জলাবদ্ধতা : সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ

মঙ্গলবার , ৯ এপ্রিল, ২০১৯ at ৬:৩২ পূর্বাহ্ণ
54

চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে সরকারের পক্ষ থেকে প্রচেষ্টার কোনো কমতি নেই। বহুমুখী পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে সরকার। একের পর এক প্রকল্প গ্রহণ করে চট্টগ্রামবাসীকে জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্তি দেওয়ার প্রয়াস আমরা প্রত্যক্ষ করছি অবিরাম। চাক্তাই হতে কালুরঘাট রিং রোড প্রকল্পগুলোও নগরীকে অস্বাভাবিক জোয়ার, জলোচ্ছ্বাস ও জলাবদ্ধতা নিরসনে সরাসরি ভূমিকা রাখার জন্যই নেওয়া।
কিন্তু গত শনিবার চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা : আমাদের করণীয়’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় বক্তারা জলাবদ্ধতা সমস্যা নিরসনে সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁরা বলেন, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার জন্য এককভাবে কোনো সংস্থা দায়ী নয়। বরং সংশ্লিষ্ট সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যকার সমন্বয়হীনতাই দায়ী। তাই জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএ, ওয়াসা, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বন্দর এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মধ্যে সমন্বয় থাকা অপরিহার্য। একই সঙ্গে জলাবদ্ধতা নিরসনে দখল হয়ে যাওয়া শহরের ৫৭টি খাল উদ্ধার এবং ৫০ থেকে ১০০ বছর মেয়াদী প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে।
চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ও অর্থনৈতিক গুরুত্বসম্পন্ন বাণিজ্য নগরী। কিন্তু এই নগরীর অনেক সমস্যা। জলাবদ্ধতা তার মধ্যে একটি। সামান্য বৃষ্টিতেই নগরীর বহু এলাকা তলিয়ে যায় পানির নীচে। পানি কোথাও হাঁটুপরিমাণ, কোথাও কোমর পর্যন্ত। জলাবদ্ধতায় স্থবির হয়ে পড়ে নগরের জীবন যাত্রা। বৃষ্টি না থাকলেও জোয়ারের পানিতে সকাল-সন্ধ্যা ডুবে যাচ্ছে শহরের দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকা। জোয়ারের পানির সাথে নিত্য ব্যবহার্য পানি মিশে গিয়ে শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমে বিশেষ করে হালিশহর ও আগ্রাবাদ এলাকার জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী আকার ধারণ করছে। বলা যায়, প্রায় সব খালেরই তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। হাতে গোনা রিটেইনিং ওয়াল দেয়া কয়েকটি ছাড়া অধিকাংশ কাঁচা খালের দুই পাশে অবৈধ দখলের কারণে দ্রুত জমে থাকা পানি নিষ্কাশিত হতে পারছেনা। জলাবদ্ধতার কারণে শহরের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো হচ্ছে প্রবর্তক মোড়, ষোলশহর, বাকলিয়া, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, জিইসি মোড়, চকবাজার, কাপাসগোলা, বাদুরতলা, চান্দগাঁও, পাঁচলাইশ, নাসিরাবাদ, আগ্রাবাদ, পতেঙ্গা, হালিশহর, ইত্যাদি। এছাড়া প্রতিবছরই শহরের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, যদি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা না হয়, তাহলে এর আশানুরূপ সুফল পাবে না নগরবাসী। তাই জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রয়োজন ৫০ থেকে ১০০ বছর মেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা। অন্যথায় জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে, কিন্তু এর সুফল জনগণ পাবে না। তাঁরা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত কর্ণফুলীর নাব্যতা বৃদ্ধির জন্য ড্রেজিং করতে হবে। ওয়াসার যেমন পয়ঃবর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা নেই, তেমনি সিটি কর্পোরেশনের পর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নেই। ফলে এখনো পর্যন্ত ৩০ শতাংশ বর্জ্য নালা ও ড্রেনে ফেলা হয়। একই সঙ্গে জরুরি হলো, নগরে ভূমি ব্যবহারের নীতিমালা থাকা। কারণ পরিকল্পিত নগরায়নে কোথায় সড়ক হবে, কোথায় ভবন হবে, কোথায় ড্রেন-নালা হবে-এসব নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন জরুরি।
‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা : আমাদের করণীয়’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে অধ্যাপক মনজুরুল কিবরীয়া বলেন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চলমান মেগা প্রকল্পের অধীনে নগরের ৫৭টি খালের পূর্ববর্তী অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেছি। পর্যবেক্ষণের সময় আমরা ১৫টি খাল থেকে পানির নমুনা সংগ্রহ করি। তাছাড়া পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, নদীর হেলথ বলতে যা বোঝায় অনেক ক্ষেত্রে তা নেই। নগরের আজব পাহাড় নামের খালে আবর্জনার কারণে নামার কোনো সুযোগই পাইনি। ফলে এ খাল থেকে পানির নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। অভিন্ন অবস্থা নগরের হিজরা খাল, বির্জা খাল ও মির্জা খালের। পক্ষান্তরে চাক্তাই খাল, রাজা খাল, নোয়া খাল, ডোম খাল ও খন্দখিয়া খালের পানি অধিক পরিমাণে দূষিত।
তাই বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জলাবদ্ধতা সমস্যার মূলে রয়েছে নাগরিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার অভাব। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ কিংবা বিদেশী কনসাল্ট্যান্ট, কারো কাছেই এমন কোনো জাদুকরী শক্তি নেই যে চাইলেই পরদিন জলাবদ্ধতা দূর করে দেবেন। তাই প্রযুক্তিগত সমাধানের পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে একজন সুনাগরিকের দায়িত্ব পালন করার জন্য জনগণকে সচেতন এবং উদ্বুুদ্ধ করতে হবে। মহল্লার সর্দার, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ, সামাজিক সংগঠনগুলো এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে পারে। নালা-নর্দমা ও খালে যাতে কেউ আবর্জনা ফেলতে না পারে সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতেই হবে। জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলের কার্যালয়গুলোকে সক্রিয় ও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাশাপশি সাধারণ নাগরিককেও ভাবতে হবে।

x