তূর্যহরণ

ফারজানা রহমান শিমু

মঙ্গলবার , ১২ নভেম্বর, ২০১৯ at ১০:৪৭ পূর্বাহ্ণ
3

“তুমি একটা কাওয়ার্ড” বলে শান্তশিষ্ট মেয়েটি যখন ছেলেটির কলার টেনে ধরল, পরম বিস্ময়ে অন্যরা তাকিয়ে থাকল। ঠিক মধ্যদুপুরে ক্যাম্পাসের সচল পরিবেশের মাঝখানে এমন দৃশ্যটি কেমন যেন লাগছিল। অত্যন্ত শান্ত হিসেবে পরিচিত তিশা কিনা গবেট তূর্যকে শাসাচ্ছে এমন করে। অবাক হওয়ারই কথা। কেউ কখনো তাদের এমন কোন অন্তরঙ্গতা দেখেনি, যাতে বিষয়টি স্বাভাবিক মনে হয়।
উপযাচক হয়ে দু’কদম এগিয়ে এসে রাফি বলল, “কি হয়েছে রে তূর্য? কি করেছিস তুই? “তিশার নির্মেষ জ্বলন্ত চাহনি থেকে কেবল চোখ সরিয়ে তূর্য তাকালো রাফির দিকে। তিশার তেজ তাতে একটুও কমলো না। ‘কাওয়ার্ড’ বলে ঝটকা মেরে চলে গেল তিশা, তূর্য বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইলো। বন্ধুরা এসে ঘিরে ধরল তাকে।
নানা রকম প্রশ্নবাণে জর্জরিত তূর্য আনমনা হয়ে গেল। কি জবাব দেবে এসবের? জবাব কি তার নিজেরই জানা? কোনমতে ‘কিছুনা’ বলে বন্ধুদের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার চেষ্টা করল সে। তার ভেতরটা যে বড্ড গোলমেলে! প্রচণ্ড উদাসীনতা তাকে কেমন সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখতে চায়। আবার প্রবল আকর্ষণ তাকে তিশার দিকে তাড়িয়ে বেড়ায়। কিন্তু এত শান্ত মেয়েটা এভাবে জ্বলে উঠল কেন? এতগুলো মানুষের সামনে? তিশা কি তবে ডুবে গেছে কোন গভীর পাঁকে? অনন্ত অন্ধকারের মধ্যে সে কি খুঁজতে চেয়েছে কোন তীব্র রশ্মি? কিন্তু কেন? তূর্যতো কেবল ঘুরতে থাকে মহাশূন্যের এক বলয় থেকে অন্য বলয়ে। ওরতো কোথাও কোন আগল নেই, নেই দায়বদ্ধতা। প্রচণ্ড মন খারাপ নিয়ে ক্যাম্পাস ছাড়ে তিশা। ইচ্ছে হচ্ছিল চিৎকার করে তূর্যকে বলে ‘আমি তোমাকে চাই, শুধু তোমাকে’ আর সে আওয়াজ যেন পুরো ক্যাম্পাসে প্রতিধ্বনিত হয়। রাগ হয় খুব। তূর্যতো পারত ওকে কিছু বলে শান্ত করতে, আশ্বস্থ করতে। তূর্যতো ওর হাত দুটো জোর করে ছাড়িয়ে দিতে পারত। কিংবা তাচ্ছিল্য করে হাসা। কিন্তু এমন গবেটের মতো দাঁড়িয়ে রইল যেন আচমকা বাজ পড়েছে তার মাথায়। গা জ্বলে যাচ্ছিল তিশার। হাঁটতে হাঁটতেই এক সময় শান্ত হল সে। অনুভূতি তার রং বদলাতে শুরু করল। লজ্জিত হল সে। সবার সামনে এমনটি করে বসবে, নিজেও ভাবতে পারেনি, ছি: কি ভাবল ওরা?
ঘরে ফিরেই বিছানায় গড়িয়ে পড়ল তিশা। মায়ের ডাকাডাকি মোটেই ভাল লাগছিল না। তাও সামান্য মুখে দিয়ে সটান শুয়ে। ঘুরে ফিরে তূর্যকেই মনে পড়ছে তার। সে যখন কলার ধরে বলল, ‘তুমি একটা কাওয়ার্ড,’ তূর্য কেমন অন্যরকম হয়ে গিয়েছিল। কেমন অপ্রস্তুত ও বিব্রত। এক ধরনের সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিল। কিন্তু এরপরই অন্যরকম ভাবনা আচ্ছন্ন করল তিশাকে। নাহ্‌্‌, তূর্য ওকে কোন গুরুত্বই দেয়নি। ভাবটা যেন কিছুই জানে না সে। অভিমানে ছেয়ে গেল তিশার বুক। একের পর এক অশ্রু ঝরতে লাগল বালিশের কোণ বেয়ে।
ম্যাসেজের রিংটোন শুনে ঝটিতে উঠে বসল তিশা। কিন্তু রবি রিওয়ার্ড দেখে মনটা দমে গেল খুব। অকারণেই যেন সে তূর্যের ম্যাসেজের অপেক্ষায় ছিল। মনটা আবার ভার হতে লাগল। মরিয়া হয়ে সে ফেবু অন করল। নাহ্‌্‌, তূর্য নেই লাইনে। মোবাইলটা হাতে নিয়ে শুয়ে পড়ল সে। এমন সময় বড়বোন রিয়া এসে ঢুকল রুমে। গম্ভীর কন্ঠে জানতে চাইল “শরীর খারাপ লাগছে? ক্লান্ত জবাব তিশার, ‘না’। টায়ার্ড লাগছে। ঠিক তক্ষুণি তূর্যের ম্যাসেজ-“তিশা”। ব্যাস, এইটুকু। শুধু নামটা। সমস্ত অন্ধকার ভেদ করে আলোর তীব্র বাল্ব যেন ধাঁধিয়ে দিল তিশার মন। কি আশ্চর্য! এসব বয়স পেরিয়েছে কবে! অনার্স সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্রী সে। নিজেকে প্রবোধ দেয়ার চেষ্টা করার ফাঁকে আরেকটি ম্যাসেজ, “চুপ যে”! অনর্গল স্রোতের মত অভিযোগ বেরিয়ে এলো তিশার জবাবে।
তূর্যও বুঁদ হয়ে থাকে ফেবুতে। তিশা কি সুন্দর সব ম্যাসেজ দেয়। মাসখানেক আগেও খুব রিজার্ভ ছিল মেয়েটি। তূর্যও টুকটাক ম্যাসেজ দিত। দু’ চার শব্দের কথার মতো সেসব। ছোটখাট ঢেউয়ের ধাক্কায় পর্বত দুলে ওঠার মতো বদলে গেল তিশা, আমূল বদলে গেল। চোখে চোখ রেখে কথা বলার মতো তার ম্যাসেজগুলো তূর্যকে নাড়িয়ে দিতে লাগল। তার বন্ধুরা এসবে বেশ মজা পায়। কিন্তু সে যেন এক অজানা উদাসী পথের দিকে হাঁটতে শুরু করে। তার মনে হতে থাকে, কি হবে এরপর। মনে হয়, তিশা বুঝি তাকে বায়বীয় ছায়া ধরে নিয়ে তার সাথে আবেগ আবেগ খেলছে। যদি এই সবকিছু মিথ্যা হয়ে যায়। যদি একদিন হাসতে হাসতে তিশা ঠাট্টার সুরে বলে, “কেমন নিলাম এক হাত।” বড্ড ভয় হয় তূর্যের। সেতো মানুষ, ফেবুর কোন খেলনা নয়।
মনের টানাপোড়ন তূর্যের ভেতরটাকে বিক্ষত করে তোলে। এক প্রবল আকর্ষণ তাকে টানতে থাকে ফেবুর দিকে। আর বিষণ্নতা নিয়ে যায় বিপরীত মেরুতে। তূর্য পুড়তে থাকে, ছিঁড়তে থাকে, ভাঙচুর হয় তার ভেতরে। মনের মধ্যে শুধু তিশা আর তিশা। কিন্তু ক্যাম্পাসে সে যেন পালিয়ে বেড়ায়। ঠিক সে সময় বন্ধু হেনরি এগিয়ে এসে বলে, “দোস্ত, একটু হেল্প করবি? আমার স্টুডেন্টগুলোকে একটু চালিয়ে নে না কয়দিন। বাড়ি যেতে হবে আমাকে। অন্য কোন সময় হলে ‘কি যে বলিস! বলে ঠিক পাশ কাটিয়ে যেত। কিন্তু সেদিন প্রস্তাবটি লুফে নিল সে। নিজেকে আড়াল করার জন্য এর চেয়ে মোক্ষম সুযোগ আর হয় না।

