তৃণমূলে ক্রিকেট প্রশিক্ষণ

সুলতান মাহমুদ সেলিম

মঙ্গলবার , ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ১১:২১ পূর্বাহ্ণ
29

কোচিং শব্দটা বাংলাদেশে বেশ পরিচিত শব্দ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা যথেষ্ট হয় না বলেই কোচিংয়ের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। আর তা এখন ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে শুধু পড়ালেখায় এই কোচিং ব্যবস্থা সীমাবদ্ধ আছে তা নয়; খেলাধুলার মতো বিষয়ে বিশেষ করে ক্রিকেটের ক্ষেত্রেও এখন দেখা যাচ্ছে কোচিং সেন্টার দাঁড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশে ক্রিকেটের সুসময় চলছে এখন। ক্রিকেটের মাধ্যমে বাংলাদেশ যেমন ভালো পরিচিতি পেয়েছে। তেমনি জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা এখন ভালো অবস্থানে আছেন। তাদের দেখেই উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা ক্রিকেটার হতে চায়। তারা শিখতে চায় ক্রিকেট। কিন্তু কিভাবে শিখবে, কোথায় শিখবে। এখনকার কোন স্কুল, কলেজে নেই ক্রিকেট শিক্ষার ব্যবস্থা। বাধ্য হয়ে পড়ালেখার মতো করেই তাদের ক্রিকেট শিখতে হচ্ছে কোচিং সেন্টারে গিয়ে। ক্রিকেট শেখার এই কোচিং সেন্টার হলো ক্রিকেট একাডেমি। চাহিদা যেহেতু আছে সেজন্যই গড়ে উঠেছে এসব একাডেমি। একাডেমি নামটা উচ্চারণে যতোই ভারিক্কি মনে হোক না কেন এই চট্টগ্রামে যত্রতত্র গড়ে উঠেছে অনেক ক্রিকেট একাডেমি। চট্টগ্রাম এম এ আজিজ স্টেডিয়ামের আশেপাশে বিকেলে ঢুঁ মারলেই দেখা যাবে অনেক শিশু-কিশোরদের মিলন মেলা। এরা কোন না কোন ক্রিকেট একাডেমিতে শিখতে এসেছে। একসময় বাবা-মায়েরা খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী না থাকলেও বর্তমানে সে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। অভিভাবকরাই এখন স্বপ্ন দেখেন ছেলে-মেয়েকে বড় ক্রিকেটার বানাবেন বলে। ফলে তারা সরল বিশ্বাসে সন্তানদের নিয়ে আসেন এসব ক্রিকেট একাডেমিতে। এখানে ভর্তি করে দেন। কিন্তু তারা কখনো ভেবে দেখেননি তাদের সন্তানরা কাদের কাছে ক্রিকেট শিখছে অথবা সন্তানদের ক্রিকেট শেখার পরিবেশটা কেমন। রাস্তার উপর কিংবা এক চিলতে বালুময়, কংকরময় মাঠে ক্রিকেট শিখতে হচ্ছে এসব শিশু কিশোরদের। তা নিয়ে ভাবেন না অভিভাবকরা। যেহেতু শেখার একটা চাহিদা আছে। সেহেতু চাহিদা পূরণ করতেই যেনতেন প্রকারে এই ক্রিকেট একাডেমি গড়ে উঠা। এই একাডেমিগুলো টাকার বিনিময়ে ক্রিকেট শেখাচ্ছে। মাস শেষে অভিভাবক তার সন্তানের জন্য বেতন দিচ্ছেন একাডেমিতে। কিন্তু তাদের ক্রিকেট শিক্ষা কতটুকু এগিয়েছে তা নিয়ে হয়তো অনেকেরই ধারণা নেই। ইদানিং ক্রিকেট একাডেমিগুলোর কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অভিভাবক