জলাবদ্ধতাই নিত্যসঙ্গী রয়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকিও

নালায় ওয়াসার পাইপলাইনের জট, বিপর্যস্ত পরিবেশ

ইকবাল হোসেন

শুক্রবার , ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ at ৫:০৮ পূর্বাহ্ণ
83

নগরীর ৩৯নং দক্ষিণ হালিশহর ওয়ার্ডের আকমল আলী সড়ক এলাকার বাসিন্দা রাজা, দূর্জয়, অশোক। তিন জনের বয়স ১২-১৩ বছর, পড়ে স্থানীয় হাইস্কুলে। জনবহুল এলাকাটিতে খেলাধুলার তেমন একটি জায়গা নেই। স্কুল ছুটির পর বাসার ছাদে কিংবা কাছের রিং রোড এলাকাকে বেছে নেয় খেলাধুলার জন্য। দুরন্ত এই তিন শিশু নির্ভার হাঁটছেন রাস্তার পাশের ছোট্ট ড্রেনের উপর। ড্রেনটি ওই এলাকার হাজারো বসতির পানি নিকাশের একমাত্র মাধ্যম। আকমাল আলী রোডের আশপাশের ভবনগুলোর পানি ওই ড্রেনের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়। প্লাস্টিক বর্জ্যের উপর আগাছা জমে ড্রেনটির উপরের অংশে শক্ত আবরণ তৈরি করেছে। যেখানে ছোট্ট শিশুরা নির্দ্বিধায় ছুটোছুটি করছে। অথচ ড্রেনটির তলা দিয়েই পানি প্রবাহিত হচ্ছে। তবে বর্ষাখালে ওই ড্রেন দিয়ে পানি নিকাশ হওয়ার জো নেই। ভরাট আবর্জনায় নিকাশ বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতা তৈরি করে ওই এলাকায়। ড্রেনের নোংরা পানিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে ওই এলাকার পরিবেশ। লোকজনের অভিযোগ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা তেমন একটা খেয়াল রাখেন না ওই এলাকার। আবার স্থানীয় প্রভাবশালীরা আইন-কানুন তোয়াক্কা না করেই ওই খালের মধ্যে প্লাস্টিক পাইপ দিয়ে ওয়াসার পানির সংযোগ নিয়েছেন। আর এসব পাইপেই সর্বনাশ ডেকেছে পুরো এলাকার। যে কারণে জলাবদ্ধতা নিত্যসঙ্গী হয়েছে ওয়ার্ডটির জন্যে।
সরেজমিন দেখা যায়, নগরীর বিমানবন্দর সড়কের সিমেন্ট ক্রসিং সংলগ্ন নৌবাহিনীর ঈসা খাঁ গেইটের বিপরীতে অবস্থান আকমল আলী রোডের। বিমানবন্দর সড়ক থেকে পতেঙ্গা রিং রোডের বেড়িবাঁধ পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার সড়কের পাশেই ড্রেনটির অবস্থান। আবার আকমল আলী রোডের রেললাইন চার রাস্তার মাথা থেকে কাজিরগলি পর্যন্ত রয়েছে আরেকটি ড্রেন। আকমল আলী রোডের ড্রেনটি উম্মুক্ত থাকলেও অবৈধ স্থাপনা তৈরি হয়েছে কাজিরগলির ড্রেনের উপর। দুই দিকের ড্রেনে প্লাস্টিকের অসংখ্য পাইপ এলোপাতাড়িভাবে চলে গেছে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানালেন আকমল আলী রোডের মতোই একই চিত্র পুরো ওয়ার্ডের। ওয়ার্ডের অলিগলির নালার মধ্য দিয়ে নিয়ে যাওয়া পাইপের কারণে পানি নিকাশ রুদ্ধ হয়ে জলাবদ্ধতা স্থায়ী সমস্যায় রূপ নিয়েছে ওয়ার্ডটিতে। শুধু জলাবদ্ধতা নয়, ওয়ার্ডটিতে নেই কোন সরকারি হাসপাতাল। চিকিৎসার জন্য প্রাইভেট ক্লিনিক কিংবা ১২ কিলোমিটার দূরের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালই ভরসা ওয়ার্ডের কয়েক লাখ বাসিন্দার। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে ওই ওয়ার্ডের প্রায় ৫ লাখ বাসিন্দা। পানীয় জলের সংকটও রয়েছে ওয়ার্ডটিতে। রয়েছে অবৈধ দখল, যানজট, পরিবহন সংকটসহ নানা সমস্যা। চাঁদাবাজিতেও অতিষ্ট এলাকার বাসিন্দা থেকে শুরু করে ব্যবসায়ীরা। বিশেষত সিইপিজেড এলাকার শিল্প মালিক ব্যবসায়ীরা চাঁদাবাজিতে অতিষ্ট। পরিত্যক্ত জুট কাপড়ের ব্যবসাও নিয়ন্ত্রণ করেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে দলীয় ক্যাডাররা।
