তারুণ্যের স্বপ্ন সারথী

সনজীব বড়ুয়া

শুক্রবার , ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ at ৫:১৮ পূর্বাহ্ণ
9

মিলন চৌধুরীর জন্ম ভাষা আন্দোলনের প্রস্তুতি পর্বে, ১৯৫০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের দু তারিখে। দেশের খ্যাতনামা কবিরাজ শ্যামাচরণ সেন শর্মা’র দৌহিত্র তিনি। মা জিন্দুপ্রভা দেবী, বাবা হরিরঞ্জন চৌধুরী। কবিরাজ ভবনে তাঁর বেড়ে ওঠা। এই কবিরাজ ভবন ছিলো একসময় সংস্কৃতিচর্চার অন্যতম কেন্দ্র। তাঁর মামা চুনী সেন, অমূল্য সেন সেকালের সুপরিচিত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর বড়দা আশীষ চৌধুরী ছিলেন পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের একজন নন্দিত প্রচ্ছদ শিল্পী ও সচেতন রাজনৈতিক ধারার একনিষ্ঠ কর্মী। তাঁর বড় জামাইবাবু গোপাল বিশ্বাস, রাজনৈতিক কারণে পাকিস্তান থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই মিলন চৌধুরী শৈশব থেকেই সাংস্কৃতিক মণ্ডলে মানুষ।
তরুণ বয়সে গান আর ফুটবল উভয় ক্ষেত্রেই তাঁর প্রতিভা বিকশিত হয়েছে। ক্যারামেও ছিলেন পাকা ওস্তাদ। তবে গান ছিলো তাঁর রক্তের মাঝে, প্রাণের গভীরে। গণসংগীত, আধুনিক বাংলা গান, উর্দু গজলে তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী। ষাটের দশকের শেষ প্রান্তে ঢাকা গ্রাফিক্স আর্ট ইনস্টিটিউটে মিলন চৌধুরীর গীতিনাট্য ‘সোনালী ডানার চিল’ পরিবেশিত হয়। সম্ভবত গায়ক পরিচয়ের বাইরে এটাই মঞ্চে প্রথম তাঁর ভিন্নরূপে আত্মপ্রকাশ।
এরপর বাঙালি জাতির জীবনে মহত্তম অধ্যায় মুক্তিযুদ্ধ। দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে শেষ পর্যন্ত কোলকাতায় পৌঁছে যাওয়া।
অন্য সঙ্গীদের নিয়ে তিনি গড়ে তোলেন ‘বাংলাদেশ শিল্পী সংসদ’। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে গণ সংগীতে অংশ নেয়ার পাশাপাশি গানের দল নিয়ে ওপার বাংলার নানা জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনের জন্য। সে সময় কোলকাতার সংঘনাট্য অর্থাৎ গ্রুপ থিয়েটার চর্চা তাঁকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করে। সৃষ্টির নব দিগন্তের সন্ধান পেলেন মিলন চৌধুরী। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মধ্য দিয়ে দেশ শত্রুমুক্ত হলে তাঁরা ফিরে এলেন স্বাধীন দেশে। চট্টগ্রামে গড়ে তোলেন ‘বঙ্গশ্রী শিল্পী’ সংসদ’। রচনা করেন প্রথম নাটক ‘নরক থেকে বলছি’। পরিচিত সংগীত শিল্পী মিলন চৌধুরীকে দর্শক পেলো নাট্যকার ও নির্দেশকের নতুন পরিচয়ে। বঙ্গশ্রী থেকে পরে পরিবেশিত হয় গীতি-নৃত্য-নাটক তাঁর লেখা ও পরিচালনায় ‘কৃষ্ণচূড়া নদীর গান।’ উল্লেখ্য যে, এই প্রযোজনাটি পরবর্তীতে রূপ পায় গণায়ন নাট্য সম্প্রদায়ের প্রযোজনায় বাংলাদেশের প্রথম পথ নাটক ‘যায় দিন ফাগুনো দিন’ নামে। বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হবার পর গণায়ন গড়ে ওঠে। ১৯৭৬ এর জানুয়ারি মাসে মিলন চৌধুরী রচিত ও নির্দেশিত ‘চর্যাপদের হরিণী’ নাটকটি মঞ্চে আনে গণায়ন। এ নাটক প্রথাগত ভাবনার সম্পূর্ণ বাইরে । চর্যাপদে উল্লিখিত হরিণী ‘আপনা মাঁসে বৈরী।’ অর্থাৎ নিজের সুস্বাদু মাংসই তার শত্রু। সে জন্যেই শিকারীর কাঙ্ক্ষিত হরিণী। এ নাটকেও কাঙ্ক্ষিত হরিণীকে চাইছে সকলে। রাজা, কল্যাণ, জীবন, প্রলয়, বুদ্ধিজীবী, কৃষক, শ্রমিক সকলেই খুঁজে বেড়ায় তাকে। বিষয়ের গভীরতায় উপস্থাপনার অভিনবত্বে এ নাটক আজও স্মরণীয় হয়ে আছে। ২১ শে ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬, এ দেশের গ্রুপ থিয়েটার চর্চায় এক উজ্জ্বলতম দিন। মঞ্চের বাঁধন ভেঙে মিলনায়তনের চার দেয়ালকে অতিক্রম করে নাটক চলে এলো রাজপথে। এক বৈরী সময়ে চট্টগ্রাম শহরের রাস্তার মোড়ে মোড়ে অভিনীত হলো প্রথম পথনাটক ‘যায় দিন ফাগুনো দিন’। মিলন চৌধুরীর এ নাটক বক্তব্যে ইতিহাসকে ধারণ করেছে আর উপস্থাপনায় ঐতিহ্যকে। গায়েন-বায়েন এ নাটকে একই সঙ্গে সূত্রধর ও বিবেকের ভূমিকায় অবতীর্ণ। মৌলিক নাটক রচনার পাশাপাশি তিনি নাট্যরূপও দিয়েছেন। মিলন চৌধুরীর নাট্যরূপ ও নির্দেশনায় শরৎচন্দ্রের বিখ্যাত গল্প ‘মহেশ’ মঞ্চে এনেছে অঙ্গন থিয়েটার ইউনিট। এরপর তিনি আবার মৌলিক নাটক রচনায় ফিরে আসেন। ‘একজন পিরামিড’ তাঁর পরবর্তী নাটক। নগর জীবনের যান্ত্রিক সপ্তদীপ আর স্মৃতি হয়ে যাওয়া স্বাপ্নিক স্বপ্নদীপের মাঝখানে পড়ে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায় আশা। নাটকের বনমালী আমাদের ঐতিহ্যের প্রতীক। পরের নাটক ‘আভ্যন্তরীণ খেলাধুলা।’ নাটকের ভেতরে নাটক এটাও মিলন চৌধুরীর নিরীক্ষাধর্মী সৃষ্টি। অভিনীত নাটকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা আর অন্যদিকে সেই নাট্যদলের অন্তর্গত সংকট যেন সমানতালে চলতে থাকে এখানে।
এরপর ‘অঙ্গন’ মঞ্চে নিয়ে আসে মিলন চৌধুরীর’ নিবারণে স্বপ্ন স্বদেশ’। একটি অসাম্প্রদায়িক মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্নই আজীবন দেখেছে অবসরপ্রাপ্ত নিবারণ স্যার। গ্রামের সচেতন যুবারা তাঁর অনুগামী। কিন্তু তাঁর প্রতিপক্ষও আছে, যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলো এবং এখনও যারা ধর্মের নামে মানুষকে বিভাজিত করে তারা। ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা আতংকে দেশত্যাগ করতে চাইলে বাধ সাধেন নিবারণ স্যার। জন্মভূমির মাটি ছেড়ে তিনি কোথাও যেতে চান না। লড়াই করে বাঁচার প্রত্যয় তাঁর কন্ঠে, আর তাঁর পাশে এসে দাঁড়ায় তাঁরই অনুগামী তরুণেরা। সময়ের এক অনবদ্য উচ্চারণ এ নাটক। নাট্যকারের সমাজমনস্কতার উজ্জ্বল উদাহরণ।
মিলন চৌধুরীর পরের নাটক ‘দায়ভার’। নিতাই নামের এক সাধারণ মেকানিকের অসাধারণ মানবিক বোধের কাহিনি এ নাটক। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নামই মনুষ্য ধর্ম। অসহায় পরিবারের দায়িত্ব নেয়াই নিতাইয়ের মেয়ের কাছে শেষ পর্যন্ত মানবিক দায়ভারের পরিচয়।
মিলন চৌধুরীর নাটকের বই দু’টি-নাট্য ত্রিতয় ও আভ্যন্তরীণ খেলাধুলা। ‘নাট্য ত্রিতয়’ এ রয়েছে তিনটি নাটক-চর্যাপদের হরিণী, যায় দিন ফাগুনো দিন, একজন পিরামিড। এছাড়া ‘নিবারণের স্বপ্ন স্বদেশ’ ছাপা হয়েছে থিয়েটার পত্রিকায় এবং ‘দায়ভার’ ছাপা হয়েছে যোগসূত্র পত্রিকায়। এর আগে চর্যাপদের হরিণী মুদ্রিত হয়েছিলো থিয়েটারে এবং যায় দিন ফাগুনো দিন ও একজন পিরামিড প্রকাশিত হয়েছিলো চর্যায়। তিনি মঞ্চের মানুষ। তিনি নিজেই বলেছেন, ‘তাঁর নাটকগুলো মূলত প্রোডাকশান স্ক্রীপ্ট হিসেবেই তৈরি হয়েছে। সেজন্যেই দেখা যায়, মঞ্চে অভিনীত হওয়ার আগে তাঁর কোনও নাটক প্রকাশিত হয়নি। তাই ‘সম্পর্ক’ ‘দ্বিতীয় অধ্যায়’, ‘নাটক ভাঙার খেলা’সহ আরো কিছু নাটক আলোর মুখ দেখার অপেক্ষায়।
