জাতীয় পার্টি এখন নির্বাচনে ফ্যাক্টর, সবাই আমাদের চাইছে

চট্টগ্রামে মতবিনিময়ে এরশাদ

আজাদী প্রতিবেদন

বৃহস্পতিবার , ২৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ at ৫:৪৫ পূর্বাহ্ণ
221

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে হারিয়ে রংপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে জয় পেলেও (মেয়র পদে) জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ের ব্যাপারে সংশয়ে আছে ‘জাতীয় পার্টি’। এ সংশয় খোদ দলটির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের। তিনি বলেন, ‘৩০০টি আসনে আমাদের সরাসরি প্রার্থী আছে। কতজন প্রার্থী জয়ী হতে পারবে এ সর্ম্পকে আমি এখনও নিশ্চিত নই।’ গতকাল বিকেলে নগরীর ‘রেডিসন ব্লু বেভিউ’তে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন তিনি।

রংপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে জাতীয় পার্টি জয় লাভ করেছে। আগামী জাতীয় নির্বাচনে এই সাফল্য ধরে রাখা সম্ভব হবে কী না? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেন, ‘এ সম্পর্কে কথা বলা আমার উচিত হবে না। আওয়ামী লীগ আমাদের থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী দল। তবে আমরা সংগঠিত হচ্ছি। ৩০০টি আসনে আমাদের সরাসরি প্রার্থী আছে। কতজন প্রার্থী জয়ী হতে পারবে এ সম্পর্কে আমি এখনও নিশ্চিত নই। তবে কর্মীদের মধ্যে উৎসাহ সৃষ্টি হয়েছে। আমার মনে হয়, নির্বাচন যদি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়, আমরা নির্বাচনে ভালো করবো। ইনশাআল্লাহ।’

উল্লেখ্য, গত ২১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয়েছিল রংপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন। এতে জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা লাঙ্গল প্রতীকে ১ লাখ ৬০ হাজার ৪৮৯ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। এতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু নৌকা প্রতীকে পেয়েছিলেন ৬২ হাজার ৪০০ ভোট। ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপি প্রার্থী কাওসার জামান বাবলা পেয়েছিলেন ৩৫ হাজার ১৩৬ ভোট।

বিএনপি’র সঙ্গে নির্বাচনী জোট করা প্রসঙ্গে :

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে জাতীয় পার্টি কোন দলের সঙ্গে জোট বাধবে তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে রয়েছে কৌতুহল। জাতীয় পার্টির সঙ্গে জোট করার বিষয়টি বিএনপিও নাকচ করে নি এখন পর্যন্ত। একই সম্ভবনার আভাস পাওয়া গিয়েছিল জাতীয় পার্টির প েও। গত ৬ ডিসেম্বর জাতীয় পার্টির সঙ্গে ঐক্য প্রসঙ্গে বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, ‘পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসিতে কোনো সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।’ পরবর্তীতে গত ২৫ ডিসেম্বর পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় সাংবাদিকদের হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেছিলেন, ‘জাতীয় পার্টি এককভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিলেও তা চূড়ান্ত হয়নি। বিএনপির সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করছে সেই সিদ্ধান্ত।’

বিএনপি’র সঙ্গে নির্বাচনী জোট গড়া নিয়ে গতকাল আবারও বললেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তবে একদিন আগে পটুয়াখালীতে স্পষ্ট করে বললেও গতকালকের বক্তব্য ছিল কৌশলী। সাংবাদিকরা ‘মির্জা ফখরুলের বক্তব্য উল্লেখ করে বিএনপি’র সঙ্গে জোট গড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে এরশাদ বলেন, ‘মির্জা ফখরুল ইসলাম কী বলেছেন সেই সম্পর্কে আমার ধারণা নাই। আমাদের কথা হলো, আমরা এককভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণ করছি। আপাতত জোটে আমরা আছি। আগামীতে কি হবে, কিভাবে নির্বাচন হবে সে সম্পর্কে ভবিষ্যৎ বাণী করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’ এসময় সাবেক এই রাষ্ট্রপতি আরো বলেন, ‘ফখরুল ইসলাম যে কথাটা বললেন, তার মানে জাতীয় পার্টি নির্বাচনে একটা ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবাই চাচ্ছে আমাদের। আমরা কোথায় যাব, কিভাবে নির্বাচন করবো সেটা ডিপেন্ড (নির্ভর) করবে আমাদের উপর। কর্মীদের উপর, নেতাদের উপর। আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিব আগামী নির্বাচন কিভাবে করব। ’ এসময় তিনি আরো বলেন, আমার মনে হয় আগামী নির্বাচনে জাতীয় পার্টি অনেক ভাল করবে এবং জাতীয় জীবনে একটা মূল্যবান উপহার দেব।’

