ট্রাক উল্টে ১৩ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় অনুসন্ধান প্রতিবেদন প্রস্তুত

সবুর শুভ

বৃহস্পতিবার , ২১ মার্চ, ২০১৯ at ৬:৪৬ পূর্বাহ্ণ
33

চট্টগ্রাম থেকে যাওয়া কয়লা বোঝাই ট্রাক উল্টে একই পরিবারের সাতজনসহ ১৩ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনার অনুসন্ধান প্রতিবেদন প্রস্তুত। যে কোন সময় এ প্রতিবেদন দাখিল করা হবে বলে জানিয়েছেন বিআরটিএ, চট্টগ্রামের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে ট্রাকটি উল্টে যাওয়ার দু’মাস হচ্ছে আগামী ২৫ মার্চ। অনুসন্ধান প্রতিবেদনে গাড়ির মালিক, চালক, ট্রান্সপোর্ট কর্তৃপক্ষ, হাইওয়ে পুলিশ ও ওজন স্কেল পরিচালনাকারীদের দায় রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন তদন্ত সংশ্লিষ্ট বিআরটিএ চট্টগ্রামের কর্মকর্তা।
অনুসন্ধান প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মেট্রো-ট- ১৬-০১১৪ নম্বরের ট্রাকটি ২০১০ সালের তৈরি। গাড়ির ডকুমেন্টও হালনাগাদ করা আছে। চট্টগ্রাম থেকে ২৫ টন কয়লা বোঝাই করে কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার ঘোলপাশা ইউনিয়নের নারায়ণপুর কাজী এন্ড কোম্পানির ইটভাটায় গিয়েছিল। গত ২৫ জানুয়ারি ওই ইটভাটাতে সেই কয়লা নিয়েই দুর্ঘটনায় পতিত হয় ট্রাকটি। ঝরে পড়ে ১৩টি তাজা প্রাণ। সকলেই হতদরিদ্র শ্রমিক। গাড়িটির সবকিছু ঠিক থাকার পরেও কেন এতো বড় প্রাণহানির ঘটনা? এ প্রশ্নের উত্তরে উল্লেখিত ব্যক্তি ও সংস্থাগুলোর দায় রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
অনুসন্ধান প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামের নিউমুরিং থেকে কয়লা বোঝাই করে ট্রাকটি। সিলেটের লালদীঘির পাড় এলাকার আমদানিকারক মেসার্স ফালাহ উদ্দিন আলী আহমদ নামের প্রতিষ্ঠান থেকে কয়লা কিনে নেন কুমিল্লার মেসার্স কাজী ব্রিকস্‌। কাজী ব্রিকসের হয়ে নগরীর বারিক বিল্ডিং এলাকার তানিয়া পরিবহন ট্রান্সপোর্ট সাভিস নামের পরিবহন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কয়লা পরিবহনের দায়িত্ব পায়। সরকারি আদেশ অনুযায়ী ৬ চাকার একটি ট্রাক বোঝাই পণ্যসহ সর্বোচ্চ ২২টন পর্যন্ত ওজন হতে পারে। কিন্তু ওইদিন ট্রাকটি দুর্ঘটনায় পড়ার সময় ট্রাকটির ওজন ছিল ৩৩ টনের বেশি। সাড়ে ৮ টন ওজনের ট্রাকটি যেখানে সর্বোচ্চ সাড়ে ১৩ টন পণ্য বহন করতে পারে, সেখানে ২৫ টনের বেশি কয়লা বহন করেছিল ট্রাকটি। এতে প্রায় সাড়ে ১১টন বেশি কয়লা নিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ট্রাকটি পরের দিন ২৫ জানুয়ারি ভোরেই গন্তব্যস্থলে পৌঁছেছিল। কিন্তু কয়লা খালাসের জন্য গাড়িটি আনলোড পয়েন্টে ঢুকতে একটু পেছনে যেতেই পেছনের ডান চাকা সামান্য কয়লার স্তুপের উপর উঠে যায়। এতে মুহূর্তের মধ্যেই ট্রাকটি বামপাশে উল্টে গিয়ে রাস্তা লাগোয়া শ্রমিকদের ঘরের দেয়ালে উপর আঘাত করে। এসময় দেয়ালের ভাঙা অংশ ও ট্রাকের কয়লার নিচে চাপা পড়েন ঘুমন্ত শ্রমিকরা। এতে ১৩ শ্রমিক ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। মূলত অতি বোঝাইয়ের কারণে পেছনের চাকার