জীবনকে আরো গতিশীল করতে যানজটমুক্ত সময়ের বিকল্প নেই

শুক্রবার , ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৪:৪২ পূর্বাহ্ণ
42

যানজট এখন চট্টগ্রামবাসীর জন্য এক বিড়ম্বনার নাম। দেশের অগ্রগতিকে থামিয়ে দিচ্ছে এ ভয়ঙ্কর সমস্যা। যানজটের কারণে যে সময়ক্ষেপণ ঘটছে- অর্থনীতির বিচারে তার ক্ষয়ক্ষতি ভয়াবহ। এ সমস্যা উৎপাদনশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। দেশের রফতানি বাণিজ্যকে অনিশ্চিত করে তুলছে। বিদেশিরা বাংলাদেশের রাজধানীকে অস্বস্তির দৃষ্টিতে দেখে যানজটের কারণে। বলা যেতে পারে, যেসব কারণে বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগ বিঘ্নিত হচ্ছে যানজট তার অন্যতম। প্রায় ৭০ লক্ষ জনসংখ্যা অধ্যুষিত চট্টগ্রাম মহানগরী অন্যতম মেগাসিটি হিসেবে প্রতিষ্ঠার বড় অন্তরায় যানজট।
দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থেকে অনেক সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে পড়ে। যানজটের কারণে মুমূর্ষু রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে সমস্যা হয়। বস্তুত যানজটের কারণে চট্টগ্রামবাসীর সামগ্রিক জীবনধারাই পাল্টে গেছে। একসময় এ শহরে ৩০ মিনিটের দূরত্ব অতিক্রম করতে অনেক সময় চলে যায়। এখন অবস্থা এতটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে যে, সামান্য দূরত্ব অতিক্রম করতেও কত সময় লাগবে আগের থেকে অনেক বেশি। ফলে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছাড়া মানুষ এখন আর কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগদানের কথা চিন্তাও করে না। এই বিচ্ছিন্নতা যে সমাজে ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করে দিয়েছেন।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর দৈনিক আজাদীতে ‘তীব্র যানজট ভোগান্তি’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়েছে, নগরের অধিকাংশ সড়কে গত রোববার তীব্র যানজট দেখা গেছে। এতে নাগরিক জীবন অনেকটাই থমকে দাঁড়ায়। ভোগান্তিতে পড়ে যাত্রীরা। সরেজমিনে দেখা গেছে, সকালে জামালখান, সিরাজুদ্দৌলা রোড, চকবাজার, প্রবর্ত্তক মোড়, জিইসি মোড়, ওয়াসা মোড়, আগ্রাবাদ, কদমতলী ও বহদ্দারহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় তীব্র যানজট ছিল। সন্ধ্যার পরেও এসব এলাকায় যানজটের ধকল কাটেনি। ওয়াসার খোঁড়াখুঁড়ি ও সিটি করপোরেশনের রিপিয়ারিংয়ের কারণে অনেকক্ষেত্রে এসব যানজটের সৃষ্টি হতে দেখা গেছে। অপরদিকে যানজটে ধুলোবালির দাপটে স্কুল শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।
ট্রাফিক আইন না মানা, পরিকল্পনার অভাব, ফুটপাত দখল, প্রাইভেটকারের সংখ্যা বিদ্যুৎ গতিতে বৃদ্ধি পাওয়াও যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে যানজটের কারণ হিসেবে ভাঙাচোরা রাস্তা এবং কারণে-অকারণে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়িকেও দায়ী করা হচ্ছে। যেখানে- সেখানে পার্কিং, ফুটপাত দখল করে দোকান বসানো ইত্যাকার সমস্যা তো বহু পুরনো। কিছুতেই নগরীর যানজট সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। যানজট পরিস্থিতি দিনই দিনই জটিল হচ্ছে।
যানজট নিরসনে বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ফ্লাইওভার, ওভারব্রিজ নির্মাণ করে রাস্তার পরিধি বাড়ানো হচ্ছে। পরিকল্পনা করা হচ্ছে মেট্রোরেল ও উড়াল সেতু নির্মাণের। অধিকাংশ রাস্তাগুলোকে পাকা সড়কে রূপান্তর করা হচ্ছে। অনুন্নত ভাঙা ও খানাখন্দকপূর্ণ সড়কগুলোকে মেরামত করা হচ্ছে। তবে নগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে নগর পরিকল্পনাবিদগণ বেশকিছু পরামর্শ দিয়েছেন। এ সুপারিশগুলোর মধ্যে কাউন্টারভিত্তিক বাস ও হিউম্যান হলার চালু, হকার উচ্ছেদ, রেজিস্ট্রেশনবিহীন রিকশা, সিএনজি ট্যাক্সি ও টমটম উচ্ছেদ, নামীদামি কয়েকটি স্কুলের শিক্ষার্থী, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ডাক্তার আর রোগীদের প্রাইভেট কার পার্কিংয়ে কড়াকড়ি উল্লেখযোগ্য। এসব সমস্যার সমাধানের পাশাপশি রাস্তাঘাটকে যানজট মুক্ত করতে আরো কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত দিয়েছেন। তারমধ্যে রয়েছে : ছোট রাস্তাগুলোকে যথাসম্ভব দীর্ঘ ও প্রশস্ত করতে হবে, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং বন্ধ করতে হবে, লাইসেন্স বিহীন যানবাহন বা অবৈধ যানবাহন চলাচল বন্ধ করতে হবে, ট্রাফিক আইন আরো কার্যকরী ও ট্রাফিক পুলিশের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। অপরিকল্পিত বাড়িঘর নির্মাণ বন্ধ করতে হবে, রাস্তাগুলোকে বহু লেন বিশিষ্ট করে ধীর গতির ও দ্রুত গতির যানবাহনের জন্য আলাদা লেনের ব্যবস্থা করতে হবে ইত্যাদি।
যানজট জনজীবনে শুধু অস্বস্তি আর দুর্ভোগের কারণ নয় বরং তা অর্থনৈতিকভাবে জাতীয় অর্থনীতিকে দুর্বল করে দেয়। তাই আধুনিক গতিময় জীবনকে আরো গতিশীল করতে যানজটমুক্ত জীবনের কোনো বিকল্প নেই। তাই যানজট নিরসনে সবার এগিয়ে আসা উচিত।

x