তিন কোটি টাকার এমআরআই মেশিন ১০ কোটিতে ক্রয়

জেনারেল হাসপাতাল

ইকবাল হোসেন

মঙ্গলবার , ২৬ নভেম্বর, ২০১৯ at ৪:৪৯ পূর্বাহ্ণ

অটোস্কোপ একটি ছোট্ট সার্জিক্যাল যন্ত্র। মানুষের কানের ভেতরে সূক্ষ্মভাবে দেখার জন্য চিকিৎসকরা এটি ব্যবহার করেন। সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোরেজ ডিপো (সিএমএসডি)’র তথ্য অনুযায়ী, এই যন্ত্রটির মূল্য মাত্র ৩ হাজার দুইশ টাকা। কিন্তু ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ২০১৫ সালে একেকটি মেশিন ক্রয় করা হয়েছে ৩ লক্ষ ৭০ হাজার টাকায়। এতে ৩২শ টাকার একটি অটোস্কোপ কিনতেই লোপাট হয়েছে ৩ লাখ ৬৬ হাজার ৮শ টাকা। শুধু তাই নয়, পৌনে তিন কোটি টাকার একটি এমআরআই মেশিন কেনা হয়েছে ১০ কোটি টাকায়।
দুদকের অনুসন্ধানে এ ঘটনার সত্যতা মেলায় সরকারি এ ক্রয়ে জড়িত চট্টগ্রামের সাবেক সিভিল সার্জনসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। মামলার এজাহার পর্যালোচনা করে এসব তথ্য উঠে আসে।
গতকাল সোমবার দুদক চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এ দায়ের হওয়া মামলায় উল্লেখ করা হয়, ২০১৫ সালের ৩০ এপ্রিল হাসপাতালের জন্য ভারি যন্ত্রপাতি ক্রয়ে অধিক ব্যয় দেখিয়ে ১ কোটি ৬৮ লাখ ৯৫ হাজার ৪২৫ টাকা আত্মসাৎ করা হয়। ঢাকার মিরপুর পল্লবী এলাকার মেডিকেল ইক্যুপমেন্ট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স আহমদ এন্টারপ্রাইজকে দেওয়া ওই কার্যাদেশের মাধ্যমে ক্রয়কৃত মেডিকেল যন্ত্রপাতি মধ্যে পেসেন্ট মনিটর কেনা হয়েছে ৮টি। প্রত্যেকটি পেসেন্ট মনিটার কেনা হয়েছে ১৩ লাখ ২০ হাজার টাকা করে। কিন্তু সরকারি সিএমএসডির মতামত অনুযায়ী একেকটি পেসেন্ট মনিটরের মূল্য ৩ লাখ ১৯ হাজার ৮৪০ টাকা। এতে ৮টি পেসেন্ট মনিটর ক্রয়ে ৮০ লাখ ১ হাজার ২৮০ টাকা বেশি বিল পরিশোধ করা হয়েছে। একটি ১২ চ্যানেলের ইসিজি মেশিনের মূল্য দুই লাখ ৩ হাজার ৪০ টাকা হলেও ক্রয় দেখানো হয়েছে ৩ লাখ ১৩ হাজার ৫শ টাকায়। ৪ লাখ ৫ হাজার ৩৬০ টাকার একটি ব্লাড ওয়ার্মারের মূল্য দেখানো হয়েছে ৯ লাখ ৩২ হাজার টাকা। একেকটি ইনফিউশন পাম্পের মূল্য ১ লাখ ২৮ হাজার ১৩০ টাকা হলেও ৫টি মেশিন কেনা হয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা ধরে। সিএমএসডির হিসেবে একটি সিরিঞ্জ পাম্পের মূল্য ১ লাখ ৮০ হাজার ৮শ টাকা হলেও ৮টি সিরিঞ্জ পাম্প ক্রয় করা হয়েছে একেকটি ৩ লাখ ৬৩ হাজার ৫শ টাকা করে। এই সিরিঞ্জ পাম্প ক্রয়েই আত্মসাৎ করা হয়েছে ১৪ লাখ ৬১ হাজার ৬শ টাকা। একটি পালস্‌ অপটিমিটারের মূল্য ১ লাখ ১ হাজার ৪শ টাকা হলেও ৫টি মেশিন কেনা হয়েছে এক লাখ ৫৪ হাজার টাকা করে। অটোস্কোপ নামের মেশিনটির সিএমএসডির হিসেবে মূল্য ৩২শ টাকা হলেও দুইটি অটোস্কোপ কেনা হয়েছে প্রত্যেকটি ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা করে। মেশিন দুটিতেই আত্মসাৎ করা হয়েছে ৭ লাখ ৩৩ হাজার ৬শ টাকা। এতে সরকারি মূল্যের চেয়ে একশ গুণের বেশি ব্যয় ধরা হয়েছে ছোট্ট এই মেশিন দুটি ক্রয়ে। আবার ৪ লাখ ১০ হাজার ৪শ টাকা মূল্যের একটি ওটি টেবিল কেনা হয়েছে ৮ লাখ ৮৫ হাজার টাকা দেখিয়ে। এনেসথেশিয়া মেশিন উইথ নেবুলাইজারের সরকারি মূল্য ২০ লাখ ৫৪ হাজার ৬৫২ টাকা হলেও দুইটি মেশিন কেনা হয়েছে ৫৭ লাখ ৯৫ হাজার টাকা দেখিয়ে। সবমিলিয়ে ওই কার্যাদেশেই ১ কোটি ৬৮ লাখ ৯৫ হাজার ৪২৫ টাকা আত্মসাৎ করার সত্যতা পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ ঢাকার মহাখালীর এএসএল নামের মেডিকেল ইক্যুপমেন্ট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে আরেক কার্যাদেশে চারটি কালার ডপলার ক্রয় করা হয়। সিএমএসডির হিসেবে অনুযায়ী একটি কালার ডপলারের মূল্য ২৭ লাখ ২০ হাজার টাকা। কিন্তু একেকটি কালার ডপলার ক্রয়ে দেখানো হয়েছে ৬৫ লাখ টাকায়। এতে চারটি কালার ডপলারে এক কোটি ৩০ লাখ ৪০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করার বিষয়টি ধরা পড়ে দুদকের অনুসন্ধানে। তাছাড়া ২০১৪ সালের ১২ অক্টোবরের আরেকটি কার্যাদেশের মাধ্যমে ঢাকার তোপখানা রোডের মেসার্স বেঙ্গল সাইন্টিফিক এন্ড সার্জিক্যাল কোং থেকে একটি এমআরআই মেশিন কেনা হয়েছে ৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকায়। অথচ সরকারি সিএমএসডির তথ্য অনুযায়ী ক্রয়কৃত এমআরআই মেশিনটির মূল্য দুই কোটি ৮০ লাখ টাকা। ওই একটি এমআরআই মেশিন কিনেই আত্মসাৎ করা হয়েছে ৬ কোটি ১৫ লাখ ৯৫ হাজার টাকা।
তবে ব্যতিক্রম ছিল এয়ার কুলার ক্রয়ে। এক লাখ ২২ হাজার ৪শ টাকা দামের এয়ার কুলার কেনা হয়েছে ১ লাখ ৭ হাজার টাকা করে। দুইটি এয়ার কুলার কিনতে সরকারি অর্থের সাশ্রয় দেখানো হয়েছে ৩০ হাজার ৮শ টাকা।

x