জীবন সংগ্রামে সফল তারা

মোরশেদ তালুকদার

বৃহস্পতিবার , ১৪ নভেম্বর, ২০১৯ at ২:৪৬ পূর্বাহ্ণ
174

১৯৭১ সালের ৩০ এপ্রিল। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অতর্কিত আক্রমণ করে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার সুখছড়ি ব্রাহ্মণপাড়ায়। নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করে গ্রামের সাতজনকে। বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে। এ ধ্বংসযজ্ঞ থেকে নিজেকে রক্ষায় ঝোপের ভেতর আশ্রয় নেন ১৫ বছরের কিশোরী রত্না চক্রবর্তী। কিন্তু রক্ষা পাননি। যাওয়ার সময় তাকে ধরে নিয়ে যায় হানাদাররা। এরপর প্রায় এক মাস দোহাজারী ক্যাম্পে বন্দি রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালায় তার ওপর। বর্বর নির্যাতন সইতে না পেরে একদিন জ্ঞান হারান তিনি। তখন তাকে মৃত ভেবে ফেলে দেয়া হয় ক্যাম্পের বাইরে।

সেদিনের সেই কিশোরী রত্না চক্রবর্তী এখন দুই ছেলে-দুই মেয়ের জননী। যদিও এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন দীর্ঘ ৪৮ বছর আগে তার সাথে হওয়া অমানবিক ঘটনার বিভীষিকাময় স্মৃতিগুলো। তবে হৃদয়ে যন্ত্রণা থাকলেও দমে যাননি তিনি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে মেট্রিক পাশ করেছেন। বেঁচে থাকার জন্য এবং সন্তানদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য এখন কাজ করছেন নগরীর একটি অভিজাত শপিং মলের পরিচ্ছন্নকর্মী পদে। তাঁর এ জীবনযুদ্ধ বৃথা যায়নি।
গত ২৯ জুলাই রত্না চক্রবর্তীকে ‘বীরাঙ্গনা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে গেজেট (৩১০) প্রকাশ করেছে সরকার। সর্বশেষ ‘নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে নতুন উদ্যামে জীবন শুরু’ ক্যাটাগরিতে চট্টগ্রাম বিভাগে শ্রেষ্ঠ ‘জয়িতা’র সম্মাননা পেয়েছেন। গতকাল বুধবার নগরীর এলজিইডি কনফারেন্স হলে তার হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা।
রত্না চক্রবর্তী দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘পুরস্কার পেয়ে খুব ভালো লাগছে। আমার তো কষ্টের জীবন। আফমি প্লাজায় সেকেন্ড ফ্লোরে ক্লিনারের কাজ করছি। মেট্রিক পাশ করেও ক্লিনারের কাজ করছি, সেজন্য আমার কোনো দু:খ নেই। ছেলে-মেয়েদের মানুষ করেছি, তাদের বিয়ে করিয়েছি। এখন নিজে চলার জন্য ক্লিনারের কাজ করছি।’
মুক্তিযুদ্ধকালের সেই দু:সহ দিনগুলোর পর ঘুরে দাঁড়ানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাদল চক্রবর্তী নামে একজন আমাকে অজ্ঞান অবস্থায় নিয়ে যান এবং সেবা-যত্ন করে সুস্থ করেন। তিনি আমাকে বিয়ে করেন। স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করে আমাকে বাঁচার সুযোগ দিয়েছেন। তিনি জানান, ২০১৫ সালের ২২ এপ্রিল বীরাঙ্গনা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে আবেদন করেন। সর্বশেষ এ বছর স্বীকৃতি পান। অবশ্য এ স্বীকৃতি দেখে যাতে পারেননি তার স্বামী বাদল। তিনি ২০১৫ সালের জুলাই মাসে মারা যান।
প্রসঙ্গত, নারীদের আত্মশক্তিতে উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত করার লক্ষ্যকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দেশব্যাপী ‘জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ’ শীর্ষক কার্যক্রম শুরু হয়েছিল ২০১৩ সালে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালে বিভিন্ন ক্ষেত্রে তৃণমূল সফল হয়েছেন চট্টগ্রাম বিভাগের ১১ জেলারর এমন ৫৫ জন নারীকে গতকাল সম্মাননা দেয়া হয়। মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উদ্যোগে ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার অফিসের ব্যবস্থাপনায় হয়েছে এ সম্মাননা অনুষ্ঠান। বিভাগীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ জয়িতারা হচ্ছেন- অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী ইয়াছমিন আক্তার (কঙবাজার), শিক্ষা ও চাকুরি ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী ডা. সুপর্ণা দে সিম্পু (চট্টগ্রাম), সফল জননী নারী সপনেহার বেগম (ব্রাহ্মণবাড়িয়া), নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করা নারী রত্না চক্রবর্তী (চট্টগ্রাম) ও সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখা নারী পাইংম্রাউ মার্মা (বান্দরবান)।
