জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণা এবং জাতীয় মানমন্দির স্থাপনা বিষয়ে

ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী

শনিবার , ২০ জুলাই, ২০১৯ at ৮:০৩ পূর্বাহ্ণ
83

বাংলাদেশে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চা চলছে গুটিগুটি পায়ে। এখানে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে শিক্ষা লাভের কোনো সুযোগ নেই। তার কারণ দেশের প্রায় ৪৩টি পাবলিক এবং ১০৩টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনোটিতেই জ্যোতির্বিজ্ঞান বা অ্যাস্ট্রনমির কোনও স্নাতক ডিগ্রি পড়ানো হয়না। এটা একদিক থেকে আমাদের শিক্ষামানসের মনোলিথিক অভিমুখিনতা নির্দেশ করে। আমাদের অধীত বিষয়গুলি প্রায় সবই উপযোগিতা দ্বারা চিহ্নিত, বিদ্যাচর্চার প্রয়োজনীয়তার দ্বারা নয়। ফলে সারা বিশ্বে মহাকাশ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে যে গতিশীল আবহ বিরাজ করছে- শিক্ষায়, গবেষণায়, মহাকাশ জয়ে- আমাদের সেসবের প্রাতিষ্ঠানিক কোনও সুযোগ নেই। দুই-একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্যোতি:পদার্থবিজ্ঞান কিংবা কসমোলজি বিষয়ে স্নাতকোত্তর গবেষণার সুযোগ থাকলেও তা অত্যন্ত সীমিত।
প্রাতিষ্ঠানিকভাবে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার সুযোগ সৃষ্টি করতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে এই বিষয়ক কোর্স পড়াতে হবে, গবেষণার প্রণোদনা সৃষ্টি করতে হবে। কিংবা জ্যোতির্বিজ্ঞান ও মহাকাশ গবেষণা ইনস্টিটিউট গঠন করতে হবে। সুনির্দিষ্টভাবে অ্যাস্ট্রনমি বিষয়ে স্নাতক কোর্স এবং জনপ্রিয়করণের কর্মকাণ্ড হাতে নিতে হবে। এমনটাই বলা আছে বাংলাদেশ সরকারের গেজেটকৃত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কর্মপরিকল্পনা ২০১২-র বিভিন্ন উপধারায় [দেখুন ২২, ২৯, ৬৬, ৭৪, ৭৮, ১০৬, ১৩৫, ১৪১, ১৫১, ১৫২ নং উপধারা] [১]।
প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অভাব থাকলেও দেশে উৎসাহী সৌখিন জ্যোতির্বিদ্যা-চর্চাকারীদের চর্চা থেমে নেই। সেই আশির দশকে হ্যালির ধূমকেতু আবির্ভাবের পর থেকে দেশে অন্তত তিনটি প্রধান সংগঠন জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ে সভা-সমিতি, কর্মশালা, সেমিনার-সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করে চলেছে। এই ধারাটি খুব পুষ্ট নয়, কেননা প্রাতিষ্ঠানিকতার অভাবে এতদবিষয়ে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান সৃষ্টি করা যায়না। ব্যক্তিগত অনুদানভিত্তিক সীমিত চর্চার মাধ্যমে যতটুকু করা সম্ভব ততটুকুই হচ্ছে। ইদানিং সোশাল মিডিয়ার আবির্ভাবের ফলে প্রধান ধারার বাইরেও কিছু স্থানীয় উৎসাহী তরুণ-তরুণী জ্যোতির্বিজ্ঞানের কিছু কাজ করেন, অ্যাস্ট্রো-অলিম্পিয়াড হয়। কিন্তু ধারাবাহিক ঐতিহ্য আমরা সৃষ্টি করতে পারিনি।
