জাল : বাস্তবতার অনন্য দর্পন

সনেট দেব

বৃহস্পতিবার , ২১ নভেম্বর, ২০১৯ at ৪:৫০ পূর্বাহ্ণ
0

সময় যতই এগিয়ে যাক পুরুষশাসিত সমাজ ব্যবস্থায় নারী পুরুষের ভেদাভেদ এখনো প্রতীয়মান। তারপরও সেই দেয়াল ভেঙে বেরিয়ে এসে নিজের অবস্থান তৈরি করে নারীরা। কিন্তু দীর্ঘদিনের সংস্কারগ্রস্থ দেয়াল ভাঙার লড়াইয়ে অনেক সময় মুখ থুবড়ে পড়ে নারীর স্বপ্ন। কিংবা অতলেই হারিয়ে যায় নারী। তবুও থেমে থাকে না তাদের এগিয়ে চলার বাসনা। গন্ডি ভেঙে বার বার নিজের অবস্থান তৈরি করে নারীরা। শিক্ষায় আলোকিত হয়ে কুসংস্কারের জাল ছিন্ন করে তারা। তেমনি নানা ঘটনার প্রতিচ্ছবি তুলে আনা হয়েছে নাটক ‘জাল’এ। এককথায় বলা যায়, সামাজিক প্রেক্ষাপটের বাস্তব প্রতিফলন নাটক ‘জাল’।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব থিয়েটার আর্টস (বিটা)-এর ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে গত ২৩ অক্টোবর বুধবার দু’দিনব্যাপী আয়োজনের প্রথমদিনে চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে সন্ধ্যা সাতটায় মঞ্চস্থ হয় বিটার নতুন প্রযোজনা ‘জাল’। বাংলাদেশের মানুষের সামগ্রিক জীবন, সাংস্কৃতিক মান উন্নয়ন এবং সামাজিক প্রক্রিয়াসমূহকে পারফর্মিং আর্টস এর বিভিন্ন প্রায়োগিক মাধ্যমে গণতান্ত্রিক চর্চার সাথে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্য বিটার এই প্রযোজনা। এই নাটকের নির্দেশনা দেন ভারতীয় থিয়েটারের প্রখ্যাত নাট্যকার ও নির্দেশক ঊষা গাঙ্গুলী।
দেশের দক্ষিণের সুন্দরবনের জেলেদের জীবন কাহিনী নিয়ে শুরু হয় নাটকের প্রথম দৃশ্য। যেখানে তাদের জীবনে এই ‘জাল’ হয়ে ওঠে অবরুদ্ধ করে রাখার প্রতীক। আমরা যেমন একটি নিজস্ব গন্ডী থেকে বের হতে পারি না নানা প্রতিবন্ধকতায়। ঠিক তেমন নাটকে ফুটে উঠে জেলেদের ‘জাল’ই হলো একমাত্র তাদের অবরুদ্ধ করে রাখার মূর্তিমান প্রতীক। সুন্দরবনের সামাজিক, প্রাকৃতিক আর অর্থনৈতিক পশ্চাৎপদতার সাথে যুক্ত হয়েছে দারিদ্রতা আর অশিক্ষা। যা দিনের পর দিন গিলে নিচ্ছে তাদের যাপিত জীবনকে। যার প্রতিফলন হিসেবে নারী পাচারের বিষয়টি উঠে এসেছে এ নাটকে খুব সুন্দর ভাবে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে মানবপাচার বিশেষ করে নারী পাচারের বিষয়টি অনেক বেশি মূর্ত। ‘জাল’ নাটক হলো আমাদের পুরুষশাসিত সামাজিক ব্যবস্থায় নারীদের যুগ যুগ ধরে আটকে রাখার প্রতিচ্ছবি। প্রতিনিয়ত নিপীড়ন নির্যাতন তাদের মুক্তির আকাঙ্খাকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে এ নারী সমাজকে। প্রতিটি ক্ষেত্রে শত প্রতিবন্ধকতা উপস্থাপন করে নারী পায়ে পরিয়ে দিচ্ছে শিকল। আমাদের পুরুষশাসিত সমাজ নারীকে বন্দি করেছে সমাজের চার দেয়ালে। কিন্তু এভাবে তো চলতে পারে না, সময় পাল্টেছে। নারীরা এখন আর জালের মধ্যে অবরুদ্ধ থাকতে চায় না। শিক্ষার আলোয় আলোকিত হতে চায়। সেই শিক্ষার জায়গা থেকে জালকে ছিন্ন করার প্রয়াস হিসেবে এ নাটক ‘জাল’।
এই নাটক নিয়ে নির্দেশক ঊষা গাঙ্গুলী জানান, বহুদিন আগে বিটা’র সাথে ইয়াসমিন নাটকটি করেছিলাম। সে নাটকটি আমাকে বাংলা ভাষায় নাটক লেখার ক্ষেত্রে উদ্বুদ্ধ করেছিল। এবার চট্টগ্রাম এসে মৌলিক লেখনীর মাধ্যমে নাটক রচনা করতে অনেকটা বাধ্য হলাম। ভারত, বাংলাদেশ দু’দেশেই রয়েছে আমাদের সুন্দরবন। একই সামাজিক ব্যবস্থা, একই দারিদ্রতা, একই অশিক্ষা, একই কুসংস্কার, একই জল-হাওয়া, একই জঙ্গল আর বাঘ। এই সমস্ত সীমানা পেরিয়ে নাটক রচিত হলো জাল, যেখানে নারীদের প্রতি প্রতারণা, তাদের আর্তনাদ, তাদের সামাজিক পরিকাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ হওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। আর উঠে আসে জেলেদের জীবন, তাদের শৌর্য-বীর্য, দারিদ্রতা, তাদের শক্তি, সাহস আর সব শেষে সুন্দরভাবে জীবনকে উপভোগ করা।
রচনা এবং নির্দেশনায় ছাড়াও গীতরচনা, সঙ্গীত পরিকল্পনা ও কোরিওগ্রাফিতেও ছিলেন ভারতে উষা গাঙ্গুলী। কোরিওগ্রাফি প্রশিক্ষনে রুদ্র প্রসাদ রায় সহযোগীতা করে। ১৭ জন নাট্যশিল্পীর অভিনয় করেন এই নাটকে। নাটকের বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেন শুভ্রা বিশ্বাস, অশোক বড়ুয়া, প্রদীপ আচার্য্য, বাপ্পা চৌধুরী, দীপঙ্কর দে, সালাহউদ্দিন মাহমুদ, বাবলা দাশ, মোহাম্মদ ইব্রাহীম, মোর্শেদ আলম, শারমিন সুলতানা রাশা, ফারজানা আক্তার তাপসী, নুসরাত জাহান সাকী, মুসলিমা খাতুন লিমা, খাদিজাতুল কোবরা রিশিকা ও ফারজানা আক্তার।

x