একজন সফল মা : চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের একটি কলেজে শিক্ষকতা করেন সুমি আকতার। অথচ জন্মের সময় দুই হাত ত্রুটিপূর্ণ (দুই হাতের কব্জি ছিল না) থাকায় পেয়েছেন ‘অপয়া’ উপাধি। এমনকি তার মাকে পাড়া-প্রতিবেশিরা তাকে মেরে ফেলার পরামর্শ দিয়েছিলেন! কারণ হিসেবে প্রতিবেশিদের যুক্তি ছিল, এ মেয়ের ভবিষ্যৎ হবে অন্ধকার। সেই শংকা কাটিয়ে সুমি এখন আলো ছড়াচ্ছেন শিক্ষার। এবং স্বপ্ন দেখছেন বিসিএস ক্যাডার হওয়ার।
অবশ্য এতদূর এগিয়ে আসার পথটা সহজ ছিল না সুমির। এর পেছনে আছে অন্য গল্প। এ গল্প একজন মায়ের। যিনি প্রতিবেশির অবজ্ঞা এড়িয়ে সুমিকে এগিয়ে যেতে সাহস দেখিয়েছেন। সবসময় পাশে ছিলেন। তিনি সুমির মা আমেনা বেগম। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের ফাজিলপুরের আনোয়ার হোসেনের স্ত্রী। ত্রুটিপূর্ণ হাত হওয়ায় সুমি ছোটবেলায় লিখতে পারতো না। কিন্তু হাল ছাড়েননি আমেনা বেগম। সংসারের কাজ সেরে সময় দিয়েছেন মেয়েকে। তার চেষ্টায় দুই হাত একসাথে করে লিখতে শিখেছেন সুমি। সেই শুরু। অত:পর এগিয়ে চলা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে অনার্স-মাস্টার্স করেছেন। দীর্ঘ এ পথচলায় ছিল মায়ের নানা ত্যাগ। এ ত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে সুমি বললেন, ‘কেউ আমাকে সফল বললে মানি না। আমি বলি, আমি নয়। বরং সফল হয়েছেন আমার মা।’ প্রসঙ্গত, সুমির মা আমেনা বেগম নির্বাচিত ৫৫ জন জয়িতার একজন। তিনি ‘সফল জননী’ ক্যাটাগরিভুক্ত।
আরো কিছু গল্প : শিক্ষা ও চাকুরি ক্ষেত্রে সাফল্য আর্জনকারী বাঁশখালী উপজেলার জলদীর ডা. সুপর্ণা দে সিম্পুর শুরুটাও সহজ ছিল না। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে পড়ার সময় বিয়ে হয়ে যায় তার। শংকা তৈরি হয় পড়ালেখা শেষ করা নিয়ে। তখন পাশে দাঁড়ান স্বামী। অতঃপর ২০১২ সালে স্নাতক শেষ করেন। এর মধ্যে এক সন্তানের মাও হন তিনি। তখন নিকটাত্মীয়রা নানা কথা বলতে শুরু করেন। কেউ বলেছেন, ‘এত পড়ালেখা করে কী হবে। যদি কিছু করতে না পারে। তার চেয়ে সংসারে মনোযোগ দেয়া উচিত।’ তখন সুপর্ণা সিদ্ধান্ত নেন, কিছু একটা করতে হবে এবং একটা স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। সর্বশেষ ৩৫তম বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেন। তবে শিক্ষকতা, সংসার এবং সন্তান সবাইকে সামলে বিসিএসর প্রস্তুতি নেয়াটা কঠিন হচ্ছিল তার। মনে হচ্ছিল, ‘সম্ভব না’। কিন্তু তিনি চেষ্টা করেছিলেন। এরি মধ্যে জানতে পারেন আবারও মা হতে যাচ্ছেন তিনি। ওইসময় বিসিএস লিখিত পরীক্ষার ডেট ছিল সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে এবং অনাগত সন্তানের জন্ম নেয়ার সম্ভাব্য সময়ও ছিল সেপ্টেম্বরে।’
সেইদিনগুলোর কথা স্মরণ করে সুপর্ণা বলেন, শেষ পরীক্ষার আগের রাতে ভোর চারটা বাবুর জন্ম হয় এবং আমার জ্ঞান আসে সকাল ৮টায়। তখন আমি ভাবছিলাম, আগের লিখিত পরীক্ষাগুলো ভালোভাবে দিয়েছি। শেষটা না দিলে কিভাবে হবে। শেষ পর্যন্ত হাসপাতাল থেকে সাড়ে ৯টায় অ্যাম্বুলেন্সে করে এমইএস কলেজে পরীক্ষা দিতে যায়। সবাই সেদিন খুব অবাক হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত প্রকাশিত ফলাফলে প্রাণিসম্পদ ক্যাডারে নিয়োগপ্রাপ্ত হই।’
সফল এ নারী বলেন, যদি স্বপ্ন থাকে তাহলে নারীদের এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কিছুই বাধা হতে পারে না। তবে এক্ষেত্রে পাশে থাকতে হবে পরিবারকে।

x