ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসনে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের আরো সক্রিয় হতে হবে

রবিবার , ২০ অক্টোবর, ২০১৯ at ২:৪৮ পূর্বাহ্ণ
38

শিশুশ্রম বন্ধ করতে ডিসিদের সহযোগিতা চেয়েছেন শ্রম প্রতিমন্ত্রী। দেশে শিশুশ্রম আইনগতভাবে নিষিদ্ধ। কিন্তু তারপরও শিশুদের দিয়ে নানা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানো হচ্ছে। শিশুরা হাটবাজার, হোটেল রেস্টুরেন্ট, ওয়েল্ডিং-ওয়ার্কশপে কাজ করছে। অনেক শিশু রিকশা ভ্যান চালায়। শহর এলাকায় বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ মহানগরীগুলোতে লেগুনা, টেম্পো ইত্যাদি মাঝারি যানবাহনে ছোট ছোট শিশু কাজ করে। চলন্ত অবস্থায় ঝুঁকির মধ্যে যাত্রী ওঠানো-নামানোর পাশাপাশি তারা ভাড়াও আদায় করে। অনেকে লেদ মেশিন চালায়। বিড়ি ফ্যাক্টরিতে অনেকে বিষাক্ত তামাক পাতা হাতে নিয়ে কাজ করে। তাছাড়া শিশুদের একটি বিশাল অংশ ফেলে দেওয়া জিনিসপত্র কুড়িয়ে কোন রকমে পরিবারের ভরণ পোষণে বাবা-মাদের সহায়তা করে। অনেক শিশু বাসের হেলপার হয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শিশুশ্রমিকও বৃদ্ধি পাচ্ছে। সম্প্রতি শিশুশ্রম বন্ধে শ্রম প্রতিমন্ত্রী সরকারি কর্মকর্তাদের সহায়তা চেয়েছেন। ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বন্ধ ও শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তকরণে সরকারি কর্মকর্তাদের ভূমিকা সব সময় মুখ্য। এক্ষেত্রে আমরা চাই, ছোট-বড় কলকারখানা ও ফ্যাক্টরিতে সরকারি পরিদর্শন নিয়মিতভাবে পরিচালনা এবং পর্যাপ্ত ও দক্ষ জনবল নিয়োগ করা, সরকার ঘোষিত ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের তালিকা ব্যাপকভাবে রেডিও টেলিভিশনে প্রচার করা, সরকার ঘোষিত আইন ও নীতিমালাগুলোর প্রচার এবং সংশ্লিষ্ট জনগণকে সচেতন করার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা, হালনাগাদ জাতীয় জরিপের ওপর ভিত্তি করে শিশুশ্রমে যুক্ত শিশুদের সংখ্যা নির্ধারণ করে নতুন কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় করা হোক। শিশুশ্রম বন্ধে আইন রয়েছে। কিন্তু সে আইন শুধু আইনের বইতে; বাস্তবে বড় একটা দেখা যায় না। আর শুধু আইন দিয়ে শিশুশ্রম বন্ধ করা অসম্ভব। শ্রম আইন অনুযায়ী শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ করা যায় না। এছাড়া শিশুদের দিয়ে ৫ ঘণ্টার বেশি কাজ করানো এবং ১৪ বছরের কম বয়সি শিশুদের শ্রম একেবারেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ আলাদা। এ আইন প্রয়োগের কোন অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায় না। আইনের ধারা ৩৫-এ এটাও বলা হয়েছে যে, কোন শিশুর বাবা-মা বা অভিভাবক শিশুকে কোন কাজে নিয়োগের অনুমতি দিয়ে কারো সঙ্গে কোন চুক্তি করতে পারবেন না। এজন্য শাস্তির বিধান রয়েছে। আইনে আছে, কোন শিশু বা কিশোরকে চাকরিতে নিয়োগ করলে অথবা আইনের কোন বিধান লঙ্ঘন করে কোন শিশু বা কিশোরকে চাকরি করার অনুমতি দিলে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড দিতে হবে। আর কোন শিশুর বাবা-মা বা অভিভাবক এই ৩৫ ধারা অমান্য করে কোন