জ্যোতির্বিজ্ঞানে ঐতিহ্য সৃষ্টি করতে হলে কিংবা বহির্বিশ্বের গবেষণার সাথে তাল মেলাতে হলে এখনই আমাদের তিনটি ব্যাপারে নজর দেওয়া প্রয়োজন- ১. বিশ্ববিদ্যালয় কারিকুলামে জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং মহাকাশ সংক্রান্ত বিষয়াদি সংযোজন, ২. একটি জ্যোতির্বিজ্ঞান ও মহাকাশ বিজ্ঞান গবেষণা ইনস্টিটিউট গঠন এবং ৩. একটি জাতীয় মানমন্দির বা ন্যাশনাল অবজার্ভেটরি নির্মাণ। এই তিনটি বিষয়ই প্রাগুক্ত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কর্মপরিকল্পনা ২০১২-য় অন্তর্ভুক্ত আছে [বিশেষ করে ৭৮, ১৪১, ১৫১, ও ১৫২ উপধারায়]।
সুখের বিষয়, এই উদ্দেশ্য-ত্রয়ীর শেষেরটি নিয়ে সমপ্রতি সরকার বাহাদুর চিন্তাভাবনা শুরু করেছেন। জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক একটি মানমন্দির আমাদের জন্য এখন একটি সময়ের দাবি। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ থাইল্যান্ডও এখন জ্যোতির্বিজ্ঞান-চর্চায় ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে। চীন ও ভারতের কথা বাদই রাখি, কেননা তারা এই বিষয়ে এখন সারা পৃথিবীর কাছে নমস্য। আমি উল্লেখ করতে চাই, মঙ্গোলিয়া এবং ভুটান সমপ্রতি জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ে ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। ভুটানের জন্য একটি জাতীয় মানমন্দির কিংবা জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণা-কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার কাজে থাইল্যান্ডের জাতীয় প্রতিষ্ঠান (ঘঅজওঞ) একাডেমিক এবং প্রায়োগিক সাহায্য করছে, আমি জেনেছি। সমপ্রতি আমাদের দেশে ধর্মীয় উৎসবের দিন ধার্য করতে গিয়ে বেশ কিছু সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল, এটা আমরা সবাই জানি এবং এটা যে পর্যবেক্ষণ বিষয়ে জ্ঞানের খামতি থেকে সেটা আমরা হয়ত বুঝতে পেরেছি। এই প্রসঙ্গেই আমরা কয়েকটি মাধ্যমে কয়েকবার বলবার চেষ্টা করেছি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কর্মপরিকল্পনা অনুসরণ করে একটি জাতীয় মানমন্দির প্রতিষ্ঠা করতে পারলে জ্যোতিষ্ক সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণের অসুবিধাদি দূর হবে, যদি অবশ্য আপনি দুরবিনে চোখ রাখতে আগ্রহী হন। এই প্রসঙ্গেই স্বনামধন্য এবং জনপ্রিয় অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল গত ২৭ জুন ২০১৯ একটি লেখার [‘একটি স্বপ্ন,’ যঃঃঢ়ং://ড়ঢ়রহরড়হ.নফহবংি২৪.পড়স/নধহমষধ/ধৎপযরাবং/৫৬৭৬৬] মাধ্যমে জাতীয় মানমন্দির সংক্রান্ত একটি প্রস্তাবনা এবং তৎসংক্রান্ত একটি সুলিখিত এবং যুক্তিপূর্ণ ভাব-পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন। সেখানে প্রথম আমরা জানতে পারলাম যে সরকার বাহাদুর একটি মানমন্দির করার কথা সত্যিই ভাবছেন। ফলে আমরা যারা দীর্ঘদিন একটি মানমন্দির প্রতিষ্ঠার কথা ভাবছিলাম বা এ সংক্রান্ত কিছু কাজ করেছিলাম, তাদের জন্য এ এক অসম্ভব সুসংবাদ।
