জমিদার ভৈরব পালের বিশাল ভবনটি এখন ভূতুড়ে বাড়ি

মীর আসলাম : রাউজান

সোমবার , ২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ১১:১৬ পূর্বাহ্ণ
273

রাউজান উপজেলার পশ্চিম ডাবুয়া এলাকার ব্রিটিশ আমলের এক প্রভাবশালী জমিদার বাড়ির বিশাল পাকা ভবন এখন ঝোঁপ জঙ্গলের ভিতর ভূতুড়ে বাড়িতে পরিণত হয়ে আছে। ব্রিটিশ-পাকিস্তান-আমল থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের এই সময়কাল পর্যন্ত দশকের পর দশক পরিত্যক্ত হয়ে থাকা এই বাড়িটি জমিদার ভৈরব চন্দ্র পাল সওদাগরের বাড়ি হিসাবে পরিচিত।
সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা যায়, ঝোঁপ ঝাড়ে ঢাকা এই বিশাল বাড়ির আশেপাশে এখন গড়ে উঠেছে ঝুপড়ি ঘর। এখানে যারা বসবাস করছে তারা সকলেই সনাতন ধর্মাবলম্বী নিম্ন আয়ের লোকজন। বাড়ির সামনে আছে বিশাল দিঘির রাজকীয় ঘাট। পার্শ্বে রয়েছে এই যুগে সংস্কার করা একটি শিব মন্দির। দিঘির পাড়ের দক্ষিণাংশে ১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টির নাম মধ্যম সর্তা রাম সেবক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ লোকমান জানিয়েছেন বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জমিদার পরিবারের সদস্য রাম সেবক পাল। আগেকার দিনে এই জমিদার বাড়িকে ঘিরে বসত মেলা। জমিদার বাড়ির অদূরে উপজেলার চিকদাইর ইউনিয়ন পরিষদ। ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রিয়োতোষ চৌধুরীর সাথে কথা বলে জানা যায় জমিদার ভৈরব পাল ছিলেন ব্রিটিশ যুগের প্রভাবশালী একজন ব্যবসায়ী ও জমিদার। তিনি ছিলেন মূলত সে যুগের বার্মার একজন বড় ব্যবসায়ী। রাউজানের এই ব্যবসায়ীর রয়েছে শতাধিক একরের বিশাল সম্পত্তি। ওই পরিবারের বেশির ভাগ সদস্য বহু আগে ভারতে চলে গেছে। তারা এখন সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা। বংশধরদের মধ্যে দুএকজন যারা এদেশে রয়েছে, তারা ভৈরব সওদাগরের সম্পত্তি বিভিন্ন ভাবে বিক্রি করে দিয়েছেন। পরিদর্শনকালে দেখা যায়, জমিদার বাড়ির সামনের বিশাল দিঘির পূর্বপাড় জুড়ে রয়েছে পাঁচ হাজার মুরগির একটি খামার। রাম সেবক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ মোরশেদ অভিযোগ করেছেন মুরগির খামারের দুষিত বর্জ্যের দুর্গন্ধে স্কুল পর্যন্ত ছড়াচ্ছে। স্থানীয়রা জানায় এই খামারটির মালিক চিকদাইর ইউনিয়নের বাসিন্দা প্রবাসী ইয়াছিন চৌধুরী সিআইপি। এই খামারের ম্যানেজার জানে আলমের সাথে কথা বলে জানা যায় ভৈরব দিঘিসহ জমিদার বাড়ির আশেপাশের বিশাল সম্পত্তি কিনে নিয়েছেন খামারের প্রতিষ্ঠাতা প্রবাসী ইয়াছিন চৌধুরী সিআইপি। দুর্গন্ধে পরিবেশ দুষণের বিষয়ে কথা বললে তিনি দাবি করেন তার খামারের বর্জ্য নিরাপদ জায়গায় ফেলা হচ্ছে। দুর্গন্ধ ছড়ানোর অভিযোগ সত্য নয়।
তবে এলাকার অপর একটি সূত্র থেকে জানা যায়, ভৈরব সওদাগরের অধিকাংশ সম্পত্তি উইল করা ছিল দিঘির সাথে থাকা শিব মন্দিরের নামে। সূত্র মতে ওই সম্পত্তি আগে দেবত্ব সম্পত্তি হিসাবে বিবেচিত ছিল। আইন অনুযায়ী দেবত্ব সম্পত্তি বিক্রি করা যায় না। সূত্র মতে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে ভৈরব সওদাগরের এই সম্পত্তির উপর চড়ে বসেছিল যুদ্ধাপরাধ মামলার রায়ে ফাঁসীতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর এক সমর্থক। তিনি বছরের পর বছর কয়েকজন সহযোগিকে নিয়ে ভৈরব সওদাগরের বিশাল সম্পত্তির ভোগ দখল করে আসছিলেন। প্রায় এক দশক আগে স্থানীয় অপর একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী ভৈরব সওদাগরের এদেশে থাকা কতিপয় বংশধরকে খুঁজে নিয়ে তাদের কাছ থেকে দিঘিসহ আশেপাশের বিশাল সম্পত্তি দলিল করে কিনে নেয়। এরপর আগে থেকে জবরদখল করে রাখা দখলদারকে তারা উচ্ছেদ করেন। পরে তারা ওই সম্পত্তি এলাকার প্রবাসী ইয়াছিন চৌধুরীর কাছে বিক্রি করেছেন। বর্তমান দখলদার ইয়াছিন চৌধুরী প্রবাস থেকে ফোনে এই প্রতিবেদকের কাছে দাবি করেন তার সম্পত্তি দেবত্ব নয়। কাগজপত্র যাচাই বাছাই করে তিনি ভৈরব সওদাগরের সম্পত্তি কিনে নিয়েছেন। মুরগির খামারের দুর্গগ্ধ ছাড়ানোর অভিযোগও তিনি অস্বীকার করে বলেন এটি মিথ্যা কথা। প্রতিদিন বিশেষ ব্যবস্থায় খামারের বর্জ্য অপসারণ করা হয় নিরাপদ স্থানে।
জমিদার বাড়ির প্রতিবেশি প্রবীণ স্কুল শিক্ষক দুলাল কান্তি পালের সাথে কথা বলে জানা যায়, জমিদার ভৈরব চন্দ্র পালের রয়েছে অপর দুই ভাই। তারা হচ্ছেন কৈলাশ পাল ও রাম সেবক পাল।
কৈলাশ পালের বংশধরগণ পার্শ্ববর্তী এলাকার একটি বিশাল বাড়িতে বসবাস করে আসলেও অপর দুই ভাইয়ের মধ্যে রামসেবক পালের বংশধরগণ বহু আগেই ভারতে চলে গেছে। তবে ভৈরব চন্দ্র পালের একমাত্র পুত্র শরৎ চন্দ্র পালের বংশধরগণের মধ্যে এখন ত্রিদীপ পাল, তুষার পাল, কন্যা কুমকুম পাল এদেশে বসবাস করার কথা জানা গেলেও তারা কোথায় থাকেন সেই তথ্য কেউ দিতে পারেনি।

x