শিশু সম্পর্কে চুক্তি করলে তাকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড দিতে হবে। অথচ বাস্তবে যেসব শিশুকে কাজে নিয়োগ করা হয়, সেখানে কোন নিয়োগপত্র থাকে না; কোন চুক্তিও নয়। যে কোন সময় যে কোন শিশু কর্মচ্যুত হতে পারে। ফলে আইন আর সেখানে পৌঁছে না। এজন্য আইনের সংস্কার প্রয়োজন। দারিদ্র্যই যে শিশুশ্রমের কারণ, তা কিন্তু নয়। বাংলাদেশ সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনির জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করে। নেহাৎ যদি কোন পরিবার শিশু আয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে সেই পরিবারকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনিতে অন্তর্ভুক্ত করা অত্যাবশ্যক। বাংলাদেশে প্রায় ১৫০টি নিরাপত্তা বেষ্টনি আছে। শিশুদের জন্য আছে মাত্র ৩টি। শিশুদের কল্যাণ হয় মতো কিছু নিরাপত্তা বেষ্টনি জরুরি ভিত্তিতে গড়ে তোলা প্রয়োজন। শিশুশ্রম নিরসনে ২০১২ থেকে ২০২০ পর্যন্ত একটি লক্ষ্যমাত্রা ছিল। কিন্তু তাতে এমন কিছু অর্জিত হয় নি। এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দুটো ভাগে ভাগ করা যায়। একটি ভাগ থাকবে ২০২১ সাল পর্যন্ত। আর একটি ভাগ থাকবে ২০২৫ সাল পর্যন্ত। উভয় পর্বেই আমাদের জোরেশোরে কাজ করতে হবে। কাজ করার জন্য নীতিমালা ও বিভাগীয় পর্যায় থেকে উপজেলা পর্যন্ত কমিটি রয়েছে। জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসক (ডিসি) থাকেন কমিটির চেয়ারম্যান। তিনি ৭০টির বেশি কমিটির চেয়ারম্যান থাকেন। ফলে সময় দিতে পারেন না। তাই এক্ষেত্রে জেলায় কো-চেয়ারম্যান বা অন্য কাউকে দায়িত্ব দিয়ে কমিটিগুলোকে কার্যকর করে তোলা অবশ্যই দরকার। শিশুদের সর্বোত্তম স্বার্থ রক্ষার্থে জাতীয় সব উন্নয়ন সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন, পরিকল্পনা গ্রহণ, কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে জাতীয় শিশু নীতিমালা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু অধিকার প্রয়োজনমতো ভোগ করতে পারছে না।
শিশুদের দারিদ্র্য বিমোচন, পুষ্টি, স্বাস্থ্য সেবা, নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিতকরা সহ হতদরিদ্র ও ছিন্নমূল শিশুদের পুনর্বাসন, পর্যায়ক্রমে শিশুশ্রম নিরসন, শিশুদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার বন্ধ এবং তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে শিক্ষা ও বিনোদনের উপযুক্ত সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার। মানবাধিকার নিশ্চিতকরণ ও সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় প্রতিটি শিশুর অধিকারকে যথাযথ সম্মান দেখিয়ে শিশুর অধিকার সংরক্ষণের মাধ্যমে একটি কর্মক্ষম ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রস্তুতের দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সমাজের রয়েছে। কাজেই দেশে শিশুশ্রম কমিয়ে আনতে হলে সুনির্দিষ্টভাবে আইনের প্রয়োগ ও কঠোর শাস্তি প্রদান জরুরি। মোট কথা, শিশুশ্রম বন্ধ করতে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগ ও সর্বস্তরে সচেতনতা সৃষ্টি করতেই হবে।

x