দক্ষ কর্মী পাঠানোর পাশাপাশি অবৈধপথে বিদেশে যাওয়া ঠেকাতে তদারকি প্রয়োজন

মঙ্গলবার , ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ at ৫:৪২ পূর্বাহ্ণ

আমাদের জন্য সুখের খবর যে বিদেশে শ্রমবাজারে সুদিন ফিরছে। গত ৮ ফেব্রুয়ারি দৈনিক আজাদীর প্রথম পাতায় গুরুত্বের সঙ্গে খবরটি প্রকাশিত হলো। এতে বলা হয়েছে, অবশেষে বিদেশে শ্রমবাজারে সুদিন ফিরছে। দীর্ঘ নয় মাস বন্ধ থাকার পর চালু হচ্ছে কাতারের শ্রমবাজার। আগামী ২০২২ বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ থেকে দক্ষ শ্রমিক নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কাতার। তবে কাতার অনলাইন নিবন্ধন ছাড়া শ্রমিক নিবে না বলে জানিয়েছে। সমপ্রতি কাতারের রাজধানী দোহায় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের সাথে যৌথ কারিগরি কমিটির বৈঠকে কাতার সরকারের পক্ষ থেকে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। ইতোমধ্যে দেশের তিন জেলায় বিদেশে যেতে ইচ্ছুক দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকদের নিবন্ধন শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, কাতার ছাড়াও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালু হওয়ারও খুব ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। দেশটি ইতোমধ্যেই শ্রমবাজার চালু করার ইঙ্গিত দিয়েছে। আগামী ২৩ ফেব্রুয়ারি মালয়েশিয়া থেকে উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল ঢাকায় বৈঠক করার কথা রয়েছে। সব কিছু ঠিক থাকলে দীর্ঘ ১৬ মাস বন্ধ থাকার পর মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠাতে পারবে বাংলাদেশ। এর বাইরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শ্রমবাজার চালু করতে দীর্ঘ সময় দ্বিপাক্ষীয় আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। ইতোমধ্যে অনেকবার এই ইস্যুতে আলোচনাও হয়েছে।
এখানে উল্লেখ্য, এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে বাংলাদেশের অন্যতম শ্রমবাজার মালয়েশিয়া। কিছু রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে লোক পাঠানোর কারণে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেয়া বন্ধ করে দিয়েছে দেশটির সরকার। তবে আলোচনার মাধ্যমে বাজারটি উন্মুক্ত করতে সম্মত হয়েছে দেশটি। কম অভিবাসন ব্যয়ে এবং অধিক সংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সিকে সম্পৃক্ত করাসহ বিভিন্ন বিষয় চূড়ান্ত করতে নভেম্বরে জয়েন্ট ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। হঠাৎ করেই বৈঠক স্থগিত করে মালয়েশিয়া। ফলে আবারও অনিশ্চয়তায় পড়ে যায় দেশটির শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়া। তবে আজাদীর খবরে জানানো হয়েছে, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে শিগগিরই সুখবর আসবে। মালয়েশিয়ার বাজার উন্মুক্ত হলে প্রায় তিন লাখ কর্মী পাঠানো সম্ভব হবে। দেশটির উন্নয়নের জন্য তাদের অনেক কর্মী প্রয়োজন। মালয়েশিয়াতে বাংলাদেশি কর্মীর চাহিদা অনেক বেশি। এ বাজারে তিন-চার লাখ কর্মী পাঠানো সম্ভব হলে মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে যে ঘাটতি আছে তা কিছুটা হলেও পূরণ হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একসময় জনশক্তি রপ্তানি বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় উপাদান ছিল। দেশের অর্থনীতির চাকা সক্রিয় ও সচল রাখতে এখনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। একসময় মালয়েশিয়ায় ‘জি-টু-জি’ অর্থাৎ সরকারের সঙ্গে সরকারের বোঝাপড়ার ভিত্তিতে জনশক্তি রপ্তানি হয়েছে। কিন্তু এর বাইরেও অনেকে অবৈধ পথে বিভিন্ন দেশে গিয়েছে। অনেকে বৈধ পথে বিদেশে গিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের পর অবৈধ হয়ে পড়েছে। প্রবাসে শ্রম বিক্রি করতে যাওয়া জনশক্তির একটি বড় অংশ অদক্ষ। আমরা দক্ষ জনশক্তি সেভাবে বিদেশে পাঠাতে পারিনি। আবার বিদেশের বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি করতে পারিনি। ফলে আমাদের পাঠানো জনশক্তির একটি বড় অংশ যে অর্থ খরচ করে বিদেশে যায়, তাদের বিনিয়োগ তুলতেই চুক্তির সময় চলে যায়। বাধ্য হয়েই অনেকে বেছে নেয় অবৈধ পথ। আবার অসৎ ব্যবসায়ীদের খপ্পরে পড়ে অনেকেই অবৈধ পথে পা বাড়িয়ে সেখানে গিয়ে ধরা পড়ে। অনেকেই মানবপাচারের শিকার হয়। অন্যদিকে বড় দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে সৌদি আরব থেকে কর্মীদের ফিরে আসার খবর। মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটি ছিল বাংলাদেশের জনশক্তির সবচেয়ে বড় বাজার। এ পর্যন্ত ১৬ হাজারের বেশি বাংলাদেশি শ্রমিককে সৌদি আরব থেকে ফেরত আসতে হয়েছে।
সরকারি হিসাবে, ১৯৭৬ সালের পর থেকে বিশ্বের প্রায় ১৭০টি দেশে বাংলাদেশী কর্মী গেছে প্রায় এক কোটি ৩০ হাজার। তবে এদের অধিকাংশই কাজ করেছেন সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, ওমান, কাতার ও সিঙ্গাপুরে। সৌদি আরব, জর্ডান ও লেবাননের মতো ৬-৭টি দেশেই সীমাবদ্ধ নারী কর্মীদের বাজার। তবে নির্যাতিত হয়ে সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরব থেকে বার বার নারী কর্মীরা ফিরে আসায় গত তিন বছরে কর্মী যাওয়ার হার অর্ধেকে নেমে এসেছে। অপরদিকে গত চার বছর ধরে সৌদি আরব ও এক বছর ধরে মালয়েশিয়ায় কর্মী যাওয়া বন্ধ থাকায় বাংলাদেশের শ্রমবাজার ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে। নতুন শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মী পাঠাতে আধুনিক প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তোলার পাশাপাশি অবৈধ পথে বিদেশে যাওয়া ঠেকাতে কঠোর তদারকি প্রয়োজন।

x