টিকিট কনফার্ম হওয়ার আগেই চলে গেল তারা

আজাদী প্রতিবেদন

রবিবার , ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৬:১১ পূর্বাহ্ণ
1092

ভারতের ভেলোরে চিকিৎসা ও ভ্রমণে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন মো. সাগির ও তার একমাত্র ছেলে গণপূর্ত বিদ্যা নিকেতনের পঞ্চম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত মো. জোনায়েদ। পাসপোর্ট থেকে শুরু করে যাওয়ার জন্য আনুষঙ্গিক সব ঠিক। শুধু যাওয়ার জন্য গাড়ির টিকিট করা বাকী ছিল। টিকিট নিশ্চিত হয়েছে কিনা সন্তানসহ তা দেখতে গিয়েছিলেন শ্বশুর বাড়িতে। কিন্তু টিকিট নিশ্চিত হওয়ার আগেই নিশ্চিত হয়ে গেল মৃত্যু। রাস্তায় যখন বাবা-ছেলের নিথর দেহ পড়ে ছিল, ঠিক তখনি ফোন এল টিকিট কনফার্ম। কিন্তু আর কোনো কাজে আসল না সে টিকিট, বহুল প্রতীক্ষিত ভারতে আর যাওয়া হলো না দু’জনের।
নিহত মো. সাগিরের মেঝ ভাই মো. শফি দৈনিক আজাদীকে কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন, আমার ভাই তাঁর ছেলেকে নিয়ে আজ ভারতে যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস তারা দু’জনেই
আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। আমার ভাতিজা জোনায়েদ ছিল আমাদের পরিবারের কলিজার টুকরা। তাকে ছাড়া আমাদের সকাল বিকাল কাটে না। যে বা যারা আমার ভাই ও ভাতিজাকে দুর্ঘটনায় ফেলে হত্যা করে পালিয়েছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। তিনি আরো বলেন, আমার ভাই শুক্রবার রাতে হল টুয়েন্টিফোরে দাওয়াত খেয়ে তার শ্বশুর বাড়িতে গিয়েছিল টিকিটের বিষয় জানতে, দেরি হওয়াতে ফোনে জেনে নিবো বলে বাড়িতে ফেরার সময় এই দুর্ঘটনায় পতিত হয়।
স্বামী ও একমাত্র সন্তানহারা নাছিমা আক্তার বাকরুদ্ধ কন্ঠে দৈনিক আজাদীকে বলেন, আমার স্বামী ও সন্তানকে যারা হত্যা করিয়েছে তাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতার দাবি রইল। যাতে আর কোন মা সন্তানহারা না হয়, আর কোন স্ত্রী বিধবা না হয়। আমি হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
নিহতের শ্যালিকা রাইসা আলম বলেন, আমার দুলা ভাই আমাদের বাড়িতে গিয়ে প্রায় আধ ঘণ্টা ছিল। টিকিট কনফার্ম নিশ্চিত হতে দেরি হওয়ায় ফোনে জেনে নিব বলে বাড়িতে ফেরার জন্য রওনা দেন। টিকিট কনফার্ম সেটা ফোনে জানাতে চাইলে ফোন রিসিভ করে একজন জানালো তারা দু’জনেই সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন।
নিহত ছাগিরের বড় ভাইয়ের ছেলে মো. রাসেল দৈনিক আজাদী বলেন, আমার চাচা ও চাচাতো ভাই আজ শনিবার ভারতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি শেষ করছিল। শুধু টিকিট বাকী ছিল। টিকিট কনর্ফাম হওয়ার জন্য যখন ফোন আসে তখন তাঁরা লাশ হয়ে রাস্তায় পড়ে আছে। আমাদের পরিবারে শান্তি বলতে আর কিছু নাই।
নিহত জোনায়েদের সাবেক সহপাঠি মুনতাসির শাহরিয়ার (১২) বলেন, আমরা একসাথে স্কুলে খেলাধুলা খেলতাম। প্রতি শুক্রবারে জুমার নামাজও একসাথে আদায় করতাম। আমরা একে অপরের ভাল বন্ধুও ছিলাম।
নিহত জোনায়েদের শ্রেণী শিক্ষক ও গণপূর্ত বিদ্যা নিকেতনের সহকারী শিক্ষিকা ফাতেমা তুজ্জ জোহরা আইরিন বলেন, জোনায়েদ স্কুলে নিয়মিত ছিল এবং খুবই শান্ত স্বভাবের ছিল। সে আর কোন দিন স্কুলে ফিরবে না। শিক্ষিকা হিসাবে তার চলে যাওয়া মেনে নেওয়া খুবই কষ্টকর বলে দাবি করেন।
জানতে চাইলে ডবলমুরিং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মহিউদ্দিন সেলিম দৈনিক আজাদীকে বলেন, এ ব্যাপারে থানায় নিহতের স্বজন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা একজনকে আসামী করে মামলা হয়েছে। আমরা কিছু সিসিটিভির ফুটেজ পেয়েছি তাতে দুর্ঘটনার স্পষ্ট ফুটেজ নেই তবে একটা ট্রাক যাওয়ার দৃশ্য আছে, আপাত দৃষ্টিতে ধারণা করা হচ্ছে এই ট্রাকটি দুর্ঘটনায় জড়িত থাকতে পারে। আরেক ফুটেজ আছে বলে শুনছি তবে সেই প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় সেটা সংগ্রহ করতে পারিনি। সেটা পেলে হয়তো গাড়ি সনাক্ত করা যেতে পারে।
প্রসঙ্গত : গত শুক্রবার রাত ১১টার দিকে নগরীর ডবলমুরিং থানাধীন ধনিয়ালাপাড়া বাইতুল আমান প্রকাশ ছোট মসজিদের কাছে এ দুর্ঘটনা ঘটে। কোন প্রত্যক্ষদর্শী না থাকায়, ধারণা করা হচ্ছে বিপরীতমুখী ট্রাকের চাপায় মোটরসাইকেল আরোহী বাপ ছেলের মৃত্যু হতে পারে। নিহত ছগির মনছুরাবাদ এলাকার মালেক কোম্পানির বাড়ির আলী আকবরের পুত্র। বিসমিল্লাহ স্টোর নামে মনছুরাবাদে তাঁর একটা মুদির দোকান আছে। শনিবার দুপুরে নিজ এলাকা বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসের মাঠ প্রাঙ্গণে তাদের জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

x