থানা হেডকোয়ার্টার অপারেশন ছিল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ

যুদ্ধদিনের স্মৃতি

কল্যাণ বড়ুয়া মুক্তা, বাঁশখালী

বুধবার , ১১ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৪:৪০ পূর্বাহ্ণ

বাঙালির জীবনে সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল ঘটনা স্বাধীনতা সংগ্রাম। একাত্তর সালে ডা. আবু ইউসুফ চৌধুরী এমবিবিএস ৫ম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে তিনি সাবরুম হয়ে ভারত চলে যান। এক সপ্তাহ পর ফিরে আসেন। পরবর্তীতে আবার গিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধকালীন বিএলএফ কমান্ডার হিসেবে বাঁশখালী ও কুতুবদিয়ায় সাহসিকতার সাথে যুদ্ধে অংশ নেন এবং অসংখ্য সফল অপারেশন করেন।

আবু ইউসুফ আজাদীকে বলেন, সাধনপুরের সাহেবের হাট ফরেস্ট অফিস আক্রমণ এবং গুনাগরী খাসমহল জ্বালিয়ে দেওয়ার পর আমার সাথীদের সাহস ও আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে যায়। সীমিত অস্ত্র দিয়ে আমরা গুনাগরী খাসমহল আক্রমণ করি এবং সবকিছু জ্বালিয়ে দিই। চৌরাস্তায় প্রকাশ্যে বাজারে এই আক্রমণ মুক্তিযোদ্ধাদের যেমন সাহসী করে তোলে তেমনি স্থানীয় জনগণের মধ্যে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে।

আমরা যা করি সেটা ১০ গুণ বেশি হয়ে প্রচার হতে থাকে। মানিক, ইছহাক, আহমদ মিয়া, আহমদ হোছন, ছমিউদ্দিন, মমতাজ, সরোয়ার, রশিদ ও সোলেমান আরো বড় ধরনের আক্রমণ করার জন্য অস্থির হয়ে পড়ে।

বাঁশখালীতে পরবর্তী আক্রমণের জন্য থানা হেডকোয়ার্টার, সিও (ডেব অফিস), সিও (রেভিনিউ অফিস), টেলিফোন এঙচেঞ্জ এবং বাঁশখালী থানাকে টার্গেট করি। আমাদের অস্ত্র সীমিত, তাই থানা আক্রমণ বিলম্বিত করে প্রথমে থানা হেডকোয়ার্টার আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নিলাম। এই আক্রমণ সফল হলে এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উভয় ধরনের ফলাফল সম্বন্ধে অবহিত ছিলাম। তাই যেকোনো কিছুর বিনিময়ে হেডকোয়ার্টার ধ্বংস করার পরিকল্পনা শুরু করলাম। প্রথমে আমরা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র যোগাড়ে সচেষ্ট হলাম। খবর পেলাম, আনোয়ারায় বড় ধরনের অস্ত্র বিক্রি হবে। কদমরসুল গিয়ে স্থানীয় যুবক নওশা মিঞাকে নিয়ে অস্ত্রের জন্য ছমিউদ্দিনকে আনোয়ারা পাঠিয়ে শঙ্খ নদীর দক্ষিণ পাড়ে কদমরসুল গ্রামে সারা রাত অপেক্ষা করলাম। কিন্তু অস্ত্র আসে না। অস্ত্রের জন্য পাঠানো দুই সহকর্মীর একজনও আসে না।

