তারিফের জন্মদিন

ফারজানা রহমান শিমু

বুধবার , ৩০ অক্টোবর, ২০১৯ at ১০:১২ পূর্বাহ্ণ
22

মাঝে মাঝে টিচারের মনটা বেশ নরম থাকে। তাই সুইমিং পুলে নামার কথা বলাতে আধঘন্টা আগে ছেড়ে দিয়েছে টিচার। তাড়াহুড়া করে বাসায় ফিরছিল তারিফ। গেইটের কাছে পৌঁছতে কিসের সাথে যেন হোঁচট খেয়ে গেল। হুমড়ি খেয়ে পড়ল সে। ব্যাগ ছিটকে গেল একদিকে আর হাতে ধরা গাইড বইটা অন্যদিকে। একটা ছেলে দৌড়ে এসে তার হাত ধরে টেনে তুলল। ব্যাগ আর বইটা কুড়িয়ে এনে জানতে চাইল, ‘ব্যথা পেয়েছেন, তারিফ ভাইয়া?’ বিস্মিত তারিফের ভ্রু কুঁচকে উঠল। ব্যথা ভুলে সে জানতে চাইল, ‘তুমি কে? আমাকে তুমি চেন?’ ‘হ্যাঁ, আপনাদের সবাইকে চিনি। আদনান ভাইয়া, মাহী ভাইয়া, রাফি ভাইয়া, সাইমন ভাইয়া সব্বাইকে।’ এরপর হাত তুলে সামান্য ওদিকে দেখিয়ে বলল, ‘ঐ যে চায়ের ফ্লাঙ আছে, ওটা আমার জায়গা। প্রতিদিন চা বেচি আর আপনাদেরকে খেলতে দেখি।” তারিফ অবাক হয়ে ছেলেটার দিকে ভালো করে তাকায়। তার চেয়েও ছোট একটা ছেলে চা বিক্রি করে! এরি মধ্যে ব্যাগ ও বই তার হাতে এসে গেছে। অভ্যাসবশত: থ্যাঙ্ক ইউ বলে চলে যাওয়ার সময় শুনতে পেল ছোট ছেলেটা ওয়েলকাম বলছে।
পরদিন স্কুলে যাওয়ার সময় তারিফ এদিক ওদিক চোখ বুলাল। ছেলেটাকে দেখা গেলনা কোথাও। স্কুলে ২/৩ বার মনে পড়ল তার কথা। বাসায় ফেরার সময়ও তার দেখা মিলল না। এরপর টিচারের বাসায় যাওয়ার সময় মনেই রইলনা তার কথা। কিন্তু সন্ধ্যায় ফেরার সময় দেখতে পেল একটি ফ্লাঙ আর কিছু বিস্কুট নিয়ে ছেলেটা বসে আছে। তারিফ চকলেট খাচ্ছিল। হাত বাড়িয়ে ছেলেটাকে ডাকল সে। পকেট থেকে একটা চকলেট নিয়ে তাকে দেওয়ার সময় জানতে চাইল ‘তোমার নাম কি?’ ছেলেটা বলল ‘বাবু’। তারিফ বলল, ‘সকালে তুমি কোথায় থাক?” বাবু বলল, “স্কুলে। আমি ক্লাশ ফাইভে পড়ি। তাই সকালে চা বেচিনা। বিকালে বেচি।’ তার চেয়ে তিন বছরের ছোট ছেলেটা স্কুলে যায়, আবার চাও বিক্রি করে শুনে তারিফ খুব অবাক হল। সে জানতে চাইল, ‘তুমি চা কেন বিক্রি কর? তুমিতো ছোট।’ ছেলেটা স্বাভাবিক ভাবে বলল, ‘আমার বাবার শরীর খারাপ। আগের মতো রিকশা চালাতে পারেনা। তাই আমি কাজ করি। ঐ যে তরকারির ভ্যান দেখছেন, আমি ওই রকম একটা ভ্যান কিনার জন্য টাকা জমাচ্ছি। বাবাকে ভ্যান কিনে দিলে আর রিকশা চালাতে হবেনা’। এরকম অদ্ভুত কথা তারিফ জীবনেও শোনেনি। ক্লাশ ফাইভের একটা ছেলে বাবার জন্য ভ্যান কিনবে? তারিফ ‘আচ্ছা’ বলে ভেতরে ঢুকে গেল।
