তৃণমূল নারীদের বর্ণাঢ্য বস্ত্রমেলা

নাজনীন বেগম

শনিবার , ১৯ অক্টোবর, ২০১৯ at ৩:৫৩ পূর্বাহ্ণ
17

সমৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ সূচকে নারীদের ক্রমবর্ধমান এগিয়ে যাওয়া সার্বিক অর্থনীতির আবশ্যিক পর্যায়। এক সময় পারিবারিক শৃঙ্খলে আবদ্ধ মেয়েরা ঘরকান্না নিয়ে ব্যস্ততম পর্ব পার করতে নিজেদের নিঃশর্ত সমর্পণ করত। তেমন অবস্থান আজ আর সেভাবে দৃশ্যমান নয়। স্বামী-সন্তানের দেখভাল করা সুনিপুণ গৃহিণীরা সময়ের যৌক্তিক চাহিদায় সম্প্রসারিত বহিরাঙ্গনেও অংশীদারিত্ব প্রমাণ করে যাচ্ছে। শিক্ষকতাই ছিল কোন এক কালে মহিলাদের সর্বোত্তম পেশা। যেখানে তারা স্বচ্ছন্দ বোধ করত, শিক্ষার মতো প্রয়োজনীয় সূচকে সংযুক্ত হয়ে সমাজকে নানা মাত্রিকে এগিয়ে নেয়ার প্রয়াস ও নিকট অতীতে খুব বেশি অপর্যাপ্ত নয়। কিন্তু দ্রুত পরিবর্তিত সময় ও তথ্যপ্রযুক্তির নিরন্তর অগ্রযাত্রায় সমাজ আর আগের মতো নেই। আধুনিকতার বরমাল্যে সমাজের নিরন্তর অভিগামিতা আজ সময়ের প্রয়োজনে সবাইকে কাল ও যুগের যথার্থ পথিক করতে পেছনে ফিরে তাকাতে হচ্ছে না। সমাজ যখন দ্রুততার সঙ্গে প্রতিনিয়তই সামনের চলার পথ অবারিত করছে তখন অর্ধাংশ এই গোষ্ঠীও বিভিন্ন সূচকে নিজেদের প্রমাণ করতে বেগ পাচ্ছে না। পশ্চাদপদ, অন্ধকারের আকণ্ঠ নিমজ্জিত নারী সমাজ আজ যুগের যৌক্তিক চাহিদায় স্বাবলম্বী হয়ে উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে ক্রমাগত এগিয়ে যাচ্ছে।
এক সময় ব্যবসা বাণিজ্যে নারীদের অভিগমন ছিল সামান্যই। ঝুঁকিপূর্ণ এই পেশায় মহিলারা সেভাবে স্বচ্ছন্দও অনুভব করেনি। কিন্তু বর্তমান সময়ে ব্যবসা বাণিজ্যের সম্প্রসারিত পর্যায়ে নারীদের সম্পৃক্তকরণ আজ ব্যাপকভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে। ক্ষুদ্র থেকে মাঝারি এমন কি প্রতিনিধিত্বমূলক উদ্যোক্তার ভূমিকায় নারীরা আজ প্রশংসনীয়ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। সেখানে শুধুমাত্র আর্থিকভাবে সফলতাই নয় নারীর ক্ষমতায়নে ব্যাপক অংশীদারিত্ব সবাইকে চমক লাগিয়ে দিচ্ছে।
প্রত্যন্ত অঞ্চলের তৃণমূল নারীদের বুটিক শিল্পের বাহারি পণ্যের সম্ভার নিয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল এক বর্ণাঢ্য বস্ত্রমেলা। ‘উইমেনস এম্পাওয়ারমেন্ট অর্গানাইজেশন’-এর উদ্যোগে আয়োজিত এই মনোজ্ঞ শিল্পমেলা ১৪, ১৫ ও ১৬ জুলাই মহাখালী রাওয়া হলে উপস্থিত সবাইকে মুগ্ধ করে। ‘ঈদ-উল-আযহা মেগা ফেয়ার’ শিরোনামে এই অনবদ্য মিলনমেলায় নারী উদ্যোক্তাদের পণ্য সম্ভার উপস্থাপিত হয়। নারী ও শিশু বিষয়ক গবেষক প্রশিক্ষক এবং ফেইথ বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক নিলুফার করিম প্রধান অতিথি হিসেবে এই আকর্ষণীয় মেলার উদ্বোধন করেন। প্রতিষ্ঠানের সভাপতি নাজমা মাসুদ এই আনন্দঘন অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন। সামনে কোরবানির ঈদ। ঈদ মানে কেনাকাটার ভিড়। তেমন চাহিদাকে সামনে রেখে এই পণ্য সামগ্রীর আয়োজনকে ক্রেতাদের সামনে নিয়ে আসা হয়। এক সময়ের সফল গৃহিণী ও গৃহবধূ শুধুমাত্র রান্না বান্নায় তাদের প্রতিদিনের জীবনকে কানায় কানায় ভরিয়ে তুলত। সময়ের দ্রুত পরিবর্তনের ধারায় নারীর সীমাবদ্ধ সাংসারিক আলয় থেকে বৃহত্তর সামাজিক আঙ্গিনায় পা দেয়া সংশ্লিষ্টদের জীবনে এক অভাবনীয় অধ্যায়। কারণ শুধু যে শিক্ষার আলোয় তারা দ্যুতিময় হয়েছে তা কিন্তু নয় বিভিন্ন সম্মানজনক পেশায়ও নিজেদের সম্পৃক্ত করতে পিছপা হয়নি। সেই ধারাবাহিকতায় ঝুঁকিপূর্ণ পেশা হিসেবে ব্যবসা বাণিজ্যকেও আয়ত্বে আনতে বিভিন্ন কর্মযোগে শরিক হয়েছে। তারই সুফল আজ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নারী উদ্যোক্তাদের যুগান্তকারী ভূমিকায় অর্থনৈতিক বলয়কেও গতিশীল করে যাচ্ছে। ব্যবসা শুধু নিজের সমৃদ্ধি নয়, অগণিত গ্রাহকের চাহিদা ছাড়াও আর্থিক সফলতার যে মাপকাঠি সেখানে দেশও সার্বিকভাবে লাভবান হয়। সেটাকেও সব থেকে বেশি গুরুত্ব দেয়া জরুরী। বাংলাদেশে নারী উদ্যোক্তাদের এমন সমন্বয় আজ দেশ ও জাতির অগ্রগামিতায় মহান ব্রত। কারণ অর্ধাংশ এই গোষ্ঠী যদি অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকে তাহলে যথার্থ সমৃদ্ধি দৃশ্যমান হবে না।
আলোচ্য বস্ত্র মেলাটি বাহারি পণ্যের এক অনবদ্য দ্রব্যসামগ্রীর বিশাল আয়োজন। হরেক রকম বুটিকসের আকর্ষণীয় পোশাক, মনোমুগ্ধকর জুয়েলারি, পাটজাত পণ্যের চমৎকার অভিযোজন, প্রসাধনী এবং বর্ণাঢ্য অলঙ্কারের অভিনব উপস্থাপন ক্রেতা ও দর্শনার্থীর মনোরঞ্জনে যে ভূমিকা রাখে তা যেমন বিস্ময়ের একইভাবে মুগ্ধতারও। আবহমান বাংলার ঐতিহ্যিক বয়ন শিল্পের সমৃদ্ধ সম্ভার জামদানি ও তাঁতের শাড়ির মিলন শোভায় পুরো অনুষ্ঠানকে চমৎকারভাবে দর্শনীয় করে তোলে। সব শ্রেণী-পেশার নারীর ক্ষমতায়নের এমন অভিনব বার্তায় পুরো অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য সকলের সামনে স্পষ্ট হয়। এমন মহতী এবং সম্প্রসারিত উদ্যোগ উন্নয়নের অভিযাত্রায় নারীদের জোরালো সম্পৃক্তকরণ সমাজের অন্যান্য পিছিয়ে পড়া মেয়েদের উৎসাহ-উদ্দীপনায় এগিয়ে নেবে এই প্রত্যাশাকে বিশেষভাবে আমলে নিতে হবে। সামান্য পুঁজি, আত্মশক্তি, অন্তর্নিহিত শ্রম দ্যোতনায় দেশের অর্ধাংশ এই জাতি উত্তরোত্তর সামনের দিকে এগিয়ে যাবেই।

x