বিএলএফ কমান্ডার আবু ইউসুফ বলেন, ভোরে খবর পেলাম পাকিস্তানি দালাল জউল্লাহ (জালাল) একজনকে ধরে পুলিশে দিয়েছে এবং ছমিউদ্দীন পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। এভাবে অস্ত্র কেনার প্রথম চেষ্টা ব্যর্থ হলো। কিন্তু অপারেশন এইচকিউ সফল করতে আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। আরো কিছু ৩০৩ রাইফেল এবং একটি অদ্ভুদ ধরনের অস্ত্র যোগাড় হলো, যার একটি মাত্র গুলি ছিল। গুলিটাও আকারে বেশ বড়। এটি ছিল ফ্লেয়ার গান। শত্রুপক্ষের অবস্থান আলোকিত করার জন্য ব্যবহৃত হয়। শত্রুপক্ষকে মানসিকভাবে দুর্বল করার জন্য তাদের মধ্যে আমাদের সংখ্যা এবং অস্ত্র সম্বন্ধে ভয়ভীতির মধ্যে রাখার জন্য এটি নেওয়ার সিদ্ধান্ত হলো। সাথীদের সবাইকে নিয়ে আক্রমণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলাম। সবাই তৈরি। অগ্রবর্তী দল নিয়ে আমি রওনা দিলাম। কাথরিয়ায় গিয়ে মাহমুদুল হক (চেয়ারম্যান) সাহেবকেও নিলাম। তিনি আমাকে জলদী মিঞার বাজারের কাছে পৌঁছে দেন। ওইদিন বাজার বার। বাজারের মধ্য দিয়ে আমি নুরুল কবিরের নানার বাড়িতে চলে গেলাম। থানা হেডকোয়ার্টারের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় সবকিছু রেকি করে গেলাম। নুরুল কবির সাহেব তার বাড়ি আমাদের জন্য নিরাপদ নয় ভেবে পাহাড়ের গভীর জঙ্গলে তার খামার বাড়িতে আমাদের থাকাখাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন।

ছমিউদ্দীন, আলী হোসেন, ইসহাক, মানিক, মমতাজ, সোলায়মান, আহমদ মিয়া ও সিরাজসহ আরো কয়েকজন আমার সাথে আগেই ছিল। জলদীতে হেডকোয়ার্টার আক্রমণ করতে গিয়ে আরেক আশ্চর্য লোকের সাথে পরিচয় হয়। খুব গরিব, লেখাপড়া জানে না। হালকাপাতলা শরীরে শ্যামলা রং, ছিপছিপে শরীর, চোখ দুটি শান্ত, জলদীর আবদুস সালাম। অফুরান্ত প্রাণশক্তি। সব পাক সেনা এবং দালালকে এখনই হত্যা করতে পারলে যেন তার শান্তি।

নানা নুরুল কবিরের পাহাড়ের আশ্রয়স্থলে আমি সাথীদের নিয়ে দীর্ঘ আলাপআলোচনা করলাম। মেঝেতে ছবি এঁকে যার যার দায়িত্ব বুঝিয়ে দিলাম। আমাদের থাকাখাওয়ার দায়িত্ব নুরুল কবির সাহেব পালন করছেন। পরিকল্পনা অনুসারে আমরা তিন ভাগে ভাগ হয়ে যাই। মমতাজের নেতৃত্বে এক গ্রুপকে থানার সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য বালিকা বিদ্যালয়ের দিকে, ছমিউদ্দিনকে সিও (ডেব) ও সিও (রেভ) এর বাসার দিকে এবং উত্তর দিকে রাস্তাসহ বাজারের দিক থেকে সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিহত করতে এবং আমি মূল দল নিয়ে হেডকোয়ার্টার আক্রমণ করি। প্রথমে সিও (ডেব) ও সিও (রেভ) অফিস ধ্বংস করে আগুন ধরিয়ে দিই। অফিসের সাইক্লোস্টাইল মেশিন এবং টাইপ রাইটারটি নিয়ে ফিরতি যাত্রা শুরু করি। থানার দিকে ফ্লেয়ার গানটির একটি মাত্র বুলেট ফায়ার করা হয়েছিল পুলিশকে ভয় পাইয়ে দেওয়ার জন্য; যাতে তারা পাল্টা আক্রমণের সাহস না পায়। এই অপারেশনেও কাসেম ও তার দুই বন্ধু অংশ নিয়েছিল।