তারিফের মনটা কেমন যেন ভার হয়ে যায়। নাস্তা খেতে বসে ওর প্রিয় পাস্তা তেমন লক্ষ্য করেনা। ছোট ভাইটার বকবক শুনে ধমক দেয়না। গেইম খেলার জন্য মোবাইল হাতে নিয়েও রেখে দেয়। কেবল মনে হয়, ওর যা দরকার, সবতো আব্বু এনে দেয়। ও কি আব্বুর জন্য এরকম ভ্যানের কথা ভাবে? দুর ছাই, আব্বু ভ্যান দিয়ে কি করবে? আব্বুরতো অনেক টাকা। এলোমেলো ভাবনাগুলো তাকে অস্থির করে তোলে। একসময় সে সবকিছু মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে খেলতে চলে যায়।
মাহীর জ্বর হওয়াতে দুদিন ধরে খেলতে আসেনা সে। রাফি, সাইমন ও আদনান ওর আগেই ছাদে এসে গেছে। কিছুক্ষণ বল নিয়ে ছুটোছুটি করে ওরা। এরপর খানিকটা সময় গল্প করতে বসে। হঠাৎ তারিফ বলে উঠে, ‘আমাদের বিল্ডিংয়ের খুব কাছে একটা ছেলে চা বিক্রি করে। তোরা দেখেছিস?’ ওরা একে অন্যের মুখ চাওয়া চাওয়ি করে। তারিফ সামান্য অসহিষ্ণু স্বরে বলে, “আরে বিল্ডিংয়ের ডান পাশে ছোট একটা ছেলেকে চা বিক্রি করতে কখনো দেখিসনি?” রাফি বলল, “তাতে তোর কি প্রবলেম?” তারিফ সামান্য বিব্রত ভঙ্গিতে বলল, “কোন প্রবলেম নেই।” আদনান ফোড়ন কাটল, “তুইও কি চা বিক্রি করবি নাকি?” এক যোগে তিনজনই হেসে উঠল।
তারিফের কান লাল হয়ে উঠল। মেজাজ খারাপ হলে তার কান লাল হয়ে যায়। সে দাঁড়িয়ে গিয়ে বলল, “তোদের সাথে কথা বলাই উচিত নয়।” রাফি তাড়াতাড়ি বলল, “রাগ করছিস কেন, দোস্ত? জাস্ট কিডিং। এবার বলতো, যে ছেলেটা চা বিক্রি করে, তার কি হয়েছে?’ আদনান তারিফের হাত ধরে টান দিয়ে তাকে বসিয়ে দিতে দিতে বলল, ‘সরি ইয়ার, বলতো কি হয়েছে।’ তারিফের রাগ পড়ে যায়। এরপর বলে, “আমি সেদিন মিসের বাসা থেকে ফেরার সময় পড়ে গিয়েছিলাম। ছেলেটা আমাকে তুলতে এসেছিল। ওর নাম বাবু। ক্লাস ফাইভে পড়ে।” সাইমন বলল, “বলিস কি? স্কুলেও যায়, আবার চাও বেচে?” তারিফ বলল,‘হ্যাঁ, ওর বাবা নাকি অসুস্থ। তাই সে তরকারির ভ্যান কেনার জন্য চা বেচে।” চার বন্ধুর মধ্যে সাইমন একটু বেশি ম্যাচিউরড। সে বলে উঠল, ‘পাগল! চা বেচে ভ্যান কেনা যায়?’ তারিফ বলল, ‘কেন? ভ্যানের কি অনেক দাম?’ চুপসে যায় সাইমন। সেও ঠিক জানেনা কত টাকা দিলে ভ্যান কেনা যায়। রাফিটা বড্ড আবেগী। হঠাৎ বলে উঠল, ‘দ্যা আইডিয়া! আমরা সবাই যদি ওকে হেল্প করি, কেমন হয়?’ তারিফ উত্তেজিত কন্ঠে বলে, ‘কিভাবে?’ রাফি বলল, ‘আমাদের জমানো টাকা দিয়ে।’ ট্রাফিক পুলিশের মত হাত তুলে আদনান ওদের থামিয়ে দিয়ে বলে, ‘আগেতো জানতে হবে ভ্যানের দাম কত।’ তিনজনই চুপ মেরে যায়।
পরদিন ওরা মাহীকে দেখতে যায়। চোখ মুখ বসে গেছে তার। জ্বর কমেছে, তবে শরীর দুর্বল। বন্ধুদের দেখে বেশ খুশী হয় সে। একাকী শুয়ে থেকে বিরক্ত হয়ে গেছে। চার বন্ধু ওকে বাবুর বিষয়টি জানায়। মাহীর বুদ্ধি অন্যদের চেয়ে তীক্ষ্ণ। পুরো ঘটনা শোনামাত্র সে বলল, ‘সেলিম আংকেল বলতে পারবে ভ্যানের দাম কত।’ মূলত: সেলিম হল ওদের সিকিউরিটি গার্ড। সব ছেলেদের সাথে ওর ভাল সম্পর্ক। তারিফ, আদনান, রাফি ও সাইমনের আর তর সইল না। একটু পরই তারা সেলিমের খোঁজে নীচে নেমে গেল। ওদের প্রশ্ন শুনে সেলিমতো অবাক। ভ্যান দিয়ে কি করবে ওরা? তবু মাথা চুলকিয়ে আন্দাজ করে বলল, ‘১২ থেকে ১৫ হাজার টাকার মধ্যে হয়ে যাবে।” সেদিনের মত ওরা যে যার ঘরে ফিরে গেল।
