ঢেঁকির ছন্দময় শব্দ শোনা যায় না

শনিবার , ৭ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৫:০১ পূর্বাহ্ণ

একটা সময় ছিল, যখন গ্রাম বাংলার পল্লী মা-দাদীদের ঢেঁকিতে ছন্দময় শব্দে পাড়ার আবাল বৃদ্ধ বনিতার প্রভাতের ঘুম ভেঙে যেত। নিস্তব্ধ প্রকৃতিকে সরবতায় ভরিয়ে দিত। নবান্নের উৎসব কিংবা শীতের হিম প্রভাতে নতুন চালের তৈরি গুঁড়িতে মা-চাচী আর দাদা-দাদীদের কোমল হাতের স্পর্শে তৈরি হত ভাপা, পলি পুয়া, পাটিসাপটা, চিতইসহ হরেক রকমের মজাদার পিঠা। পরিবারের সবাই এক সাথে কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে গরম গরম পিঠা খাওয়ার মনোমুগ্ধকর পরিবেশটাও ছিল সত্যিই স্মরণীয় করে রাখার মতো। পিঠার জনপ্রিয়তা বজায় থাকলেও কালের আবর্তনে ঢেঁকি অতীত স্মৃতির অতল গহ্বরে স্থান করে নিচ্ছে। ক্রমান্বয়ে হারিয়ে যাচ্ছে পল্লী চারুময় লোকাচার থেকে। রাতের শেষ প্রহরের সূচনা হতেই মা-দাদী চাচীদের ঢেঁকিতে বাড়া দেয়ার পর্ব প্রস্তুতি শুরু হত। তাদের বাড়া দেয়ার সৃষ্টি সুর আর ছন্দময়মুখর সরবতা প্রকৃতিকে জাগিয়ে তুলতো। কখনোবা দিবসের কর্মব্যস্ততার অবসান ঘটিয়ে রাতের আহার শেষ করে শুরু হত ঢেঁকির কর্মমুখর আয়োজন। ছোট কাটো কল্প কাহিনী শ্লোকের রঙ্গাত্মক প্যাঁচ আর হাসি তামাশার মধ্যে দিয়ে কার্যক্রম এগিয়ে চলত। ঘুমহীন রাতভর গুঁড়ি তৈরি করে পিঠা বানানোর ধুম লেগে থাকত পাড়ার আনাচে কানাচে। নতুন চালের গুঁড়ির তৈরি করা পিঠা আত্মীয়ের বাড়ি বাড়ি পাঠানোর রেওয়াজও ছিল পল্লীর সর্বত্রই। পল্লী বালারা কোমরে আঁচল বেঁধে কখনো দিনব্যাপী আবার কখনো রাতভর ঢেঁকিতে ধান বানা চিড়া তৈরির চাল, হলুদ, মরিচ, মসলা গুঁড়ো করত। তাছাড়া বিয়ে, আকিকা, খৎনা, শবেবরাত, ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ও গুঁড়ি দিয়ে তৈরি হত মজার মজার খাবার। ঢেঁকি তৈরিতে প্রধানত: দেশীয় মোটা গাব গাছের গোড়ার সোজা অংশ হতে সোয়া দুই থেকে আড়াই মিটার লম্বা একটি টুকরা নিয়ে কুঠার দিয়ে কাঠামো তৈরি করে সাধ্যানুযায়ী বাঁকা ও নকশা করে স্বতন্ত্র একটি ঘরে এটিকে স্থাপন করা হয়। যা গ্রাম বাংলায় ঢেঁকি ঘর নামে পরিচিত। সাধারণত: ঢেঁকিতে কাজ করতে মোট চারজন লোকের প্রয়োজন হয়। দু’জন বাড়া দেয়ার কাজে। একজন চালুনি দিয়ে চালার কাজে আর অন্যজন ঢেঁকিতে দেয়া উপাত্তগুলো নেড়ে দেয়ার কাজে ব্যস্ত থাকেন। তবে কাজের পরিমাণ কম হলে কখনো কখনো দু’জন দিয়েও চালিয়ে নেয়া যায়। বর্তমানে প্রযুক্তির উন্নতিতে ধান, চাল, হলুদ, মরিচ, মসলা পেষাইয়ের কল বের হওয়ায় ঢেঁকির কদর লোপ পেতে যাচ্ছে। গ্রাম বাংলার পাড়ায় পাড়ায় গৃহস্থের ঘরে এখন আর ঢেঁকির সুমধুর ধুপধাপ তাল পরিলক্ষিত হচ্ছে না। আর ভোরে ঘুমটাও যেন সহজে ভাঙতে চায় না। এমনি করে হারিয়ে যেতে বসেছে আমাদের জাতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক ঢেঁকি শিল্প।
– এম. এ. গফুর, বলুয়ার দীঘির দক্ষিণ-পশ্চিম পাড়, কোরবাণীগঞ্জ, চট্টগ্রাম।

x