টুরিস্ট ভিসায় বিদেশের ড্যান্স বারে বাংলাদেশি নারী পাচারকারীদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে

বৃহস্পতিবার , ৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৫:২৯ পূর্বাহ্ণ

টুরিস্ট ভিসায় বিদেশের ড্যান্স বারে পাচার হচ্ছে নারী। তাদের নির্বিঘ্নে আসা যাওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি সুচারুভাবে সম্পন্ন করছে একটি আন্তর্জাতিক চক্র। সম্প্রতি এমন এক চক্রের সন্ধান পেয়েছে সরকারের একটি নিরাপত্তা সংস্থা। অনুসন্ধান করে সংস্থাটি এরই মধ্যে দুই শতাধিক তরুণীর পরিচয়, পাসপোর্ট, ভিসা ও টিকিটের নথি সংগ্রহ করেছে, যাদের প্রত্যেকেই গত এক বছরে কম পক্ষে তিনবার ভ্রমণ ভিসায় বিদেশে গিয়ে এক থেকে তিন মাস করে থেকেছেন। এসব তরুণীর বয়সই ২৫ বছরের মধ্যে। নিরাপত্তা সংস্থাটি জানায়, স্থানীয় এজেন্টদের মাধ্যমে সুন্দরী নারীদের প্রলোভনে ফেলে সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন ড্যান্স বারে সরবরাহ করছে চক্রটি। এ চক্রের অধীনে পাঁচ হাজারের বেশি বাংলাদেশি নারী এসব দেশের বিভিন্ন বারে কাজ করছেন। পত্রিকান্তরে সম্প্রতি এ খবর প্রকাশিত হয়েছে।
মানুষ পাচার নতুন কোন ব্যাপার নয়। বিশ্বের কোথাও না কোথাও প্রতিদিন মানুষ পাচারের শিকার হচ্ছে, যার মধ্যে বাংলাদেশিদের সংখ্যা বেশি। চাকরির প্রলোভন, উন্নত জীবনের স্বপ্ন, সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথা বলে পাচারকারীরা মানুষ সংগ্রহ করে। তারপর বিদেশে পাচার করে। সাধারণত বাংলাদেশ থেকে প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারত, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও সৌদি আরবে পাচারের ঘটনা দেখা যায়। অতীতে দেখা গেছে, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে অভিবাসীদের গণকবর ও ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে বাংলাদেশিদের সলিল সমাধির ঘটনা। সম্প্রতি পত্রিকায় মিললো টুরিস্ট ভিসায় বিদেশের ড্যান্স বারে নারী পাচারের খবর। উপরোক্ত প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে, দেশি ও বিদেশি একটি গোষ্ঠী এ চক্রের সঙ্গে জড়িত। তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে, অথচ ধরা হচ্ছে না কেন তা আমাদের বোধগম্য হচ্ছে না। বিশ্বে বহু দেশের মতো বাংলাদেশেও নারী ও শিশু পাচারের বিষয়টি অদৃশ্য অগোচরিত ও অনালোচিত রয়ে গেছে। নারী ও শিশু পাচার শুধু আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির উল্লেখ সূচক নয়, তা নারী ও শিশুর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও মানবাধিকার নিশ্চিতকরণ সংক্রান্ত সাংবিধানিক নিশ্চয়তা এবং সিআর-সিও বাস্তবায়নের আন্তর্জাতিক দায়িত্বের অংশ বিশেষও। সারা বিশ্বে মানব পাচার বেড়েছে। তাই এ জঘন্য কর্মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক কর্তব্য ও দায়িত্ব। নারী ও শিশু পাচারের কারণ দেশ-কাল পাত্র ও সমাজভেদে বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। এটি প্রতিরোধের উপায় খুঁজতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিকারেরও ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। নারী ও শিশু পাচারের মূল কারণ অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক। মূল্যবোধের অবক্ষয়, আইনগত দুর্বলতার সুযোগ, নীতি ও অনুশাসনের অজ্ঞতা, দারিদ্র্য ও শিক্ষার অভাব এবং তা প্রতিরোধে প্রতিষ্ঠানিক উদ্যোগের কমতি, সর্বোপরি প্রতিকারের জন্য আইনি সহায়তার সীমিত সুযোগ নারী ও শিশু পাচারের কারণ। বাংলাদেশের বড় সমস্যাগুলোর মধ্যে মানব পাচারও একটি। দুঃখের বিষয় এব্যাপারে সরকারের যতটুকু দৃষ্টি দেওয়া উচিত ততটুকু দেওয়া হচ্ছে না। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকার মানব পাচার বিষয়ক অপরাধে তদন্ত, মামলা পরিচালনা, অপরাধীর দণ্ড দেওয়া প্রভৃতি বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়নি। ফলে মানব পাচার বেড়েই চলেছে। পাচার হওয়া মানুষের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি। মানব পাচার নির্মূল করা সম্ভব না হলেও একে সহনীয় পর্যায়ে রাখতে আমাদের সকলের এগিয়ে আসা দরকার। মানব পাচার রোধে সর্বপ্রথম প্রয়োজন আত্মসচেতনতা। বিদেশে গমণেচ্ছু কর্মীরা যদি আত্মসচেতন হন তাহলে মানবপাচার অনেকটা বন্ধ হয়ে আসবে। সামাজিক সচেতনতা মানব পাচার রোধে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। মানব পাচাররোধে জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য গণমাধ্যমও নিতে পারে বড় ধরনের ভূমিকা। ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি ও দেশের নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণের মাধ্যমে গণমাধ্যম নারী ও শিশু অধিকার রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। নারী ও শিশু পাচার বর্তমানে আন্তর্জাতিক ও আন্তঃদেশীয় বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। এই অবৈধ ও অনৈতিক ব্যবসার সঙ্গে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক দল নিয়োজিত। বাংলাদেশের দারিদ্র্য প্রবণ এলাকা থেকেই নারী ও শিশু পাচার হচ্ছে বেশি। তবে সরকার নারী ও শিশু পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এ বিষয়ে বিভিন্ন আন্তঃ মন্ত্রণালয় কমিটি গঠনসহ পুলিশ সদর দফতরে মনিটরিং সেল স্থাপন করা হয়েছে। স্থল ও বিমান বন্দরগুলোই নেওয়া হয়েছে বিশেষ তল্লাশীর ব্যবস্থা। জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে একটি কমিটিও কাজ করছে। উদ্ধার করা নারী ও শিশু পুনর্বাসনের জন্যও নেওয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা ও কর্মসূচি।
কিন্তু এত সবের পরও কিছু কাজ বাকি আছে যেগুলো না করলে মানুষ পাচার বন্ধ করা যাবে না। যেমন মানব পাচারের মামলা হলেও শাস্তি হয় না। এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার মামলা হলেও নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ২৪৭টির। সাত বছরেও গঠন হয়নি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল। মানব পাচার আইন অনুযায়ী তিন মাসের মধ্যে অভিযোগ গঠন ও বিচার কার্যক্রম ছয় মাসের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না। এ আইনে অপরাধ জামিন অযোগ্য হলেও অভিযুক্তরা জামিন পেয়েই আবার জড়িত হচ্ছে মানব পাচারে। আমাদের বিশ্বাস, সরকার ও আদালত বিশেষ উদ্যোগ নিলে বিদ্যমান বিচার ব্যবস্থার আওতায়ই আরও বেশি মানব পাচার মামলা নিষ্পত্তি করা যাবে। যেকোনো মামলার অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যদান ও অন্যান্য দালিলিক প্রমাণের ওপর অভিযুক্তের শাস্তির বিষয়টি নির্ভর করে। মানব পাচারের ব্যাপকতা রোধ করতে হলে অপরাধীদের কঠোর শাস্তি ও ত্বরিত বিচারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি দেশেই কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র বিস্তৃত করা দরকার।

x