তামাকের রাজ্যে সবজি বিপ্লব

যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হওয়ায় কাকারায় কৃষকরা উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন

ছোটন কান্তি নাথ, চকরিয়া

রবিবার , ১৭ নভেম্বর, ২০১৯ at ৯:৪৬ পূর্বাহ্ণ
131

প্রায় দুই যুগ ধরে তামাকের আগ্রাসনে জর্জরিত ছিল কক্সবাজারের চকরিয়ার মাতামুহুরী নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে উঠা ছোট্ট গ্রাম কাকারা। গ্রামটিতে তামাকের আগ্রাসন বিদ্যমান থাকলেও গত দুই-তিন বছর ধরে এই কাকারা এখন সবজি চাষে বিপ্লব ঘটাচ্ছে। প্রতিদিন ভোর থেকে সকাল ১০টার মধ্যে এই গ্রাম থেকেই দেশের বিভিন্নপ্রান্তে যাচ্ছে অন্তত ১৫টি ট্রাকভর্তি সবজি। এই সবজি কাকারা থেকে সরাসরি পৌঁছে যাচ্ছে ১শ কিলোমিটার দূরের চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজার এবং কুমিল্লার নিমসা আড়তে। মূলত ভালো সড়ক যোগাযোগের কারণে ছোট্ট এই গ্রামে সবজি চাষে বিপ্লব হয়েছে।
কৃষকেরা জানান, কাকারা ইউনিয়নের সাত নম্বর ওয়ার্ডে নির্মিত মুক্তিযোদ্ধা জহিরুল ইসলাম ছিদ্দিকী সড়কটি প্রতিদিন সকালে ভরপুর হয়ে উঠে রকমারি সবজিতে।
কৃষকরা নিজের ক্ষেত থেকে সবজি তুলে কাঁধে নিয়ে সড়কের ওপর রাখছেন। আর নির্ধারিত ট্রাক এসে সেগুলো ভর্তি করে নিচ্ছে। এর আগেই দাম নির্ধারণ করে মাপা হচ্ছে ওজন।
কৃষকরা বলছেন, প্রতিদিন এই ওয়ার্ডেই ১০ হাজার কেজির বেশি সবজি উৎপাদন হচ্ছে। সেগুলো শীতের আগাম সবজি। শীতের মৌসুম আসবে আরো অন্তত ১৫ দিন পর। তখন উৎপাদন আরো বাড়বে। এখনকার সবজির মধ্যে আছে ঝিঙে, চিচিঙা, তিতকরলা, ঢেঁড়স, লাউ, কুমড়া, বরবটি, মুলা, বেগুন, মরিচ ইত্যাদি।
তারা জানান, কয়েক বছর আগেও এলাকার কৃষকরা সড়ক যোগাযোগ ঠিক না থাকায় ভালো দাম না পেয়ে পার্বত্য লামা ও আলীকদমের পাহাড়ে গিয়ে সবজি চাষ করতেন। এখন সেই কৃষকরাই গ্রামে ফিরে এসেছেন এবং সবজি চাষে বিপ্লব ঘটিয়েছেন।
জানতে চাইলে কৃষক মোহাম্মদ তাহের ও মোহাম্মদ শামীম দৈনিক আজাদীকে বলেন, একসময় তামাকের আগ্রাসনের পাশাপাশি সড়ক যোগাযোগ না থাকায় পাহাড়ে গিয়ে সবজির আবাদ করেছি। কয়েকবছর ধরে সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হওয়ায় পাহাড়ের বদলে এখন নিজের গ্রামে সবজির আবাদ করছি। এতে অনেক বেশি লাভবান হচ্ছি। এখানে লামা-আলীকদমের মতো পথে-পথে চাঁদা দিতে হয় না। পাহাড়ের চেয়ে অনেক ভালো দাম পাচ্ছি।
আমীর মোহাম্মদ ও মোহাম্মদ আমীন বলেন, ‘কৃষকরা ক্ষেত থেকে সবজি কাঁধে নিয়ে সড়কে আসছেন। স্কেলে ওজন মাপছেন। আড়তে যোগাযোগ করতে হচ্ছে না। আড়তদাররাই খবর নিয়ে গ্রামে চলে আসছেন। সবজি কিনে নিয়ে ছোট ট্রাকে তুলে দেশের বিভিন্নস্থানে নিচ্ছেন। মূলত বীর মুক্তিযোদ্ধা জহিরুল ইসলাম ছিদ্দিকী সড়কটিই আমাদের এই সবজি চাষে এই বিপ্লব ঘটিয়েছে।
প্রবাস থেকে দেশে এসে ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি সবজি চাষ করছেন মোহাম্মদ এহেসান। তিনি বলেন, ‘খুবই আগ্রহ নিয়ে চাষ করছি। উৎপাদন ভালো, মুনাফাও ভালো পাচ্ছি।’
