তিনি সুধীন্দ্রনাথ

শান্তনু বিশ্বাস

মঙ্গলবার , ১৬ জুলাই, ২০১৯ at ১০:৩০ পূর্বাহ্ণ
26

উনি তো ইংরেজিতে বাংলা লেখেন । দুর্বোধ্য । সাতটি কবিতার বই, দুটি গদ্যের , ইংরেজিতে একটি অসমাপ্ত আত্মজীবনী । এই তাঁর লেখার ইতিবৃত্ত । ১৯৩৪-৩৭ কোনো কবিতা লেখেননি , ৪২-৪৪ না, ৪৬-৫২ না , ৫৭-৬০ও না । ১৯৬০ এর ২৫ জুন তিনি প্রয়াত হন । মৃত্যুর আগের ৩৬ বছরে রবীন্দ্র পরবর্তী বাংলা সাহিত্যের প্রধান এই কবির না-লেখার সময়কাল ১৮ বছর। ‘উড়ে চলে গেছে’ এই লাইনটি তাঁর একেবারে মনে ধরছিল না, সাতটা দিন এই একটি শব্দবন্ধ নিয়ে ভাবনাকে তোলপাড় করে শেষে পারলেন পরিবর্তন করতে, লিখলেন ‘উড্ডীন’। ‘উটপাখি’ ত্রিশবার পাল্টেছেন দু’বছর ধরে । শব্দকে, কবিতাকে আরো কত নিখুঁত করা যায় তার জন্য তিনি অক্লান্ত, আপোষহীন । ছাপার সময়েও নিজের লেখা কাটাছেঁড়া করে পাল্টেছেন সারাজীবন । বিত্ত, আভিজাত্য ও বৈভবে সুঠাম এমন পরিবারে তাঁর জন্ম। ৩০ অক্টোবর, ১৯০১। তাঁর কাকা ছিলেন সেকালের মস্ত নট অমরেন্দ্রনাথ দত্ত। যাঁর নাম সম্মান ও শ্রদ্ধাভরে উচ্চারিত হত গিরিশ ঘোষের সঙ্গে ।
ইংরেজিতে স্নাতক । অধ্যাপকের সঙ্গে কী এক মতবিরোধে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ-টা করা হয়নি। বুদ্ধদেব বসু যখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগ খোলেন, অনেক বেগ পেতে হয়েছিল তাঁর এই যোগ্য বন্ধুকে পড়ানোর কাজে নিয়োজিত করতে। তবে করেছিলেন পার্ট টাইম অধ্যাপক হিশেবে । বুদ্ধদেব কেন, সারা কলকাতা জানতো মালার্মে, ভ্যালেরি , রিলকে, এলিয়টের কবিতা পড়ানোর জন্য যোগ্যতর তিনিই ছিলেন । প্রিয় ছাত্রকে লেখা এক চিঠিতে বুদ্ধদেব বসু লিখছেন ‘তাঁর মত বিরাট প্রস্তুতি নিয়ে আর কেউ বাংলা ভাষায় কবিতা লিখতে অগ্রসর হননি।’ তাঁর ছিল সংস্কৃত ছন্দশাস্ত্রে গভীর জ্ঞান, ছিল গভীরতম সংযোগ ইংরেজি, ফরাসি ও জর্মন ভাষা ও সাহিত্যে। রবীন্দ্রনাথকে লিখেছিলেন, কাব্যের প্রধান অঙ্গ lyricism নয় intellectualism। প্রথম কবিতার বই-এর পান্ডুলিপি পাঠিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথকে । কবি পড়ে বললেন ‘তোমার কবিতা যেখান থেকেই তার গয়না নিক না, রূপ তো তারই, নিজের চেহারা বন্ধক রেখে সে কিছুই ধার নেয়নি।’ তিনি বিশ্বাস করতেন কবিতা পড়তে আর বুঝতে হলে পাঠকেরও প্রস্তুতি চাই, তাঁকেও এগিয়ে আসতে হবে, থাকতে হবে কাব্যবোধ, যেমন মনে করতেন টি এস এলিয়ট। বুদ্ধদেব একাধিকবার উল্লেখ করেছেন যে তাঁর সমবয়সী বাঙালি লেখকদের মধ্যে তিনিই একমাত্র যিনি বাংলা শব্দের নির্ভুল বানান জানতেন। ছিলেন যোগ্যতম সম্পাদক ‘পরিচয়’ পত্রিকার । কর্ণওয়ালিস স্ট্রীটের বাড়িতে সেই পত্রিকা ঘিরে বিদগ্ধজনদের আড্ডার কথা বিশদ লেখা আছে বুদ্ধদেব বসুর স্মৃতিকথায়।
নিয়মিত বুদ্ধদেব বসুর কবিতাভবনে যেতেন। একদিন ওই বাড়িতে বুদ্ধদেবের সঙ্গে আলাপকালে তাঁর চোখে পড়লো একটি কবিতা যা কিনা কৃষ্ণনগর থেকে এক তরুণ কবি পাঠিয়েছে। কবিতাটি পড়ে তিনি বিস্মিত হয়ে বললেন ‘মাই গড, দিস বয় ইজ গোয়িং টু বিট আস’। সেই তরুণ কবি ছিলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায় । বনেদি ইংরেজি দৈনিক ‘দি স্টেটসম্যান’ এর সহ সম্পাদকের কাজ করেছিলেন ক’বছর । ছেড়ে দিলেন । বন্ধুরা জানতে চাইলেন কেন , বললেন ‘দেয়ার প্রেফার্ড স্টাইল অব প্রোজ ওয়াজ সো বোরিং।’ কেউ ভাবতেও পারেন উদ্ধত বাক্য, তা মোটেও নয় , কারণ তারপরে এডওয়ার্ড শিলস আমন্ত্রণ করে নিয়ে গিয়েছিলেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে , ইংরেজিতে আত্মজীবনী লেখাবেন , ‘দি ওয়ার্ল্ড অব টোয়াইলাইটস’ । গ্রন্থটি অসমাপ্ত রয়ে গেল।
১৯৬০-এ তাঁর আকস্মিক মৃত্যু। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ । বুদ্ধদেব মৃত্যু সংবাদ শোনার পর জানালার দিকে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছিলেন । যাঁর কথা বললাম, তিনি বাংলা কবিতার প্রধান কবিদের একজন সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ।
[লেখাটি শান্তনু বিশ্বাসের ফেসবুক ওয়াল থেকে সংগৃহীত]

x