এসব সমস্যা মাথায় নিয়ে আগামী চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে কাউন্সিলর পদের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে বর্তমান কাউন্সিলর ওয়ার্ড যুবলীগ সভাপতি জিয়াউল হক সুমন, সাবেক কাউন্সিলর ও ইপিজেড থানা আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক হাজী মো. আসলাম, আওয়ামী লীগ নেতা সেলিম আফজল, ইপিজেড থানা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক কাউন্সিলর সরফরাজ কাদের রাসেল, ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রোকন উদ্দীন মাহমুদ ও সংরক্ষিত ওয়ার্ডে ৩৯নং ওয়ার্ড মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শারমিন ফারুক সুলতানা মনোনয়ন দৌঁড়ে রয়েছেন। বিএনপি নেতা সরফরাজ কাদের রাসেল বর্তমানে নাশকতার মামলায় কারাগারে আছেন।
স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর জিয়াউল হক সুমন দৈনিক আজাদীকে বলেন, আমার দক্ষিণ হালিশহর ওয়ার্ডের মূল সমস্যা জলাবদ্ধতা। ওয়ার্ডের মাইট্টাল্যা খালটি দিয়ে নৌবাহিনী, আকমল আলী রোড, তালতলা, হক সাহেবের গলি, এস আলম গলির পানি যায়। ওই খালটি সিডিএ’র প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে। ইতোমধ্যে খনন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এটি খনন করা হলে জলাবদ্ধতা কেটে যাবে। তাছাড়া সিমেন্ট ক্রসিং থেকে আকমল আলী রোড পর্যন্ত রেল লাইন দিয়ে সড়ক তৈরি করা হচ্ছে। এতে মূল সমস্যাগুলো আর থাকবে না।’ তিনি বলেন, ২০১৫ সালের নির্বাচনে আমি কোন ভোট কেড়ে নিইনি। জনগণ আমাকে প্রায় ২৫ হাজার ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছেন। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে দীর্ঘ পাঁচ বছর আমি ওয়ার্ডের উন্নয়নে কাজ করেছি। আশা করছি সামনের নির্বাচনেও আমি দলীয় মনোনয়ন পাবো।’
মনোনয়ন প্রত্যাশী আওয়ামী লীগ নেতা হাজী মো. আসলাম বলেন, ‘২০০০ ও ২০০৫ সালে আমি বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলাম। ২০১০ সালে ১৮শ ভোটে হেরেছিলাম। ২০১৫ সালে সুমন যদি কেন্দ্র দখল করে ভোট কেড়ে না নিত আমিই জয়ী হতাম। এবারের নির্বাচনে আমি নির্বাচিত হলে প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা যেভাবে সিটি কর্পোরেশন চালিয়েছিলেন আমিও সেভাবে ৩৯নং দক্ষিণ হালিশহর ওয়ার্ডকে পরিচালিত করতে চাই।’
ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রোকন উদ্দীন মাহমুদ দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘৩৯নং ওয়ার্ডটি অনেক ঘনবসতিপূর্ণ। দেশের অনেক সংসদীয় আসনের চেয়ে আরো বেশি ভোট রয়েছে দক্ষিণ হালিশহর ওয়ার্ডটিতে। বিগত ১০ বছরে যেভাবে উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে, ওভাবে হয়নি। এখনো জলাবদ্ধতা কাটেনি। বাইলেন সড়কগুলোর অবস্থাও নাজুক।’ তিনি বলেন, ‘আমি বিএনপির সমর্থন নিয়ে নির্বাচিত হয়ে এলাকার উন্নয়নে অংশ নিতে ইচ্ছুক।’