তার অভিজ্ঞতার কথা বললেন এভাবে, ‘ছেলেকে একটা একাডেমিতে ভর্তি করিয়েছি। অবশ্যই অর্থের বিনিময়ে। দেখলাম ক্রিকেট শেখাচ্ছে বর্তমানে খেলছে এমন একজন খেলোয়াড়। অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে কেউ কেউ ব্যাটিং-বোলিং করারও সুযোগ পাচ্ছে না। ছেলেকেও ব্যাটিং-বোলিং করতে দেয় না। শুধু ব্যায়াম করায়। ক্যাচ প্র্যাকটিস আর রান আউট প্র্যাকটিস করায়। এইভাবে অনেক দিন দেখে পরে সেখান থেকে ছেলেকে নিয়ে চলে আসতে বাধ্য হই।’ এমন অভিযোগ আরো অনেকের। কেউ কেউ বলছেন এসব একাডেমির তো নিজস্ব মাঠ নেই। যখন যেখানে পারে অনুশীলন করায়। পরিচর্যাবিহীন বালু-কংকরময় মাঠে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে অনুশীলন করানো হয়। সেখান থেকে ছোট বাচ্চাদের ফুসফুস আক্রান্ত হতে পারে। তারা আঘাত পেতে পারে। আবার সিমেন্টের টেনিস কোর্টেও অনুশীলন করতে দেখা যায় ছোট ছোট শিশু-কিশোরদের। অবস্থা দেখে মনে হয় ক্রিকেটের এই রমরমার দিনে ক্রিকেট শেখাবার নাম করে একাডেমির নামে এক ধরনের ব্যবসা ফেঁদে বসেছে ক্রিকেটের তথাকথিত সেবকগণ। এরা আসলে ক্রিকেটের উন্নয়ন নয় ক্রিকেটকে বিক্রি করে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিচ্ছে। অনেকদিন থেকেই নিজস্ব অফিসবিহীন, মাঠবিহীন এসব একাডেমি পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু তাদের মাধ্যমে মানের কোন ক্রিকেটার জাতীয় পর্যায়ে উঠে আসছে না। অনেকেই তীক্ষ্ণ স্বরে প্রশ্ন তুলেছেন একাডেমিতে কারা ক্রিকেট শেখাচ্ছেন। তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড কি, তাদের কি কোচিং ডিগ্রি আছে কিংবা পড়শোনা আছে। শুধুমাত্র লিগে কয়েকটি ম্যাচ খেলেছেন এসব ক্রিকেটার। তারপর একাডেমির কোচ বনে গেছে। তারা আদতে কতটুকু সামলাতে পারেন কোচিং বিষয়টা। যাদের নিজেদেরই জানার অনেক বাকি তারাই শিক্ষক হয়ে যাচ্ছেন! এ শিক্ষকদের কাছ থেকে কতটুকু শিখতে পারে একজন শিক্ষার্থী। জীবনের শুরুতেই এমন শিক্ষা পেয়ে ওই শিক্ষার্থী কিভাবে বেড়ে উঠবে? আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় লেভেল-১ কিংবা লেভেল-২ সম্পন্ন করা কোচও ঠিকমতো শেখানো হয় না। তারা কিছু সিনিয়র ব্যর্থ ক্রিকেটারদের কোচিং করাতে নিয়োগ করেন। নিজেদের শিক্ষাটা খুব একটা দেন না শিক্ষার্থীদের। পরিশ্রম করতে দেখা যায় না তাদের। কিন্তু ঠিকই টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন তারা এসব একাডেমি খুলে।