জানিয়ে রাখা যেতে পারে, প্রয়াত অধ্যাপক ড এ আর খানের [ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রনমিকাল সোসাইটির প্রাক্তন সভাপতির নেতৃত্বে একটি টিম টেকনাফ ও কক্সবাজার এলাকার পাহাড়ি অঞ্চলসমূহ ম্যাপিং করে এসেছিল সেই ২০১০ সালের দিকে। পরবর্তীতে মানমন্দির প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত একটি খসড়া আমরা তৈরি করেছিলাম যার বাজেট ছিল ২০০ কোটি টাকা। মূল ধারণাপত্রটি তৈরি করেছিলেন এফ. আর সরকার (প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রনমিকাল সোসাইটি) যেখানে একটি ২ দশমিক ৩ মিটার ব্যাসের প্রতিফলক টেলিস্কোপ এবং ৫০ একর জায়গা, ভবনাদি নির্মাণ, মিউজিয়াম এবং একটি গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ একটি বিশদ খসড়া ছিল।
উক্ত খসড়া প্রস্তাবে মানমন্দির বা ‘অবজার্ভেটরি’ বলতে আমরা বৈনু বাপ্পু মানমন্দির (কাভালুর, ভারত), পালোমার মানমন্দির কিংবা গ্রিফিথ মানমন্দির (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র), ন্যাশনাল অ্যাস্ট্রনমিকাল অবজার্ভেটরি অব জাপান (মিতাকা, টোকিও), রয়াল গ্রিনউইচ মানমন্দির (যুক্তরাজ্য) ইত্যাদির কথা মাথায় রেখেছিলাম। মানমন্দির স্থাপনের কিছু সুনির্দিষ্ট শর্ত আছে- আবহমণ্ডলীয় সুস্থিতি, পরিষ্কার আকাশ মেঘমুক্ত থাকার অনুপাত, বাতাসের প্রবাহ-আর্দ্রতা-ঘনত্ব, বাতাসে অ্যারোসল কিংবা অন্য কণার উপস্থিতি এবং দূষণমুক্ত (ধূলি ও আলো) পরিবেশ, উঁচু স্থান, কিছুটা লোক-বর্জিত নির্জনতা, আর্দ্রতামুক্ত আবহ, বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈকট্য ও গবেষণা-পরিচালনার সক্ষমতা, প্রয়োজনীয় রসদের সুলভতা ও সরবরাহ নিশ্চিত করা, ভূমির সিসমিক সক্রিয়তা, বন্যা ও অন্যান্য মানদণ্ড। এইরকম প্রায় ১১টি সুনির্দিষ্ট শর্তের [২] বহুমাত্রিক সিদ্ধান্ত (সঁষঃর-পৎরঃবৎরধ ফবপরংরড়হ ধহধষুংরং) বিবেচনার (এর কোনোটি না হলে হবে না এমন নয়, তবে কিছু শর্তের প্রয়োজন আছে যদি আপনি প্রকৃত পর্যবেক্ষণ, পরিমাপন ও ডেটা সংগ্রহে আগ্রহী হন) মাধ্যমে মানমন্দিরের স্থান নির্দিষ্ট করা উচিত। এগুলো ছাড়াও কোনো কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার রয়েছে আরো কিছু সম্পূরক শর্তাবলি। যেমন চীন-ভিত্তিক এশিয়া-প্যাসিফিক স্পেস কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (অংরধ-চধপরভরপ ঝঢ়ধপব ঈড়-ড়ঢ়বৎধঃরড়হ ঙৎমধহরুধঃরড়হ, অচঝঈঙ, যঃঃঢ়://িি.িধঢ়ংপড়.রহঃ/) বাংলাদেশের জন্য একটি বড় টেলিস্কোপ বসাতে আগ্রহী। তারা মানমন্দির স্থান-নির্বাচনের জন্য পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত যেসব শর্ত দিয়েছে তার কয়েকটি হলো বছরে ন্যূনতম ২৭০ দিন পরিষ্কার রাতের-আকাশ থাকতে হবে, রাতের আকাশে প্রতি বর্গ আর্ক-সেকেন্ডে উজ্জ্বলতার মান ২০-এর কম হতে হবে, দুরবিনের ভিত্তিকে অনুভূমিক ধরে ১০ ডিগ্রি কৌণিক উচ্চতার উপরে কোনো বাধা থাকতে পারবে না, জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক দর্শন-যোগ্যতার প্যারামিটার (ধংঃৎড়হড়সরপধষ ংববরহম ঢ়ধৎধসবঃবৎ) ২ আর্ক-সেকেন্ড বা তার কম ইত্যাদি। এছাড়াও গভর্নেন্স, ম্যানেজমেন্ট, লজিস্টিকস ও ইনফ্রাস্ট্রাকচার (বিদ্যুতের চাহিদা, ডেটার চাহিদা, রসদ ও নির্মাণ-সামগ্রির প্রাপ্যতা ও সরবরাহ, জাতীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা থেকে দূরত্ব, খোলামেলা স্থান ইত্যাদি) বিষয়ে তাদের রয়েছে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা। এইসব মানদণ্ডের ভিত্তিতে বাংলাদেশের কয়েকটি স্থানের সুপারিশ করা যেতে পারে- কক্সবাজার-টেকনাফ পাহাড়ি অঞ্চল, চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চল, সিলেটের জৈন্তা পাহাড়ি অঞ্চল এবং ময়মনসিংহের গারো পার্বত্যভূমি তাদের অন্যতম। এর জন্য প্রয়োজন একটি যথোপযুক্ত ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থা (এওঝ) এবং দূর অনুধাবন প্রযুক্তিসমূহের সহায়তায় একটি সমন্বিত কার্যক্রম যা বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী, পেশাদার এবং সৌখিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী, দুরবিন ব্যবহার করেছেন বা অ্যাস্ট্র-ইন্সট্রুমেন্টেশনে অভিজ্ঞ এমন কেউ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ওয়াকিবহাল এমন কয়েকজনের সহায়তা, অন্তর্ভুক্তি এবং সমন্বয়ের মাধ্যমে করতে হবে। এটা একটা জাতীয় প্রতিষ্ঠান হবে যা জাতির জন্য এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও গর্বের বিষয়বস্তু হবে। মানমন্দির প্রতিষ্ঠা বিষয়ে বাংলাদেশকে সহায়তার বিষয়ে চীন, জাপান এবং থাইল্যান্ডের আগ্রহ আছে বলে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় জেনেছি। বিশেষ করে, চীন এখন আমাদের বিশেষ উন্নয়ন সহযোগী আর জাপান আমাদের পুরনো বন্ধু। ফলে এ দুটো অভিজ্ঞ রাষ্ট্রকে আমরা এই কাজে সাথে পাব। মাননীয় সরকার বাহাদুর এটা নিশ্চয় ভেবে দেখবেন।
এই আলোচনায় বোঝা যায় একটি জাতীয় মানমন্দির ঠিক কীভাবে কোথায় তৈরি করা যেতে পারে। দুঃখের বিষয়, অধ্যাপক জাফর ইকবাল স্যার কর্তৃক উত্থাপিত এবং প্রস্তাবিত ‘কর্কট ক্রান্তি এবং ৯০ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমার ছেদ বিন্দুটি’ কোনোক্রমেই একটি জাতীয় মানমন্দিরের জন্য উপযুক্ত স্থান হতে পারে না, কেননা এটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের জন্য কোনো গুরুত্ব বহন করেনা। মনে রাখতে হবে, দ্রাঘিমা রেখাগুলি মানুষের প্রয়োজনানুযায়ী কল্পিত, সময় রক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজের জন্য উপযুক্ত, এর সাথে জ্যোতিষ্কের পর্যবেক্ষণ বা মানমন্দির পরিচালিত আলোকীয় ও বেতার তরঙ্গের গবেষণা একেবারেই সংশ্লিষ্ট নয়। এই ছেদবিন্দুটিতে মানমন্দির তৈরি প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান সংস্থার (ওঅট) প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর পিয়েরো বেনভেনুটি জানিয়েছেন ‘একটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক মানমন্দিরের জন্য ৯০-ডিগ্রি পূর্ব-দ্রাঘিমা এবং কর্কটক্রান্তি রেখার ছেদবিন্দুটির কোনো আলাদা গুরুত্ব নেই। মহাকাশের খণ্ড গোলকের দৃশ্যমানতায় দ্রাঘিমার কোনো