জিরাফের গলা কেন লম্বা!

সনেট দেব

বুধবার , ২৩ অক্টোবর, ২০১৯ at ১০:২২ পূর্বাহ্ণ
37

পৃথিবীর সব চাইতে লম্বা প্রাণী হিসেবে জিরাফের অবস্থান প্রধান। দৈর্ঘ্য একটি জিরাফ প্রায় ১৯ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। এছাড়া জিরাফের লম্বা উঁচু বলে উচ্চতম প্রাণীদের কাতারেও জিরাফের অবস্থান প্রথম সারিতে। এদের দৃষ্টিশক্তিও খুব প্রখর। ফলে বহুদূরের শত্রুকেও জিরাফ সহজেই দেখতে পারে। এছাড়া জিরাফ খুব জোরে দৌড়াতে পারে। আক্রমণের শিকার হলে জিরাফকে ঘণ্টায় প্রায় ৫৬ কিলোমিটার বেগে দৌড়াতে পারে। জন্মের সময় একটি জিরাফ প্রায় ৬ ফুট লম্বা হয় এবং এর ওজন থাকে গড়ে ৬৮ কেজি। অনেক জিরাফের মাথায় দুইটি বা চারটি ভোঁতা শিংও থাকে। জিরাফের জিভ খুব লম্বা। নিজের কান পরিষ্কারের জন্য জিরাফ তার প্রায় ২১ ইঞ্চি লম্বা জিভ ব্যবহার করে থাকে।
স্বভাব ও প্রকৃতি দিক বিবেচনা করলে, জিরাফ মূলত নিরিহ স্বভাবের একটি প্রাণী। তবে আক্রান্ত হলে যুদ্ধংদেহী রূপ ধারণ করে তারা। জিরাফ মূলত সিংহ, বন্য কুকুর ও হায়েনা দ্বারা আক্রান্ত হয়। প্রতি বছর সিংহের আক্রমণে বেশ কিছু জিরাফ মারা যায়। তবে একটি পূর্ণবয়স্ক জিরাফকে সিংহ খুব সহজে আক্রমণ করতে চায় না, কারণ জিরাফের লাথির আঘাতে সিংহ মারাত্মক আহত হতে পারে। জিরাফের লাথির আঘাতে সিংহ মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটে অহরহ। তাই শিশু ও অপেক্ষাকৃত দুর্বল জিরাফই সিংহের আক্রমণে মারা পড়ে। তবে বাচ্চা জিরাফকে আক্রমণ করার সময় সিংহকেও সাবধানে থাকতে হয়। কারণ বাচ্চা জিরাফের আশেপাশে মা জিরাফ থাকে। এছাড়া দলবদ্ধভাবে চলাফেরা করার সময় সিংহ কখনো জিরাফকে আক্রমণ করে না। এছাড়া আক্রমণের ভয়ে জিরাফ কখনো বসে ঘুমায় না বা বিশ্রাম নেয় না। কারণ জিরাফের বসতে যেমন সময় লাগে প্রচুর, তেমনি বসা থেকে দাঁড়াতেও অনেক সময় নেয়। এছাড়া প্রকৃতিগত ভাবেই জিরাফ লম্বা হওয়ায় বসতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। তবে দলগতভাবে থাকা অবস্থায় কিছু কিছু জিরাফ মাঝে মাঝে বসে বিশ্রাম নেয়। পানি খাওয়া, ঘুমানো কিংবা দিনের বেলা বিশ্রামের সময় অন্তত একটি জিরাফ আশেপাশে নজর রাখে শত্রুর উপস্থিতি জানানোর জন্য। খুব নিচু আওয়াজে এরা পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলে। এদের গলার আওয়াজ ২০ হার্জেরও নিচে। ফলে জিরাফের আওয়াজ মানুষ শুনতে পায় না। জিরাফ সাধারণত নিজেদের মধ্যে লড়াই করে না। তবে খেলাধুলা করার সময় কিংবা খুব বেশি রাগান্বিত হলে পুরুষ জিরাফরা মাঝেমধ্যে একে অন্যের সাথে লড়াই করে।
