর লেখায়। বাংলাদেশ নবজাতক ও শিশুমৃত্যুর হার কমাতে অনেকটা সফল হলেও বিদ্যালয়ে ঝরে পড়ার হার তুলনামূলক বেশি। এটিকে শূন্যে নিয়ে আসার উদ্যোগ নিতে হবে। কেননা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলেও তার সুবিধা পাচ্ছেন মুষ্টিমেয় মানুষ। দারিদ্র্যের হার কমানোর গতি বাড়াতে হবে।
মোট কথা, মানবসম্পদ উন্নয়নে আমরা যেটুকু সাফল্য দেখতে পাই, তার মূলে রয়েছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে সরকারের বিনিয়োগ বৃদ্ধি। আর এই বিষয়টিকে আমাদের গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন এই কারণে যে, মানব সম্পদ উন্নয়ন ছাড়া আমরা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জন করতে পারব না। এজন্য এই দুইখাতে আমাদের জিডিপির নির্দিষ্ট ও প্রত্যাশিত অংশ (শিক্ষাখাতে ন্যূনতম তিন হতে চার এবং স্বাস্থ্যখাতে দুই শতাংশ) ব্যয় করতে হবে। এজন্য গড়ে তুলতে হবে সর্বজনীন শিক্ষা ও চিকিৎসাব্যবস্থা। এই সরকারের আমলে শিক্ষা ও চিকিৎসায় বেসরকারি খাতকে উজ্জীবিত করবার পাশাপাশি সরকারিকরণ বাড়ছে যা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে হলে দক্ষ মানব সম্পদ গড়ে তোলা অত্যাবশ্যক। উন্নত দেশের এটাই মূল চালিকাশক্তি। ব্যক্তিগত জীবনেও উন্নতির জন্য স্ব-স্ব ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জন একান্ত প্রয়োজন। তবে দক্ষতা রাতারাতি অর্জন করা সম্ভব নয়। মূলত, উন্নত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ এবং কর্মপরিবেশের উন্নয়নের মাধ্যমে এর অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।
বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে গড় আয়ও। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাতেও যে আমরা মোটামুটি সাফল্য অর্জন করেছি, বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনই তার প্রমাণ। কিন্তু এখানেই থেমে থাকলে চলবে না। আমাদের আরও এগিয়ে যেতে হবে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের এই সফলতার সঙ্গে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে পারলে উন্নয়নের গতি আরো বৃদ্ধি পাবে নিঃসন্দেহে।

x