প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম সংসদ নির্বাচন এককভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে সংসদে বিরোধী দলের আসন নিলেও সরকারেও যোগ দেয় জাতীয় পার্টি। এরশাদ নিজে হন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। এর আগে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটে থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল জাতীয় পার্টি। ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করেছিল বিএনপি।

রংপুর নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে’ :

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে কি ভাবছেন? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেন, আমি রংপুর নির্বাচন করে আসলাম। নির্বাচনের আগে বলেছিলাম, নির্বাচন কমিশনের এটা পরীক্ষা। একটা সুষ্ঠু নির্বাচন তারা করতে পারেন কী না, একটা নিরপে নির্বাচন করতে পারেন কী না, তার প্রথম পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় নির্বাচন কমিশন উত্তীর্ণ হয়েছে। এসময় তিনি বলেন, রংপুর নির্বাচন একটা আদর্শ নির্বাচন হয়েছে। ওখানে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে, নিরপে নির্বাচন হয়েছে। আমার মনে হয়, এই প্রথমবারের মত বাংলাদেশে তারা একটা সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পেরেছে।

কর্মসংস্থান সৃষ্টির আহবান :

ব্যাংকে অলস টাকা পড়ে থাকা, কর্মসংস্থানের অভাব এবং বিদেশি বিনিয়োগ বিষয়ে এক সাংবাদিক জানতে চাইলে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেন, ‘তুমি রাজনৈতিক প্রশ্ন কর। ব্যাংক তো খালি হয়ে গেছে। সেসব আমি কিছু বলতে চাই না। এসময় তিনি আরো বলেন, আমাদের দেশে যুব সমাজের মধ্যে এত অসন্তোষ কেন? কারণ, তাদের কর্মসংস্থান নাই। বিদেশি বিনিয়োগ নাই। যার ফলে যুব সমাজ বিপথে চলে যাচ্ছে। অনেকে মাদকের আশ্রয় গ্রহণ করছে। এটা আমাদের জন্য ভাল খবর নয়। জাতির জন্য সম্মানজনক কথা নয়। দেশের জন্য এটা লজ্জাজনক কথা। তাই সরকারের প্রয়োজন এখন বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে আসা। নতুন নতুন কারখানা করা। শিল্পকারখানা গড়ে তোলা এবং শিক্ষিত যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। না হলে সমাজে যে একটা অশান্তি সৃষ্টি হয়েছে সেটা বৃদ্ধি পাবে। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপের শুরুতে জাতীয় পার্টির এই চেয়ারম্যান বলেন, চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে ১২০টিরও বেশি গাড়ি বহরে আমাকে সংবর্ধনা দেয়া হয়েছে। আমি কর্মীদের মধ্যে উৎসাহ উদ্দীপনা দেখেছি। এতে আমি অভিভূত হয়েছি, উৎফুল্ল হয়েছি, অনুপ্রাণিত হয়েছি। তিনি বলেন, প্রথমবারের মত আমার মনে হয়েছে জাতীয় পার্টি জেগে উঠেছে। প্রতিটি কর্মী জেগে উঠেছে। জাতীয় পার্টির কর্মীরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। আগামী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত হয়েছে। এটা আমার জন্য খুশির খবর। চট্টগ্রামের প্রতিটি কর্মীকে অভিনন্দন জানাচ্ছি।

এসময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় পার্টির প্রেসিডেয়াম সদস্য জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, সাবেক মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী, জাতীয় পার্টির নেতা সোলায়মান আলম শেঠ, মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহীম ও মেহজাবীন মোরশেদ এমপি প্রমুখ।

উল্লেখ্য, একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে একদিনের সফরে চট্টগ্রামে এসেছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। গতকাল দুপুর আড়াইটায় তিনি নভো এয়ারের একটি ফ্লাইটে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছেন। এসময় জাতীয় পার্টির নগর, উত্তর ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের নেতাকর্মীরা তাকে স্বাগত জানান। রাতে তিনি একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে যোগ দেন।

x