ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয়

অধ্যাপক নইম কাদের

শনিবার , ৩ আগস্ট, ২০১৯ at ৪:৫৭ পূর্বাহ্ণ
870

বর্তমানে সারা দেশে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে। এই সময়ে বাংলাদেশে ডেঙ্গু এক মহা আতঙ্কের নাম। সর্বস্তরের মানুষের মনে প্রচণ্ড ভয় ঢুকে পড়েছে। মানুষ ডেঙ্গু অতঙ্কে ভোগছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য বিভাগে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। ডেঙ্গু এমন এক রোগ যা শুধু চিকিৎসা দ্বারা প্রতিরোধ সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার সম্মিলিত প্রচেষ্টা। ভয় না পেয়ে আমাদের উচিত ব্যপক গণসচেতনতা তৈরি করা, সম্মিলিতভাবে ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রচেষ্টা চালানো। ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রত্যেককেই এগিয়ে আসতে হবে।
ডেঙ্গু কি?
ডেঙ্গু একটি সংক্রমণশীল রোগজীবাণুজাত রোগ, যা গ্রীষ্মপ্রধান স্থানে এডিস্‌ নামক মশক দ্বারা সঞ্চারিত হয়, যার রোগলক্ষণ হল মস্তক, চক্ষু, পেশী এবং সন্ধিসমূহে তীব্র বেদনা সহ গলায় ঘা এবং সর্দিকাশি লক্ষণ সহ কখনো ত্বকে উদ্ভেদ এবং কোন কোন অংশে বেদনাশীল স্ফীতি দেখা যায়। অহ রহভবপঃরড়হ, বৎঁঢ়ঃরাব, ভবনৎরষব, ারৎধষ ফরংবধংব ড়ভ ঃৎড়ঢ়রপধষ ধৎবধং, ঃৎধহংসরঃঃবফ নু অবফবং সড়ংয়ঁরঃড়বং ধহফ সধৎশবফ নু ংবাবৎধষ ঢ়ধরহং রহ ঃযব যবধফ, বুবং, সঁংপষব ধহফ লড়রহঃ, ংড়ৎব ঃযৎড়ধঃ, পধঃধৎৎযধষ ংুসঢ়ঃড়সং ধহফ ংড়সবঃরসবং ধ ংশরহ বৎঁঢ়ঃরড়হ ধহফ ঢ়ধরহভঁষ ংবিষষরহম ড়ভ ঢ়ধৎঃং.
ডেঙ্গু একটি ভাইরাসঘটিত রোগ। এডিস নামক মশা দ্বারা এই ভাইরাস এক দেহ হতে অন্য দেহে ছড়ায়। এখানে একটি বিষয় জেনে রাখা ভাল যে, এডিস মশা কামড়ালেই যে ডেঙ্গু হবে তা কিন্তু নয়। এডিস মশা মানেই ডেঙ্গু নয়, সে সর্বদা ডেঙ্গু ভাইরাস বহন করে না। যদি কোন এডিস মশা কোন ডেঙ্গু ভাইরাস আক্রান্তকে কামড়ায় এবং সেই মশা যদি অপর কোন সুস্থ ব্যক্তিকে কামড়ায় তাহেলই কেবল সেই সুস্থ ব্যক্তি ডেঙ্গু আক্রান্ত হবে। এভাবেই ডেঙ্গু এক দেহ হতে অন্য দেহে ছড়ায় এবং ক্রমশ তা মারাত্বক আকার ধারণ করে।
মূলত গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চল বিশেষ করে উপমহাদেশের ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, এশিয়ার দক্ষিণাঞ্চল, চীন তাইওয়ান, প্রশান্ত মহাসাগরের ক্যারাবীয় দীপাঞ্চল, আফ্রিকা এবং মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেশী পরিলক্ষিত হয়। বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব পরিলক্ষিত হয় প্রতি বছর বর্ষা মওসুমে।
এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যে, সারা বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় একশ মিলিয়ন মানুষ ডেঙ্গজ্বরে আক্রান্ত হয়। বাংলাদেশে কী পরিমাণ লোক ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয় তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের হিসাব অনুযায়ী ২০০০ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত দশ বছরে খোদ রাজধানী ঢাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার। তন্মধ্যে মারা গিয়েছিল প্রায় আড়াইশ।
ডেঙ্গুর লক্ষণ