তূর্যকে আর চোখের দেখাও দেখে না তিশা। অন লাইনে দেখে কিন্তু রেসপন্স পায় না। তিশার ম্যাসেজ ক্রমাগত: দীর্ঘ হয়। তূর্য নীরব। তিশা প্রশ্ন করে জবাব পায় না। তিশা বিশ্লেষণ করে তূর্য স্থবির। অথচ প্রতিটি ম্যাসেজ পড়ে সে। এক পর্যায়ে তিশার বাঁধ ভেঙে যায়। অস্থির ও দুর্বিনীত হয়ে ওঠে সে। অভিমানের রং রাগে রূপ নিতে থাকে। ফেটে পড়ে তিশা। ফোন করতে থাকে, রিং বেজে যায়। কিন্তু ধরে না তূর্য। কোন কারণ ছাড়াই এ ধরনের বিচ্ছিন্নতা তিশাকে উদ্ভ্রান্ত করে তোলে। তাই সে তূর্যের কলার টেনে ধরে। ইচ্ছে হচ্ছিল, প্রবল ইচ্ছে হচ্ছিল… কিন্তু সামলে নেয় নিজেকে।
অনেক দিন পর তূর্য যখন ‘তিশা’ ম্যাসেজ পাঠায়, মনে হয় সব ফিরে আসে তার পৃথিবীতে। তিনদিন পর তূর্যকে বাসায় আসতে বলে তিশা। সামান্য খোঁজাখুঁজিতেই পেয়ে যায় বাসা। ইতস্তত: করে কলিং বেলে চাপ দেয় তূর্য। তিনটা বেজে পাঁচ। বেল বাজতেই খুলে যায় ঘরের দরজা। কেউ যেন অপেক্ষায় দাঁড়িয়েছিল দরজার অন্যপাশে। জলপাই রঙের শাড়িতে একদম অন্যরকম লাগছে তিশাকে। হালকা লিপস্টিক হাসিমাখা মুখটাকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। চকচক করছে তার চোখজোড়া। খুব মিষ্টি করে তিশা ডাক দেয়, “দাঁড়িয়ে কেন, ভেতরে ঢোকো”। তূর্য সামান্য এগিয়ে ভেতরে ঢোকে। তিশা দরজা বন্ধ করে ফিরে দাঁড়াতেই দেখে রাজ্যের ঘোর নিয়ে তাকিয়ে আছে তূর্য। স্বভাবে শান্ত ও ধৈর্যশীল। তিশা না জানি কেমন করে খেই হারিয়ে ফেলে। সমস্ত অভিমান, রাগ ও সীমানা অতিক্রম করে সে ঝাঁপিয়ে পড়ে তূর্যের বুকে। আর গবেট তূর্যটা তার সুগন্ধী চুলে নাক ডুবিয়ে ভাবে কি হবে এরপর??

x