টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ড থেকে উদ্গীরিত গ্যাসে স্থানীয়রা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে

সোমবার , ১৩ জানুয়ারি, ২০২০ at ৫:১৪ পূর্বাহ্ণ

সুনামগঞ্জের মৌলবিবাজার উপজেলার টেংরাটিলা গ্যাস ক্ষেত্র বিস্ফোরণের ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো উদ্গিরণ হচ্ছে গ্যাস। বিশেষ করে টেংরাটিলা গ্রামের পুকুর, ধানিজমি, টিউবওয়েলসহ বিভিন্ন সড়ক এমন কি বসতঘরের ফাটল দিয়েও বুদবুদের মতো বেরিয়ে আসছে গ্যাস। ব্যাপক নিঃসরণ বজায় থাকায় আশেপাশের গ্রামগুলোতেও দেখা দিয়েছে ব্যাপক স্বাস্থ্য সমস্যা। ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি রাত ১০টায় সুনামগঞ্জের টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ডে প্রথম বিস্ফোরণ ঘটে। সে সময় গ্যাসফিল্ডের প্রোডাকশন কূপের রিগ ভেঙে আগুনের উচ্চতা ২০০-৩০০ ফুট পর্যন্ত উঠে যায়। গ্যাসফিল্ডের আগুন জ্বলতে থাকে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে। দ্বিতীয় দফা বিস্ফোরণ ঘটে একই বছরের ২৪ জুন রাত ২টায়। এই গ্যাসফিল্ডের আগুন আশেপাশের ১০ কিলোমিটার ধরে ব্যাপক আতঙ্কের সৃষ্টি করে। কূপ এলাকার তিন কিলোমিটার দূরেও অনুভুত হয় ভূকম্পন। স্থানীয়রা জানান, বিস্ফোরণের পর আজ পর্যন্ত একদিনের জন্যও ওই এলাকায় বুদ্‌বুদ্‌ আকারে গ্যাস নিঃসরণ বন্ধ হয় নি। এতে ১৫ বছর ধরে দূষিত হয়ে আসছে টেংরাটিলা ও আশেপাশের বাতাস এবং স্থানীয়দের মধ্যে নানা রোগ বালাইয়ের প্রাদুর্ভাব ব্যাপকভাবে বাড়ছে। পত্রিকান্তরে অতি সম্প্রতি এ খবর প্রকাশিত হয়েছে।
সুনামগঞ্জের টেংরাটিলায় গ্যাস ক্ষেত্র বিস্ফোরণের ১৫ বছর পরও সংশ্লিষ্ট এলাকা বুদ্‌বুদ্‌ আকারে গ্যাস উদ্গিরণ আজও বন্ধ না হওয়ার খবরটি নতুন কোন খবর নয়। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে বহু প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে একটা কথাও উচ্চারণ করে নি। এর মধ্যে আবার গ্যাসের কারণে আশপাশের পরিবেশ দূষিত হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয়দের মধ্যে হাঁপানি, অ্যালার্জি, শরীরের বিভিন্ন অংশে জ্বালাপোড়ার মতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে। টিউবওয়েলের পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা বেড়েছে। বছরের পর বছর জমিতে ফসল হচ্ছে না। তাছাড়া ঝুঁকিপূর্ণভাবে স্থানীয় প্রযুক্তিতে গ্যাস উত্তোলন করে তা ব্যবহার করা হচ্ছে। আতঙ্কের বিষয় হলো, সব টিউবওয়েলের পানিতে আর্সেনিক থাকায় মানুষ পানি খেতে পারছে না। ফলে বিশুদ্ধ পানির সংকট চরমে উঠেছে। গাছপালা মরে যাচ্ছে। গাছে পাখি এসে বসছে না। জলাশয় ও পুকুরে মাছ বাঁচে না। বৃষ্টির সময় পানি বাড়লে কিছু মাছ এলেও পানি কমতে থাকলেই মাছগুলো চলে যেতে শুরু করে এবং পানি কমলেই চলে যায়। এমতাবস্থায় ওই এলাকায় মানুষের টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। মাঝে বিদেশিদের দিয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকার পরিবেশ-প্রতিবেশ পর্যবেক্ষণ করা হলেও স্থানীয়ভাবে কোন উদ্যোগ নেওয়া হয় নি। বিশ্বের বহু দেশে এমন দুর্ঘটনার উদাহরণ আছে কিন্তু তারা দ্রুতই তা নিয়ন্ত্রণে এনে গ্যাসের উদ্গিরণ বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছে। এক্ষেত্রে ব্যয় ভেদে বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সমাধানের উদাহরণ রয়েছে। আমাদের এখানে কূপের মুখ বন্ধে পুরানো পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে, তাও যথাযথ ও পরিপূর্ণভাবে নয়। এ কারণে গ্যাস উঠছে এখনও। এটি পরিবেশ-প্রতিবেশ, মানুষসহ সব প্রাণির জন্য ক্ষতিকর। সরকারের কর্তব্য, বিষয়টি যথোচিৎ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে গ্যাস উদ্গিরণ বন্ধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এছাড়া সেখানে নতুন কূপ খনন করে গ্যাস উত্তোলন করা যায় কিনা তাও খতিয়ে দেখা দরকার। বর্তমানে বাস্তবতায় স্থানীয় অধিবাসীদের সরিয়ে নেয়া এবং তাদের দ্রুত পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়া অত্যাবশ্যক। পাশাপাশি যাদের মধ্যে স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দিয়েছে তাদের সুচিকিৎসার বন্দোবস্ত করা একান্ত প্রয়োজন। গ্যাসের ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহার অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। তা না হলে যে কোন সময়ে এমন বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। যে ঘটনা মোকাবেলা করার সক্ষমতা ও দক্ষতা এমন কি অভিজ্ঞতা কোনটিই বাংলাদেশের নেই। তাই গ্যাস উদ্গিরণ বন্ধে আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তা নেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। একই সাথে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা অধিগ্রহণ করতে হবে। কারণ সবচেয়ে বড় কথাটা হলো দুর্ঘটনার ১৫ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও স্থানীয়দের অধিকাংশই কোন ক্ষতিপূরণ পায় নি। এটা দু:খজনক ও কাম্য নয়। সময় যতই গড়াবে স্থানীয়দের মধ্যে স্বাস্থ্যগত সমস্যা ও জটিল রোগ দেখা দেবে, যা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। এটি প্রতিরোধে স্থানীয়দের অন্যত্র তথা নিরাপদ জায়গায় স্থানান্তরের আগে তাদের সচেতনতামূলক কার্যক্রম আরো জোরদার করতে হবে। এ কাজটি সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতায় হওয়া উচিত।
আমাদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদ্ভূত সমস্যা সমাধানে কারিগরি কমিটির সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ-প্রতিবেশ যাচাইয়ের জন্য একটি কমিটি গঠন করে সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করবে এবং তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে দ্রুত উদ্যোগ নেবে। বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে গ্যাসের উদ্গিরণ বন্ধে উদ্যোগ নেওয়ার একই সাথে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ গ্যাসের রিজার্ভের পরিমাণও খতিয়ে দেখতে পারে। গ্যাস উত্তোলন সম্ভব কিনা, সে ব্যাপারে দেশি-বিদেশি পরামর্শকদের সহায়তা খুব দ্রুতই নেওয়া বিধেয়।

x