তীব্র জ্বর : ডেঙ্গুর প্রধান লক্ষণ হচ্ছে তীব্র জ্বর। রোগী হঠাৎ করেই সাধারণ জ্বরে আক্রান্ত হয়। পরে তা তীব্র আকারণ ধারণ করে। এ সময় তাপমাত্রা ১০২ থেকে ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত হতে পারে।
হাড়ব্যাথা : শুধু জ্বর হলেই যে ডেঙ্গু হবে তা নয়। ডেঙ্গুর বৈশিষ্ট্য হল জ্বরের সাথে সাথে শরীর ব্যথা। বিশেষ করে হাড়ব্যাথা। হাড়ব্যথা এত তীব্র যে, মনে হবে যেন হাড় ভেঙে গেছে। এজন্য ডেঙ্গুর অপর নাম হাড়ভাংগা রোগ বা ব্রেক বোন ডিজিজ।
ব্যাথা : অস্থি সন্ধি এবং মাংসপেশীতে তীব্র ব্যাথা্‌। চোখের পেছনে ব্যাথা। যার কারণে চোখ এদিক সেদিক ঘুরাতে পারে না, নাড়াচড়া করতে পারে না, থাকাতে পারে না। তীব্র মাথা ব্যথা, গলা ও পিঠ ব্যথা, কোমর ব্যথা। অর্থাৎ সমগ্র শরীর ও গ্রন্থিসমূহে তীব্র ব্যথা। ব্যথা এত তীব্র হয় যে, রোগী ব্যথার কারণে কান্না করে থাকে।
গ্রন্থি ফোলা : গলা ও দেহের অপরাপর গ্রন্থিসমূহ ফুলে উঠতে পারে এবং তাতে তীব্র ব্যথা থাকবে।
ক্লান্তি, অবসাদ ও দুর্বলতা : জ্‌্বর ও ব্যথার কারণে শরীর দুর্বল হয়ে পড়বে এবং অবসাদগ্রস্ত ও ক্লান্তি বোধ হতে পারে। এমনকি জ্‌্বর ভাল হয়ে গেলেও অনেক দিন পর্যন্ত দুর্বলতা থাকবে।
বমি : রোগীর বমি এবং বমি বমি ভাব হবে পারে।
রাশ (জঁংয) বের হওয়া : সারা শরীরে একপ্রকার লালচে দানার মত উদ্ভেদ বা রাশ (জঁংয) বের হতে পারে। এই রাশ বিভিন্নভাবে দেখা যেতে পারে। যেমন- জ্বর দুই তিন দিন পর ছেড়ে গিয়ে পুনরায় আসবে এই সময় এই রাশ দেখা দিতে পারে। অথবা একবার রাশ দেখা দেবার পর চলে গিয়ে কিছু দিন পর পুনরায় দেখা দিতে পারে। প্রথমে হাত-পায়ে, পরে মুখমন্ডল ব্যতীত সারা শরীর জুড়ে লালচে দানার মত এই রাশ বের হয়।
জটিল ও মারাত্মক উপসর্গ
প্রথমে সাধারণ জ্বরের মতই ডেঙ্গু জ্বর শুরু হয়। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যে যদি রক্তক্ষরণ শুরু হয়ে যায় তাহলে বুঝতে হবে অবস্থা অত্যন্ত জটিল এবং মারাত্মক। এই অবস্থাকে বলা হয় ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার। শরীরে রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্যকারী রক্তের যে কোষ তা কমে যাবার ফলে চামড়ার নীচে রক্তক্ষরণ শূরু হয়। এ সময় শরীরের বিভিন্ন স্থান দিয়ে রক্তক্ষরণ হতে পারে। যেমন, নাক মুখ দিয়ে, পায়খানা-পেশাবের রাস্তা দিয়ে, বমির সাথে গলা দিয়ে। পায়খানা কালচে বর্ণ ধারণ করতে পারে।
ডেঙ্গুজ্বরের মারাত্মক অবস্থায় জটিল উপসর্গের মধ্যে তীব্র পেট ব্যথা, ঘন ঘন বমি ও বমি ভাব, হঠাৎ রক্তচাপ কমে যাওয়া, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং জ্ঞান হারানো অন্যতম। এ অবস্থায় রোগীকে অবশ্যই হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে।
সচরাচর সাধারণ ডেঙ্গুজ্বরই বেশি হয়। হেমোরেজিক ডেঙ্গুজ্বর কম হয়। সাধারণ ডেঙ্গু তেমন মারাত্মক নয়, এতে ভয় না পেয়ে চিকিৎসা নিতে হবে। সাধারণ চিকিৎসায় তা সেরে যায়। চিকিৎসা, বিশ্রাম এবং সতর্কতা অবলম্বন করলে দুই সপ্তাহের মধ্যেই সাধারণ ডেঙ্গু ভাল হয়ে যায়। তবে হেমোরেজিক ডেঙ্গুজ্বরের ব্যাপারে খুবই সতর্ক থাকতে হবে। হেমোরেজিক পর্যায়ে চলে গেলে এক মুহূর্ত দেরী না করে রোগীকে অবশ্যই হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে।
ডেঙ্গুজ্বরে চিকিৎসা