পরদিন টিচারের বাসায় যাওয়ার সময় তারিফ বাবুকে হাতের ইশারায় ডাকল। বলল, ‘তুমি যে ভ্যান কিনতে চাচ্ছো, তোমার কাছে কত টাকা আছে?’ বাবু একগাল হেসে বলল, ‘৫৭৩ টাকা। আমি জমিয়েছি।’ তারিফ হাসবে না কাঁদবে, বুঝতে পারল না। ছেলেটির বোকামি দেখে মাথা নাড়তে নাড়তে পড়তে চলে গেল।
কয়েকদিন ধরে তারিফের অস্থিরতা টিচারের নজরে পড়েছে। তাই তিনি জানতে চাইলেন, “ তোমার কি হয়েছে আব্বু? খুব অ্যাপসেন্ট লাগছে!” তারিফ অবাক হয়ে বলল, ‘আপনি কেমনে বুঝলেন, মিস?’ টিচার হেসে বললেন, ‘বাবা, মা ও টিচার বাচ্চাদের সব বুঝতে পারে। বলতো কি হয়েছে।’ তারিফ সব কিছু খুলে বলল। টিচার খুব খুশি হয়ে বললেন, “তোমাদের টাকা শর্ট পড়লে আমিও হেল্প করব। একটা কথা সবসময় মনে রাখবে, ভাল ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়া তেমন কঠিন নয়। কিন্তু ভাল মানুষ হওয়া খুব কঠিন। সবসময় ভাল কাজ করবে। দেখবে একদিন ঠিক ঠিক ভাল মানুষ হয়ে উঠেছ।’
চার বন্ধুর সব টাকা মিলে ৯২০০ টাকা হল। ওরা ঠিক করল টিচারের কাছ থেকে সাহায্য নেবে। এর মধ্যে তারিফের জন্মদিন পড়ে গেল। ৭ই মে তার জন্মদিন। সে বুদ্ধি করে চার বন্ধুকে নিয়ে ৬ই মে বাবার কাছে গেল। সোসাইটির একটা মিটিং সেরে তারিফের বাবা ও অন্যান্য আংকেলরা সবাই মিলে গল্প করছিলেন। পাঁচ ছেলেকে একত্রে দেখে তারাও বিস্মিত হলেন। মূলত: সব ছেলেরা একযোগে সাহস সঞ্চয় করে বাবাদের সামনে কথাটা বলতে এসেছে। তারিফ খানিকটা ইতস্তত করে জানাল, ‘সরি বাবা, আমার কথাটা ইমপর্টেন্ট বলে ডিস্টার্ব করছি।’ উনি সামান্য প্রশ্রয়ের হাসি হেসে বললেন, ‘বলো’। রাফি অধৈর্য্য কন্ঠে বলে ফেলল, ‘তারিফ বার্থ ডে সেলিব্রেট করবেনা, আংকেল। আমরা ৫৮০০ টাকা ক্যাশ চাই।’
রুমের মধ্যে পিনপতন নীরবতা নেমে এলো। পাঁচ ছেলের বাবারা মুখ তুলে ছেলেদের দিকে তাকাল। তারিফ তখন শান্ত কন্ঠে পুরো ঘটনাটা জানাল। পুত্রগর্বে বাবাদের মুখগুলো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। এত কম বয়সে তাদের ছেলেরা এত ভালো কাজের চিন্তা করতে পারে, একথা তাদের মনেই আসেনি।
তারিফের জন্মদিনটা বড্ড ধূমধাম করে হল। সবার পক্ষ থেকে বাবুর বাবার হাতে নগদ ২০,০০০ টাকা দেয়া হল ব্যবসা করার জন্য। আর ছোট্ট বাবু কেকের বিশাল একটা টুকরো তারিফকে খাইয়ে দিয়ে চিৎকার করে বলল, “হ্যাপি বার্থডে টু তারিফ ভাইয়া”।

x