এদিকে ভালো দামের কারণে গ্রামে যেমন নতুন কৃষক তৈরি হয়েছে, তেমনি ব্যবসায়ীর সংখ্যাও বাড়ছে। যারা মূলত চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, কুমিল্লার বিভিন্ন আড়তে যোগাযোগ করে গ্রাম থেকে সবজি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। তারা হলেন, মোহাম্মদ হায়দার আলী, আবুল ফজল, সফুর আলম, মোহাম্মদ আতিকুর রহমান।
তাদের একজন মোহাম্মদ রিদুয়ান বলেন, ‘সড়ক যোগাযোগ ভালো হওয়ায় আমার মতো অনেকেই এই কাজটি করছেন। কৃষকরা সবজি উৎপাদন করছেন, আমরা বেচাকেনার কাজটি করছি। ফলে একজনকে সব কাজ করতে হচ্ছে না। গ্রামের ছেলে বলে সবজির সবচে ভালো দামটি দিতে চেষ্টা থাকে আমারও।’
স্থানীয় মোহাম্মদ শফিউল্লাহ ও এরশাদুল ইসলাম বলেন, কৃষকরা নিজেদের বুদ্ধি-মেধা খাটিয়ে এই সবজি বিপ্লব করছেন। এখানে যদি কৃষি বিভাগ মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা করে ভালো বীজ, কীটনাশক ব্যবহারের নির্দেশনা দিতেন, তাহলে আরো বেশি সবজি উৎপাদন হতো। ভালো দামও পেতেন।
কল্লোল আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক শাহাদাত হোসেন ছিদ্দিকী বলেন, চকরিয়া উপজেলা সদরের সাথে যোগাযোগের প্রধান সড়কটি চার বছর আগেও ছিল বিধ্বস্ত-বিচ্ছিন্ন। এই সড়কের কারণে এলাকার বাসিন্দারা গ্রাম ছেড়ে পৌরসভায় গিয়ে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন। তখন সবজি চাষ এবং বিপণনের কথা চিন্তাই করতে পারেননি এলাকার কৃষকরা। পরে গ্রাম ছেড়ে তারাও পাহাড়ে গিয়ে সবজি চাষ করেছেন। কয়েক বছরে সবজি চাষের জমি ঘিরে মুক্তিযোদ্ধার নামে সড়কটি এলাকার এই অভাবনীয় পরিবর্তন এনে দিয়েছে।
স্থানীয় মেম্বার নাছির উদ্দিন নাছু বলেন, ‘একমাত্র ওই সড়কটি মানুষকে কৃষিচাষে উদ্বুদ্ধ করেছে। এখন কাঁধে করে সবজি বিক্রি করতে হয় না। সাত নম্বর ওয়ার্ডের ঘুনিয়া থেকে মিনিবাজার পর্যন্ত পুরোটাই এখন সবজি গ্রাম। এখন প্রয়োজন তাদের জন্য একটি আড়তের ব্যবস্থা করা।’
এ প্রসঙ্গে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ব্লক সুপারভাইজার সৈয়দ মো. জসীম উদ্দিন বলেন, কাকারা ইউনিয়নের ২০০ হেক্টর জমিতে পুরোবছরই সবজি উৎপাদন হয়। তন্মধ্যে সবজি বিপ্লব ঘটেছে ইউনিয়নের সাত নম্বর ওয়ার্ডে। এখানে প্রায় ৫০ হেক্টর জায়গায় সবজির উৎপাদন চলছে। এতে প্রতিদিন কম করে হলেও ১০ টন উৎপাদিত সবজি দেশের বিভিন্নপ্রান্তে যাচ্ছে। আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন প্রান্তিক কৃষক।’
দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে কাকারা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান শওকত ওসমান দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘আমাদের ইউনিয়নটি তামাকের জন্য বিখ্যাত থাকলেও আস্তে আস্তে সেই তকমা মুছতে শুরু করেছে। এখন বাজারে সবজির ভাল দাম পাওয়ায় এবং সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হওয়ায় সবজি চাষে বিপ্লব ঘটাচ্ছেন প্রান্তিক কৃষকেরা।
সম্প্রতি এই এলাকা ঘুরতে এসে সবজির আবাদ দেখে কক্সবাজার-১ আসনের এমপি জাফর আলম খুবই আনন্দিত হন। তিনি নিজেও বেশ কিছু সবজি কিনে নিয়ে যান। যে পরিমাণ সবজি সাত নম্বর ওয়ার্ডে উৎপাদিত হচ্ছে, তাতে একটি আড়ত স্থাপন করা গেলে বিপণন কাজটা সুন্দর হবে। আমরা পরিকল্পনা নিয়েছি ইউনিয়ন পরিষদ থেকে এই ব্যবস্থা করে দিতে।’

x