বর্তমানে দেশের হাসপাতাল সমূহে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ডেঙ্গু আক্রান্তদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্বল্পমূল্যে ক্লিনিক্যাল টেস্ট বা পরীক্ষা-নীরিক্ষার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। সুতরাং উপরে যে সব লক্ষণের কথা বললাম সে অনুযায়ী সন্দেহ হলেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে অবহেলা করবেন না।
হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা
হোমিওপ্যাথিতে ডেঙ্গুর উত্তম চিকিৎসা আছে। হোমিওপ্যাথি যেহেতু লক্ষণ ভিত্তিক চিকিৎসা ব্যবস্থা, তাই লক্ষণ অনুযায়ী অভিজ্ঞ চিকিৎসকগণ ঔষধসমূহ প্রয়োগ করে থাকেন। হোমিওপ্যাথিতে রোগের নাম ধরে কোন চিকিৎসা হয় না, হোমিও চিকিৎসা সর্বদা লক্ষণ ভিত্তিক। তাই ঔষধ প্রয়োগের আগে অবশ্যই লক্ষণ বিবেচনায় আনতে হবে।
ডেঙ্গুজ্বর প্রতিরোধে করণীয়
এডিস মশাই হচ্ছে ডেঙ্গুজ্বরের একমাত্র বাহণ। তাই এডিস মশার আবাস ধ্বংস করতে হবে। বিশেষ করে ঝোপজঙ্গল, যেসব জায়গায় পানি জমে থাকে, যেমন ফুলের টব, অব্যবহৃত বিভিন্ন কৌটা, খালি বোতল, পরিত্যক্ত টায়ার, বিভিন্ন ভাংগা পাত্র, ডাব-নাকিেলের খোসা ইত্যাদিতে যেন পানি জমে না থকে এবং এসব যেন বাড়ির আশে পাশে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে না থাকে। পানি চলাচলের নালা নর্দমা সর্বদা পরিষ্কার রাখতে হবে।
এডিস মশার একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই মশা অধিকাংশ সময় কামড়ায় সকাল-সন্ধ্যায়। অর্থাৎ সকালে সূর্যোদয়ের এক/আধ ঘন্টা মধ্যে এবং সূর্যাস্তের এক/আধ ঘন্ট আগে। সুতরাং এই সময় মশারী ব্যবহার সহ প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করা কর্তব্য।
ঘরে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত কোন রোগী থাকলে খুবই সকর্ত থাকতে হবে। তাকে সর্বদা মশারির ভেতরে রাখতে হবে। যাতে করে কোন এডিস মশা তার নাগাল না পায়। অন্যথায় পরিবারের অপরাপর সদস্যগণও ডেঙ্গু আক্রান্ত হবার সমূহ সম্ভাবনা থাকবে। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর জন্য বিশ্রাম অপরিহার্য। তকে বেশী পরিমাণে পানি এবং সরবত পান করতে দিতে হবে। তার জন্য তরল খাবারই উত্তম।
ভুল ধারণা
অনেকেই মনে করেন ডেঙ্গু ছোঁয়াছে রোগ। না, ডেঙ্গু কোন ছোঁয়াচে রোগ নয়। সুরতাং ডেঙ্গু রোগীর সেবা করলে, স্পর্ষ করলে, একত্রে থাকলে, একই বিছানায় শুইলে, কাপড়-চোপড়, থালা-বাসন, গ্লাস, কাপ-প্লেট ব্যবহার করলে ডেঙ্গু আক্রান্ত হবার ভয় নেই। যতক্ষণ পর্যন্ত এডিস মশা কোন ডেঙ্গু রোগীকে কামড়াবার পর সুস্থ মানুষকে না কামড়াবে, ডেঙ্গু ছড়াবার কোনই সম্ভাবনা নেই।
সুতরাং ডেঙ্গুরোগীকে ঘরে আলাদা করে রাখতে হবে না। গর্ভবতী মায়ের ডেঙ্গু হলে বা ডেঙ্গু আক্রান্ত মায়ের বুকের দুধ পান করলে সন্তানের ডেঙ্গু হবার সম্ভাবনা নেই।
ডেঙ্গু একবার হলে যে সারা জীবনে আর হবে না, তেমন কোন কথা নেই। তবে সম্ভাবনা কম। ডেঙ্গু ভাইরাস শুধুমাত্র এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়।
সুতরাং রোগীর হাঁচি-কাশির কারণে বাতাসের মাধ্যমে বা ব্যবহৃত পানির মাধ্যমে ডেঙ্গু ছড়ায় না। এডিস মশা আগেও ছিল, বর্তমানেও আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। সুতরাং ডেঙ্গুজ্বরও থাকবে। তাই একে অবহেলাও করা যাবে না, ভয়ও পাওয়া যাবে না। সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল প্রতিরোধ করা। আসুন আমরা সবাই সম্মিলিতভাবে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেষ্ট হই।

x