স্প্রিং দেবে যাওয়ায় ট্রাকটি উল্টে যায় বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কদমতলী থেকেই ট্রাকটি ভাড়া করা হয়েছিল। চালক কিছু বেশি ভাড়া পাওয়ার জন্যই ২৫ টন কয়লার ট্রিপটি নিয়েছিল। আবার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ডে সড়ক ও জনপথ বিভাগের ওজন স্কেল রয়েছে। অতি বোঝাই ট্রাক যাওয়ার সময় এখানে জরিমানা গুণতে হয়। এ অবস্থায় ট্রাকটি কিভাবে গন্তব্যে গেল তা বিবেচনার দাবি রাখে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। আবার চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পথে পথে হাইওয়ে পুলিশের চেকপোস্ট অতিক্রম করতে হয়েছে।
জানা গেছে, ১৩ শ্রমিক নিহতের ঘটনায় পৃথক দু’টি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশ। ঘটনা তদন্তে ২৫ জানুয়ারি দুপুরে কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) কাইজার মোহাম্মদ ফারাবীকে আহ্বায়ক করে জেলা প্রশাসনের চার সদস্যের এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (দক্ষিণ) আবদুল্লাহ আল-মামুনকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সাত কার্যদিবসের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছিল।
কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- চৌদ্দগ্রাম উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) দীপন দেবনাথ, চৌদ্দগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল্লাহ আল-মাহফুজ ও কুমিল্লা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল স্টেশনের সহকারী পরিচালক রতন কুমার নাথ। এদিকে কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (দক্ষিণ) আবদুল্লাহ আল-মামুনকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়। তবে দায়ের করা মামলাটি তদন্ত করছেন চৌদ্দগ্রাম থানার এসআই মোজাহার হোসেন।
ওই ঘটনায় নিহতরা হলেন- জেলার জলঢাকা থানার নিজপাড়া গ্রামের জাহাঙ্গীর আলমের ছেলে মো. সেলিম (২৮), সুরেশ চন্দ্র রায়ের ছেলে রঞ্জিত চন্দ্র রায় (৩০), কামিক্ষার ছেলে অমৃত চন্দ্র রায় (২০), কৃশব চন্দ্র রায়ের ছেলে শংকর চন্দ্র রায় (২২), রামপ্রসাদের ছেলে বিপ্লব (১৯), পাঠানপাড়া প্রামের ফজলুল করিমের ছেলে মাসুম (১৮), নূর আলমের ছেলে মোরসালিন (১৮), নিচপাড়া গ্রামের সুনীল চন্দ্র রায়ের ছেলে তরুণ চন্দ্র রায় (২৫), অমল চন্দ্র রায়ের ছেলে দিপু চন্দ্র রায় (১৯), শিমুলবাড়ি গ্রামের মৃণাল চন্দ্র রায় (২১), মনোরঞ্জন চন্দ্র রায় (১৯), রাজবাড়ি গ্রামের ধলু চন্দ্র রায়ের ছেলে কনক চন্দ্র রায় (৩৫), বিকাশ চন্দ্র রায় (২৮)।
একই পরিবারের সাতজন হলেন- মনোরঞ্জন রায়, সংকর চন্দ্র রায়, দিপু চন্দ্র রায়, অমিত চন্দ্র রায়, মিনাল চন্দ্র রায়, বিকাশ চন্দ্র রায়, কনক চন্দ্র রায় (৩৪)। এ বিষয়ে তানিয়া ট্রান্সপোর্টের মালিক সেলিম জানান, এ ধরনের গাড়ি দিনে অন্তত: ২০০টা চট্টগ্রাম থেকে বের হয়। ওইদিন দুর্ভাগ্যক্রমে এটা র্দুঘটনায় পড়েছে। তিনি আরো জানান, অতিরিক্ত বোঝাইয়ের বিষয়টি দেখার দায়িত্ব ওজন স্কেল পরিচালনাকারীদের।

x