প্রভাব নেই, তবে অক্ষাংশের আছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্থানটিতে পরিষ্কার-আকাশ-যুক্ত রাতের সংখ্যা : এই ডেটা সহজেই পাওয়া যাওয়ার কথা। অন্য বিষয়গুলি হল কম আলোক দূষণ এবং কম মাত্রার আপেক্ষিক আর্দ্রতাঃ তোমাদের দেশটি মূলত সমতল ভূমি এবং মৌসুমী জলবায়ু অধ্যুষিত বিধায় বড় টেলিস্কোপ বসানোর জন্য আদর্শ ভূমি নয়। তবে একটি শিক্ষানবিশ টেলিস্কোপ বসিয়ে যদি অ্যাস্ট্রনমি প্রোমোট করতে চাওয়া হয় তবে নন- আইডিয়াল কনডিশন বিবেচনা করা যেতে পারে। এখনকার আধুনিক এক-মিটার টেলিস্কোপগুলি সিরিয়াস গবেষণার জন্য যথেষ্ট উপযুক্ত (উপরোক্ত পারিবেশিক সীমাবদ্ধতার কথা মাথায় রেখেই)’ [৩]।
উক্ত বিমূর্ত ছেদবিন্দুটিতে একটি চিহ্নরেখা রাখা যেতে পারে, বা একটি স্তম্ভ যা ভূগোল শিক্ষার জন্য কিংবা বৈজ্ঞানিক আমোদের জন্যেও উপযুক্ত বিবেচিত হতে পারে, কিন্তু কোনোক্রমেই মানমন্দির নয়। আরেকটি কথা, ভাঙ্গা উপজেলা যেহেতু পদ্মা সেতুর পশ্চিম পার্শ্বে পড়ে এবং সম্ভবত জাতীয় সড়কের একদম নিকটে বিধায় ঐ প্রস্তাবিত স্থানটির উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক গুরুত্ব মাথায় রেখে সেখানে ঐ প্রস্তাবিত নামেই একটি ‘বঙ্গবন্ধু স্পেস পার্ক’ করা যেতে পারে যা জ্যোতির্বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য, সেমিনার বা বক্তৃতার জন্য, প্লানেটারিয়ামের জন্য খুবই প্রাসঙ্গিক। ফলে আমরা অধ্যাপক জাফর ইকবাল স্যারের কাছে কৃতজ্ঞ তিনি এই ছেদবিন্দুটির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে একটি চমৎকার জনবোধ্যতার জায়গা সৃষ্টি করেছেন এবং অবশ্যই একটি অত্যাধুনিক ‘স্পেস সায়েন্স অ্যান্ড অ্যাস্ট্রনমি ইনস্টিটিউট’ হিসেবেও জায়গাটি মন্দ নয় (ঢাকার থেকে দূরে, লোকালয় থেকেও কিছুটা দূরে, কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থার বাইরে নয়- এমন পরিবেশ বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য বিশেষ উপযোগী, কিন্তু পর্যবেক্ষণের জন্য আপনাকে বিশেষ শর্তের কথা মাথায় রাখতে হবে)। তবে মনে রাখতে হবে, পৃথিবীর অক্ষীয় বিচলনের কারণে পৃথিবীর আনতি কোণের (ড়নষরয়ঁরঃু) পরিবর্তন ঘটে। ফলে উক্ত ছেদবিন্দুটি প্রতি শতাব্দীতে ৪৭-সেকেন্ড পরিমাণ দক্ষিণে সরে যায় [৪]। ফলে ১০০ বছর পর এটি দেড় কিলোমিটার সরে যাবে, যা প্রতি বছরে প্রায় ১৫ মিটার সরণের সমান।
শেষ করছি অধ্যাপক ড. সুলতানা নাহারের বাক্য দিয়ে- ‘এই ছেদবিন্দুটিতে প্রস্তাবিত নামের অধীনে একটি চমৎকার ফ্যাসিলিটি হতে পারে যেখানে মানুষ বেড়াতে আসতে পারে এবং রোদের মধ্যে ছায়াহীন হয়ে ঘোরাঘুরি উপভোগ করতে পারে।
এর ফলে মানুষ সূর্য, পৃথিবী এবং মহাজাগতিক স্থানাংক সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হবে। কিন্তু প্রস্তাবিত স্থানটি মানমন্দিরের মাধ্যমে শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্র প্রসারণের উপযুক্ত স্থান নয়।’

সৌজন্যে : বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম

x