চট্টগ্রামের অনেক ক্রিকেট অভিজ্ঞ ব্যক্তিই এসব একাডেমির কোন ভবিষ্যত দেখেন না। তারা মনে করছেন এসব একাডেমির বেশিরভাগের মাধ্যমেই ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা একধরনের প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। জীবনের শুরুতে নিম্নমানের শিক্ষা পেয়ে এই শিশু কিশোররা কতোটা এগোতে পারবে তা নিয়ে সন্দিহান ক্রিকেট বোদ্ধারা। কিন্তু এসব একাডেমির উপর কে নজরদারি করবে। কে তদারকি করবে- তেমন কেউ তো নেই। নেই কোন নীতিমালাও। ফলে যার যেমন ইচ্ছে তেমন করে একাডেমি গড়ছে আর পরিচালনা করছে। যেহেতু দেশে ক্রিকেটের ক্রেজ চলছে তাই প্রচুর ছাত্রও মিলছে তাদের একাডেমিতে। আর সুযোগ মতো নয়-ছয় করে কিছু শেখানোর নাম করে টাকা আদায় করে নেওয়া হচ্ছে। মুক্তবাজার অর্থনীতির মতো যার যেমন ইচ্ছে সেই একাডেমি খুলে উদ্যোক্তা বনে যাচ্ছে। সচেতন মহল মনে করেন এই ব্যাপারে অভিভাবক হিসেবে চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থার দায়িত্ব রয়েছে। তারা এগিয়ে এসে একটা বিধিমালা তৈরি করে দিতে পারে। কারা কারা কোন যোগ্যতার ভিত্তিতে এমন একাডেমি গড়তে পারে তা নিয়ে মতামত দিতে পারে। তাহলে একদিকে যেমন অভিভাবক এবং তাদের সন্তানরা প্রতারিত হবেন না তেমনি যোগ্য ব্যক্তিরাই একাডেমি গড়তে পারবেন। আবার চট্টগ্রাম থেকেও তেমনি উঠে আসবে আগের চেয়ে ভালো ভালো ক্রিকেটার। যারা দেশকে অনেক কিছুৃ দিতে সমর্থ হবে। দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে। এ প্রসঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার উদাহরণ টেনে আনা যায়। সেখানে খেলোয়াড় এবং বোর্ডের দেয়া অর্থে গঠিত তহবিল খরচ করা হচ্ছে তৃণমূল পর্যায়ে ক্রিকেট খেলা এবং অনুশীলনের কাজে। তৃণমূল ক্রিকেটের উন্নয়নে পেশাদার পুরুষ ও নারী ক্রিকেটারদের নিয়ে যৌথ তহবিল গঠন করে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া। যা দিয়ে খেলার মাঠ ও অনুশীলনের সুযোগ সুবিধা বাড়ানো হয়। অস্ট্রেলিয়ান ফাস্ট বোলার জস হ্যাজেলউড বলেন, খেলোয়াড়রা ক্রিকেটকে কিছু ফিরিয়ে দিতে মরিয়া। কারণ খেলাটি তাদের অনেক কিছু দিয়েছে। তার মতে, তৃণমূল ক্রিকেটের উন্নয়ন হলে তা একটি সময়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ের ক্রিকেটকেই উপকৃত করবে। আর নারী ফাস্ট বোলার হোলি ফার্লিং বলেন, আমরা জানি একজন শিশুর জন্য ব্যাটিং করা, বল করা কিংবা থ্রো করার জন্য কতটা নিরাপদ এবং স্বস্তিদায়ক অবকাঠামো ও পরিবেশ প্রয়োজন। যে কমিউনিটি আমাদের ক্রিকেটার হিসেবে তৈরি করে আজকের অবস্থান গড়ে দিয়েছে তাদের কিছু ফিরিয়ে দেয়ার সময় এসেেছ। অস্ট্রেলিয়ার নারী-পুরুষ পেশাদার ক্রিকেটাররা যৌথ তহবিলে জমা দিয়েছেন ৩ কোটি ডলার।
সেখানকার ক্রিকেটাররা যখন ক্ষুদে ক্রিকেটারদের সহজে উঠে আসার পথ তৈরি করে দিচ্ছেন তখন আমাদের এখানে ক্রিকেট শেখাবার নাম করে এক ধরনের ধান্ধার পথ বেছে নিয়েছে কিছু ক্রিকেটার। যাদের লক্ষ্য শিশু-কিশোরদের টার্গেট করে পয়সা কামানো।

x