মিলন চৌধুরীর প্রকাশিত আরো দুটি গ্রন্থের নাম ‘১৯৭১: দেশে-দেশান্তরে’ ও ‘হরিণের মত বিকেল’। মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিগর্ভ দিনগুলোর স্মৃতিলেখ্য-১৯৭১ : দেশে দেশান্তরে। আর উপন্যাস হরিণের মত বিকেলে উঠে এসেছে চট্টগ্রামে অবস্থিত খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের জীবনচর্চার চালচিত্র।
নাট্যকার সত্তার পাশাপাশি মিলন চৌধুরীর নির্দেশক সত্তাও সমভাবে বিকশিত হয়েছে। তাঁর নিজের লেখা সবক’টি নাটকের নির্দেশক তিনি নিজেই। এছাড়া তিনি নির্দেশনা দিয়েছেন শান্তনু বিশ্বাস রচিত ‘কালো গোলাপের দেশ’ ও ‘দপ্তরী রাজ দপ্তরে’ এবং সনজীব বড়ুয়া রচিত ‘বাজলো রাজার বারোটা’ নাটক। চট্টগ্রাম লোকগাথা সম্প্রদায় প্রযোজিত ‘আমিনা সোন্দরী’ পালা নির্দেশনা তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ। নির্দেশনার পাশাপাশি তিনি সংগীত পরিচালনা করেছেন ‘রমেশ শীল’ নাটকে। এর বাইরে বেসরকারি সাহায্য সংস্থা ওডেব ও কোডেক এর প্রযোজনায় বেশ কয়েকটি সচেতনতামূলক নাটকও তিনি নির্মাণ করেছেন। গান রচনা ও সুরারোপের ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান কম নয়।
নিজের সৃষ্টিশীল কর্মের পাশাপাশি যে কাজটির জন্য তিনি সবচেয়ে আলোচিত তা হলো তারুণ্যের স্বপ্নসারথী হওয়া। সমকালের সম্ভাবনাময় তরুণদের মনে সৃষ্টিশীলতার সলতেটাকে জ্বালিয়ে দেয়ার কাজটি মিলন চৌধুরী করেছেন যত্নের সাথে। কবি, ছড়াকার, গল্পকার, চিত্রকর, গায়ক, অভিনেতা চলচ্চিত্রকর্মী-যার মধ্যে তিনি আগুনের দেখা পেয়েছেন। তাকে উসকে দিয়ে সৃষ্টির পথে ঠেলে দিয়েছেন। তুখোড় আড্ডাবাজ মিলন চৌধুরীর কাছ থেকে প্রাণিত হননি সমকালে এমন তরুণের সংখ্যা বিরল যাদের অনেকেই জাতীয় পর্যায়ে সমাদৃত ও স্বীকৃতও বটে।
একথা হয়ত অনেকেই স্বীকার করবেন, প্রতিভার বিচারে তাঁর অর্জন কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছেনি। এর দায়ভার তাঁর বেহিসাবী ব্যক্তি জীবনের উপর কমবেশি বর্তায়। তারপরও মিলন চৌধুরীর প্রাপ্তিযোগ একেবারে কম নয়। তাঁর নিজের দল গণায়ন, অঙ্গন তাঁকে সংবর্ধিত করেছে। এছাড়া চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমি, চট্টগ্রাম গ্রুপ থিয়েটার সমন্বয় পরিষদ, বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশান (চট্টগ্রাম বিভাগ), চট্টগ্রাম লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্র,চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ঐকতান সংস্কৃতি পরিষদ, ঢাকার বটতলা (নাট্যদল) তাঁকে নানান সময়ে সম্মাননা ও পদকে ভূষিত করেছেন। তাঁকে নিয়ে কবিতা ও গদ্য রচনাও হয়েছে একাধিক।
মিলন চৌধুরীর বড় সাফল্য মনের তারুণ্যকে বাঁচিয়ে রাখা। বার্ধক্যের জড়তাকে ঝেড়ে ফেলে সৃষ্টির পথে পথচলা এখনো সচল। এ.কে. খান ফাউন্ডেশানের সাথে যুক্ত থেকে তিনি এখনো প্রণোদনা ও প্রশিক্ষণের কাজ করছেন। জীবনের পথচলায় সত্তর বছর পূর্ণ হলো তাঁর। আমাদের প্রত্যাশা, তিনি আরও বহুদিন তারুণ্যের স্বপ্ন সারথী হয়ে সৃষ্টির পথে নিজেকে সক্রিয় রাখবেন।