জলাশয় রক্ষায় প্রয়োজন রাজনৈতিক অঙ্গীকার

মঙ্গলবার , ২৫ জুন, ২০১৯ at ১০:৩২ পূর্বাহ্ণ

সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন সম্প্রতি এক সমাবেশে নগর সেবায় নিয়োজিত সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানের সাথে নগরবাসীর সম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। গত ২২শে জুন দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত সংবাদে মেয়রের বেশ কিছু বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে, যা অত্যন্ত তাৎপর্যবহ। তিনি সেখানে বলেছেন, এ নগর আমাদের, এখানে আমরা জন্মগ্রহণ করেছি। এ নগরকে গড়ে তোলার দায়িত্ব আমাদের সকলের। বিশ্বমানের একটি নগর গড়ার গুরু দায়িত্ব নগরবাসীর। তাই নগরের সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানের সকল কর্মকাণ্ডে নগরবাসীর সম্পৃক্ততা ছাড়া কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। তিনি আরো বলেন, জলাবদ্ধতা নগরবাসীর জন্য অভিশাপ। পূর্বেকার সময়ে নগরে জোয়ারের ও বৃষ্টির পানি ধারণ করার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ জলাশয়, ডোবা, খাল-বিল ও পুকুর ছিল। ফলে নগরীতে তখনকার সময়ে জলজট সৃষ্টি হত না। পরিকল্পিত একটি নগরে ১২ শতাংশ জলাশয় থাকা দরকার। বর্তমানে ১ শতাংশও জলাশয় নেই এই নগরে। মেয়র বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে পরিচ্ছন্ন শহরের বিকল্প নেই।
আসলে চট্টগ্রাম নগরে এখন প্রয়োজনীয় জলাশয় নেই। জলাশয়কে বাঁচানো যায় নি। এটিকে বাঁচানোর দায়িত্ব রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী এমপি, মেয়র ও সরকারি কর্মকর্তাদের। তাঁদের শুভ ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে জলাশয়সহ প্রাকৃতিক যাবতীয় সম্পদ রক্ষা। কিছুটা নির্ভর করে সমাজবদ্ধ মানুষদের ওপরও। পরিবেশ হচ্ছে সকল উন্নয়নের, সকল আর্থিক উন্নতির প্রথম শিকার। দ্রুত বড় হওয়া ও আর্থিক মুনাফার জন্য প্রায় প্রতিদিনই পরিবেশকে ধ্বংস করা হচ্ছে। সুসংহত উন্নয়ন এখন আলংকারিক শব্দ। জলাশয়গুলো হচ্ছে এইসব ধ্বংসাত্মক সক্রিয়তার অন্যতম শিকার।
নগর পরিকল্পনাবিদদের বিভিন্ন সময়ের আলোচনা, তাঁদের লেখা নিবন্ধ এবং সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ১৯১৭ সালে স্যার প্যাট্রিক গেডিস ঢাকা শহরের জন্য একটি প্ল্যান করেছিলেন। এরপর ১৯৫৯ সালে ঢাকা, ১৯৬১ সালে চট্টগ্রাম, ১৯৬৬ সালে খুলনা এবং ১৯৮৪ সালে রাজশাহী শহরের জন্য মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করা হয়। এই মাস্টারপ্ল্যান ছিল ২০ বছর মেয়াদি। এইসব মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী, বেশ কিছু অবকাঠামো, আবাসিক এলাকা, বাণিজ্যিক এলাকা তৈরি করা হয়। কিন্তু পুরো পরিকল্পনা কখনোই বাস্তবায়ন হয়নি।
প্রকৌশলী ধরিত্রী সরকার সবুজ তাঁর এক লেখায় লিখেছেন, দেশে জলাভূমি ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত নীতিমালার অভাব রয়েছে। সরকারের চারটি মন্ত্রণালয় দেশের জলাভূমি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করলেও তাদের নিজেদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। সমন্বয় ও জলাভূমি ব্যবহারের সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে প্রতিবছরই মারাত্মকভাবে ধ্বংস হচ্ছে জলাভূমি ও তার চারপাশের পরিবেশ। দেশের জলমহালগুলো রয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়ের আওতায়। বিভিন্ন প্রকল্প এলাকায় নদী ও খাল রয়েছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে। মৎস্যসম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্যে জলাভূমির একটা বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। আবার পরিবেশ অধিদপ্তর উপকূলীয় জলাভূমি ও হাওরগুলোতে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প পরিচালনা করছে। এসব মন্ত্রণালয়ের পারস্পরিক কাজের মধ্যে সমন্বয় খুবই দরকার।
দেশে জলাভূমি সংরক্ষণের জন্য সুনির্দিষ্ট আইন রয়েছে। কিন্তু তার সঠিক প্রয়োগের অভাবে প্রতিনিয়তই জলাভূমি ভরাট করে বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন তৈরি হতে দেখা যাচ্ছে। অনেক জলাভূমি পরিবর্তন করে বাঁধ দিয়ে কৃষিজমিতে রূপান্তর করা হচ্ছে। অনেক প্রকল্পই এমনভাবে নেওয়া হচ্ছে, যা বাস্তবায়নের পর পাশের জলাভূমি এমনিতেই শুকিয়ে যাচ্ছে। এখন আমাদের উচিত হবে জরুরি ভিত্তিতে জলাভূমি সংরক্ষণ আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা। কোনো উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়ার আগে সেটি যাতে কোনোভাবে কোনো জলাভূমির ক্ষতি না করে তা নিশ্চিত হওয়া দরকার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, জলাশয় সংরক্ষণ আইনসহ প্রায় দুইশত আইন থাকলেও কোনো একক সংস্থার কাছে বাস্তবায়নের ক্ষমতায় না থাকায় জলাশয় দূষণ ও দখল প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইনের বাস্তবায়ন শিথিলভাবে হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে কোনো বাস্তবায়নই হচ্ছে না। এছাড়া দখল ও দূষণকারীদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণেও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়শ আইন বাস্তবায়নে বাধার সম্মুখীন হয়। তাই সারাদেশের পুকুর, লেক, খাল, নদী, জলাশয় রক্ষায় রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও একটি পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নে স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান করা দরকার।

x