তথ্যপ্রযুক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে

শনিবার , ৩০ নভেম্বর, ২০১৯ at ৫:০০ পূর্বাহ্ণ

অর্থনীতি, সংস্কৃতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য খাতেই নারীরা যখন বীরদর্পে এগিয়ে যাচ্ছে- তখনো আইসিটি খাতে নারীদের অংশগ্রহণ আমাদের দেশে উল্লেখযোগ্যভাবে সাড়া ফেলতে পারেনি। তবে এ অবস্থার দিনদিন পরিবর্তন হচ্ছে। এটা আশা জাগানিয়া খবর। এটা বলা বাহুল্য যে- আমরা এখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের শেষ সময়টা পার করছি- নতুন মাধ্যম প্রযুক্তিই যেখানে উপজীব্য আধেয়। অথবা বলতে পারি আমরা বাস করছি- যোগাযোগের চতুর্থ ধাপে (কমিউনিকেশান-৪), যেখানে রাজত্ব করছে নতুন-নতুন প্রযুক্তি। একসসময় হাতের মোবাইল ফোন এবং এর ভিতরে ইনস্টল করা বিভিন্ন অ্যাপ বা প্রযুক্তিই যে পুরো পৃথিবীতে রাজত্ব করবে জীবন চলার প্রতিটি পদক্ষেপে- এরচেয়ে তো বড় কোনো সত্যি নেই।
তাই সময় এখন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এটাও সত্য যে, ইতোমধ্যে নারীরা নানা বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে দেশের আইসিটি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। তরুণ সমাজ এখন বিভিন্ন সামজিক সাইটের মাধ্যমে তথ্যের আদান-প্রদান করছে। তবে এত কিছুর পরেও এখানে একটি ‘জেন্ডার ডিভাইড’ রয়ে গেছে। এই বিভাজন তথা প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হলে গ্রাম-গঞ্জের আইসিটিখাতে নারীদেরকে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণসহ যাবতীয় উদ্যোগ সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নিতে হবে। যেহেতু দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী সেহেতু এই গুরুত্বপূর্ণ অংশকেও প্রযুক্তির জ্ঞানে জ্ঞানী করতে পারলে নারীরা কার্যকর অর্থেই দেশের সার্বিক উন্নয়নে মোক্ষম ভূমিকা পালন করতে পারবে।
বলা বাহুল্য যে- আমাদের দেশে অনেক নারী ঘর থেকে বের হতে চান না। কিন্তু, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নিয়ে ইন্টারনেটের মাধ্যমে নিজের ঘরে বসেই আউটসোর্সিং বা ফ্রিল্যান্সিং করে দেশি-বিদেশি প্রচুর মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। এমনকি স্বল্প শিক্ষিত নারীদেরও সামান্য প্রশিক্ষণ দিতে পারলে ভালো একটি সফলতা পাওয়া যাবে। এই তথ্য চারদিকে ছড়িয়ে দিতে হবে।
আমি মনেকরি, আইসিটি খাতে একজন নারী যদি তার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারেন, তবে সামাজিক ধ্যান-ধারণা, ধর্মীয় গোড়ামি অনেকাংশে কমে আসবে। নারীর অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন করতে হলে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নারীর অংশগ্রহণ জরুরি।
বর্তমানে দেশে বিদ্যালয় পর্যায় থেকে তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মনে রাখা দরকার যে- বিশ্বায়নের এই যুগে নারীর ক্ষমতায়নে কোনো দেশকে এগিয়ে যেতে হলে কিংবা কোনো জাতিকে উন্নত করতে হলে আইসিটিতে নারীর অংশগ্রহেেণর বিকল্প নেই। দেশের প্রায় ২৫ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ে পড়াশুনা করছে। তবে সামাজিক বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে নারীরা কর্মক্ষেত্রে আশানুরূপ সাফল্য লাভ করতে পারছে না। সরকারি হিসাব মতে, কর্মক্ষেত্রে তথা তথ্যপ্রযুক্তি খাতে মাত্র ১২ শতাংশ নারী কাজ করছেন। তার মধ্যে অধিকাংশই প্রাথমিক বা মধ্যম পর্যায়ের কাজ করেন, নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে নারীর অবস্থান শতকরা ১ শতাংশের চেয়েও কম। দৃশ্য-অদৃশ্য অসংখ্য বাধার জালে আটকে যায় আমাদের নারীরা।
বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক (বিডিওএসএন) এর একটি জরিপে দেখা গেছে, তথ্যপ্রযুক্তিতে পড়াশুনা করছে এমন শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাত্র ১ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে প্রোগ্রামিংকে পেশা হিসেবে নিতে আগ্রহী। অথচ বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ইঞ্জিনিয়ারিং ও গণিত বিষয়ে কর্মক্ষেত্রে সুযোগ প্রতি বছর বাড়ছে ১৭ শতাংশ হারে। যেখানে অন্যান্য খাতে এ বৃদ্ধির পরিমাণ মাত্র ১০ শতাংশ। শুধু বাংলাদেশ নয়, সমগ্রবিশ্বেই প্রকৌশল ও প্রযুক্তিখাতে নারীদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম। ইউনেস্কোর একটি রিপোর্টে দেখা গেছে, জাপানের মতো প্রযুক্তিতে উন্নত একটি দেশে মাত্র ৫ শতাংশ নারী প্রকৌশলী কাজ করছেন। কোরিয়াতে এ হার ১০ শতাংশ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯ শতাংশ এবং ফিনল্যান্ডে ২২ শতাংশ। সব দেশকে ছাপিয়ে এক্ষেত্রে সবার উপরে অবস্থান করছে শ্রীলঙ্কা, সেখানে প্রায় ৫০ শতাংশ নারী প্রকৌশলী রয়েছেন।
১৯৯৮ সাল থেকে বাংলাদেশ প্রতিবছর এসিএম-আইসিপিসি’র ওয়ার্ল্ড ফাইনালে অংশগ্রহণ করছে। কিন্তু গত ২০ বছরে একজনও নারী প্রোগ্রামার বাংলাদেশ থেকে এ আসরের ফাইনালে যেতে পারেনি। ২০১১ সালের পর থেকে গণিত অলিম্পিয়াডের আন্তর্জাতিক আসরে কোন নারী-শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেনি। একই অবস্থা ফিজিঙ অলিম্পিয়াড এবং ইনফরমেটিঙ অলিম্পিয়াডেও (সূত্র : ইন্টারনেট, ড. লাফিফা জামাল, তথ্যপ্রযুক্তিতে নারী : কতটা এগোচ্ছে দেশ?)।
অথচ দেশের পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পরীক্ষাগুলোর ফলাফলেও আমরা প্রায়শই মেয়েদের আধিপত্য দেখতে পাই। তাহলে কেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিখাতে মেয়েরা পিছিয়ে পড়ছে? অথবা এগুচ্ছে না কেনো? নারীর মেধা তো কোনো অংশেই পুরুষের চেয়ে কম নয়। সেই মেধাকে সঠিকভাবে কাজে লাগালেই এক্ষেত্রে সফলতা আসবে। কিন্তু, রাষ্ট্রকেই সেই দায়টা নিতে হবে সর্বাংশে। এটাই হতে পারে সবেেচয়ে বড় উদ্যোগ।

x