এদের প্রধান খাদ্য গাছের পাতা। বিশেষ করে অ্যাকাশিয়া গাছের পাতা এদের খুব প্রিয়। যদিও এই গাছ বেশ উঁচু হয়, কিন্তু লম্বা গলার জন্য জিরাফ খুব সহজেই এই গাছের পাতা খেতে পারে। যে কারণে যে এলাকায় অ্যাকাশিয়া গাছ বেশি দেখা যায়, সেখানে জিরাফের দেখা মেলে বেশি বেশি। জিরাফের আরেকটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এরা উটের মতো পানি না খেয়ে দীর্ঘদিন কাটিয়ে দিতে পারে। স্বাভাবিকভাবে একটানা সাতদিন পানি না খেলেও এদের কোনো সমস্যা হয় না। গাছের পাতায় যে পানি থাকে, তা দিয়েই তাদের চাহিদা মিটে যায়।
প্রানী জগতের অসাধারণ সুন্দর এই পশুটি দেখতে ভীষণ আদুরে হলেও অন্য সব প্রানীর চেয়েও আকারে অনেক বড়, বিশাল উচু দেহের অধকিারী। তার ৪টি শক্তিশালী পা এবং শক্তিশালী তাঁদের গলা। জিরাফকে দেখায় অনেক সুন্দর হওয়ার কারণ হলো শরীরের চাইতে অনেক উচু গলা। কিন্তু কখনো ভেবেছেন কি, জিরাফের গলা এতটা লম্বা কেন? বিজ্ঞানী ল্যামার্ক ছিলেন ফরাসি প্রাণীতত্ববিদ। তিনি জৈব বিবর্তন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ ব্যক্ত করেন। তার মতবাদ গুলো ছিল অত্যন্ত গোছানো এবং যুক্তিপূর্ণ।
তাঁর মতবাদ গুলো সে সময় অনেক প্রশংসিত হয়। অনেকে আবার তাঁর মতবাদের বিরোধিতা করেন। কিন্তু বেশির ভাগ প্রাণীবিজ্ঞানী তাঁর মতবাদকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তাঁর একটি মতবাদ ব্যবহার ও অব্যবহার সূত্র হিসেবে পরিচিত। এই মতবাদ মতে কোন প্রাণী যদি কোন অঙ্গের ব্যবহার খুব বেশি পরিমাণে করে তাহলে সেই অঙ্গ ক্রমান্বয়ে উন্নত হতে থাকবে। তবে যদি কোন প্রাণী তার অঙ্গ অনেক দীর্ঘ সময় ব্যবহার না করে তাহলে তা ক্রমান্বয়ে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। জিরাফের গলা এই সূত্র মতে ক্রমান্বয়ে লম্বা হয়েছে। প্রাচীন যুগে আফ্রিকা অঞ্চল অত্যন্ত শুষ্ক ছিল। সেখানে কোন ঘাস জন্মাত না। কিন্তু বহু বড় বড় বৃক্ষ ছিল যার পাতা অনেক উপরে ছিল। জিরাফের আকার তখন ছিল অনেকটা ঘোড়ার মত। জিরাফের গলাটাও ছিল ঘোড়ার মত। শুষ্ক মরুভূমিতে এই জিরাফের খাবারের সঙ্কট দেখা দিল। জিরাফগুলো তখন নিচের ঘাস খাওয়া বাদ দিয়ে চেষ্টা করতে থাকে উপরের গাছের পাতা খাবার জন্য। কিন্তু গাছের নাগাল পাওয়া তাদের জন্য কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। তারা খুঁজে খুঁজে নিচু গাছের বের করে গলা খানিকটা লম্বা করে গাছের পাতা খেতে শুরু করল। এভাবে বহু প্রজন্ম ধরে গলার অত্যধিক ব্যবহারের ফলে জিরাফের মত লম্বা গলার প্রাণীর সৃষ্টি হয়েছে। এই পরিবর্তন এক দিনে হয় নি। হাজার হাজার বছরের চেষ্টায় এটা সম্ভব হয়েছে।

x