ডিজিটাল উৎপীড়নের শিকার শিশুরা

প্যারেন্টাল কন্ট্রোল গাইড মেনে চলতে অনীহা

ঋত্বিক নয়ন

বৃহস্পতিবার , ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ at ৫:৪৪ পূর্বাহ্ণ
48

বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা গত ১৯ বছরে ৮০০ গুণ বেড়েছে। তবে তাদের একটা বড় অংশ ১৮ বছরের নিচে বা শিশু-কিশোর। একদিকে ডিজিটাল জগতে প্রবেশের সুবিধা শিশুদের সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ তৈরি করছে, তেমনি বাড়ছে ঝুঁকি। ছোট শিশুদের তুলনায় বেশি বয়সীরা অনলাইনে ভয়ভীতির সম্মুখীন হওয়ার বেশি ঝুঁকিতে থাকে। তবে ক্ষতিকর সামগ্রী, যৌন নিগ্রহ, অপব্যবহার এবং ভয়ভীতির সম্মুখীন হওয়ার ঝুঁকি থেকে শিশুরা কখনোই মুক্ত হচ্ছে না। পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত হয়ে তারা মানসিকভাবে অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ছে।
বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে রেডিও, টেলিভিশন, ইন্টারনেট, পত্রিকা, ম্যাগাজিন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেমন ফেসবুক, টুইটার, ব্লগ, ইউটিউব শিশু-কিশোরদের দারুণভাবে প্রভাবিত করে। তাই এই মাধ্যমগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সচেতনতার অভাবে কোমলমতি শিশু-কিশোররা অপরাধে লিপ্ত হয়ে পড়ছে। ইন্টারনেট দুনিয়ায় শিশুদের নিরাপত্তার জন্য সরকার প্যারেন্টাল কন্ট্রোল গাইড লাইন তৈরি ও মেনে চলার নির্দেশনা দিলেও এখনো তা সর্বস্তরে চালু হয়নি। প্যারেন্টাল কন্ট্রোল হলো সেই প্রযুক্তি যা শিশুদের জন্য আপত্তিকর ও অনুপযুক্ত ওয়েবসাইট ব্লক বা ওয়েবসাইটের কনটেন্ট ফিল্টারের ব্যবস্থা করে।
সিএমপির মুখপাত্র অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার আবু বকর সিদ্দিক দৈনিক আজাদীকে বলেন, প্রতিনিয়ত যেসব আত্মহত্যা, হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ কিংবা অপরাধের ঘটনা ঘটছে-সেগুলোর তদন্ত করতে গিয়ে দেখা গেছে, দায়ী ব্যক্তি বা কিশোর-কিশোরীরা কোনো না কোনোভাবে সিনেমা, নাটক বা কোনো ভায়োলেন্সপূর্ণ চিত্র দেখে অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। সামপ্রতিক অপরাধগুলোকে মনে হয় কোনো অপরাধধর্মী নাটক ও সিনেমার অনুকরণ।
পর্নোগ্রাফি থেকে শিশুদের নিরাপদে রাখতে দেশে উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যবস্থা গৃহীত হয়নি। সুনির্দিষ্ট আইন থাকলেও পর্নোগ্রাফি বন্ধে তার প্রয়োগ নেই। বিষয়টি নিয়ে অমনযোগী ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান এবং মোবাইল অপারেটরগুলো। মোবাইল ফোন সহজলভ্য ও অতি প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠায় অভিভাবকরা এর অপব্যবহার রোধে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখতে পারছেন না। বর্তমানে শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত শিশু-কিশোররা পর্নোগ্রাফির ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতামত, ভবিষৎ প্রজন্মকে রক্ষায় পর্নোগ্রাফি বন্ধে সরকার, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সমাজের সবাইকে ভূমিকা নিতে হবে।
চলতি বছরে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের এক জরিপে জানানো হয়েছে, সারা দেশে প্রায় ৩৮ দশমিক ৯০ শতাংশ স্কুলগামী শিশু-কিশোর নিয়মিত পর্নোগ্রাফি দেখে। বর্তমানে চারটি পদ্ধতিতে পর্নোগ্রাফি তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে তৈরি পর্নোগ্রাফির চেয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে তৈরি পর্নোগ্রাফি শিশুরা বেশি দেখছে। বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী ৩২ শতাংশ শিশু অনলাইনে সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও ডিজিটাল উৎপীড়নের শিকার হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে রয়েছে।
আরেক প্রতিবেদনে জানা গেছে, প্রতিদিন ১ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি শিশু প্রথমবারের মতো অনলাইন ব্যবহার করছে। প্রতি আধা সেকেন্ডে একটি শিশু অনলাইন দুনিয়ায় প্রবেশ করছে। এতে দেশের ১৩ শতাংশ শিশু-কিশোর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হয়রানির শিকার হচ্ছে। একাধিকবার হয়রানির শিকার হচ্ছে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। হয়রানির কারণে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ শিক্ষার্থী তাদের সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিচ্ছে বলে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা (ইউনিসেফ) এর গবেষণায় উঠে এসেছে।