সফল অপারেশন শেষে আমরা সাইক্লোস্টাইল মেশিন এবং টাইপ রাইটার নিয়ে উত্তেজনার মধ্যে উত্তর দিকে যাত্রা শুরু করি। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছিল। রাস্তা পিচ্ছিল হওয়ায় হাঁটতে অসুবিধা হচ্ছিল। কিন্তু আমরা তা ধর্তব্যের মধ্যে আনছিলাম না। জলদীর পর রাস্তা এত পিচ্ছিল ছিল যে, টাইপ রাইটারটি রাস্তার পূর্ব পাশে পানিতে ফেলে দিলাম। ভবিষ্যতে প্রচারের কাজে ব্যবহারের কথা চিন্তা করে সাইক্লোস্টাইল মেশিনটি যেকোনো কিছুর বিনিময়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।

জলদী পার হওয়ার পর রাস্তার পূর্ব দিকে একটা স্কুল। তার পশ্চিম দিকে একটি রাস্তা আছে। সেটি খালপাড়ে গিয়ে শেষ হয়। সাধারণত আমরা রাতের বেলায় পূর্ব বাঁশখালীতে অপারেশন করতাম। আশ্রয়স্থল হিসেবে পশ্চিম বাঁশখালীতে আশ্রয় নিতাম। আমরা সব কাজ গোপনে করতাম এবং দলের নিরাপত্তার জন্য কঠোর গোপনীয়তা অবলম্বন করতাম। এজন্য সহজেই স্থানীয় জনগণের মাঝে মিশে যেতে পারতাম। গেরিলা যুদ্ধের এটা অতি প্রয়োজনীয় শর্ত।

ওইদিন আমরা তাই করলাম। একটা নৌকায় করে কয়েকজন সাইক্লোস্টাইল মেশিন নিয়ে উত্তর দিকে রওনা দিলাম। বাকিরা হেঁটে যার যার আশ্রয়স্থলের দিকে যাত্রা করল। নৌকা যোগাড় করতে মাহমুদুল হক সাহেব সহযোগিতা করেছেন। রত্নপুরের কাছে আমি নেমে গেলাম। সোলায়মানসহ বাকিরা নৌকায় থাকবে ঠিক হলো। ওরা পূর্বনির্ধারিত সময়মতো মেশিনটি সোলায়মানের তত্ত্বাবধানে সাধনপুর ডোমপাড়ার পূর্ব দিকে ইঞ্জিনিয়ার মোমিন সাহেবের বাড়ির দোতলার ছাদে রাখবে। আমি রত্নপুর আবদুল জব্বার চৌধুরীর বাড়িতে গিয়ে অনেক ডাকাডাকি করে ওদের ঘুম থেকে তুললাম। কেউ আমাকে প্রশ্ন করল না। গরম ভাত খেতে দিল। মামা বললেন, এখন ঘুমাও, সকালে কথা হবে।

মনে মনে মামাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ঘুমাতে গেলাম। ঘুম কি আসে? সে কি উত্তেজনা! রাতের যেটুকু বাকি ছিল ঘুমের ভান করে কাটালাম। মনে আসছিল, যদি থানার সব অস্ত্র একসাথে আমাদের দিকে ফায়ার শুরু করত, আমাদের ভুলগুলো এবং সুবিধা বারবার মনের পর্দায় ভেসে উঠছে। তবে সব সীমাবদ্ধতা ছাপিয়ে সঙ্গীদের দেশপ্রেম এবং ইস্পাত দৃঢ় মনোবলই এরকম একটি ঝুঁকিপূর্ণ অপারেশনে, বিশেষ করে বাঁশখালী থানার ফায়ারিং রেঞ্জের ভিতর সফল করে তুলেছিল।

যুদ্ধকালীন বাঁশখালীকুতুবদিয়ার বিএলএফ কমান্ডার ডা. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ চৌধুরী স্বাধীনতার পর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেজিস্ট্রার মেডিসিন বিভাগে দায়িত্ব পালন করেন। পরে সরকারিভাবে ১৯৭৭ সালে তাকে লিবিয়া পাঠানো হয়। ১৯৯৮ সালে তিনি অবসর নেন।

x