জবাবদিহিতা নিশ্চিত ও তদারকি জোরদার করুক সংশ্লিষ্ট দপ্তর

নিম্নমানের বীজে প্রতারিত কৃষক

শুক্রবার , ৮ নভেম্বর, ২০১৯ at ৮:১২ পূর্বাহ্ণ
29

ধানের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় ভুট্টা চাষে ঝুঁকছেন চুয়াডাঙ্গার চাষিরা। ফলে ভুট্টা বীজের চাহিদা বাড়ছে হু হু করে। সেই সুযোগে নিম্নমানের বীজ বাজারজাত করছেন কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। এরই মধ্যে পেট্রোকেম নামে একটি প্রতিষ্ঠানের বীজ বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, কোম্পানিটির বীজ বিক্রি বন্ধ হয় নি। সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পেট্রোকেম কোম্পানির ডিলাররা পাইওনিয়ার পি৩৫৫ ব্র্যান্ড নামে নিম্নমানের ভুট্টা বীজ বাজারজাত করছেন। এসব বীজের অঙ্কুরোদগমের হার কম এবং পোকায় খাওয়া; এমন অভিযোগ জানিয়েছেন একাধিক কৃষক। চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানিয়েছে, সারা দেশে ভুট্টা বীজ বিপণনের কয়েকটি সিন্ডিকেট রয়েছে। তারা কৃষকদের কাছ থেকে সাধারণ ভুট্টা কিনে পরে প্যাকেট করে বীজ ভুট্টা নামে বাজারজাত করে। উচ্চ ফলনশীল ভুট্টার বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ সম্পর্কে কৃষকদের অজ্ঞতার সুযোগে এসব সিন্ডিকেট ব্যবসা করছে। অনেক সময় তারা মেয়াদোত্তীর্ণ ও পোকা ধরা বীজ গ্রামাঞ্চলের কৃষকদের হাতে গছিয়ে দেয়। পত্রিকান্তরে অতি সম্প্রতি এ খবর প্রকাশিত হয়।
আমাদের দেশে কৃষক প্রতারিত হয় ধাপে ধাপে। জমি কর্ষণ থেকে ফসল উৎপাদন, যার প্রতিটি ধাপই যেন কৃষক প্রতারণার একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সারে ভেজাল, বীজে ভেজাল। আবার বাজারে গেলে মধ্য স্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, অর্থাৎ মূল্যেও ভেজাল। সম্প্রতি সব ভেজালের ভিড় ঠেলে যে বিষয়টি সবার দৃষ্টি কাড়ছে, সেটি হলো ভেজাল বীজে বাজার হলো সয়লাব। নামি কোম্পানির আকর্ষণীয় প্যাকেটে ভেজাল বীজ ভরে চটকদার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে কৃষকদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে গুণে-মানে নিম্ন মানসম্পন্ন বীজ। আবার বীজের মাঝে ইট-পাথরের ভেজাল। ভেজালের ভিড়ে ভালো মানের বীজ শনাক্তকরণও দুঃসাধ্য। আর ভালো বীজ পেতে এখন অধিকাংশ কৃষক বিএডিসিকে নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে বেছে নেন, বিএডিসি বীজ বিক্রি করে থাকে লাইসেন্সধারী ডিলারদের মাধ্যমে। আর বীজের মান নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত প্রশ্নের সমাধান দিয়ে থাকে বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি ও বিএডিসির বীজ বিপণন বিভাগ। নিম্নমানের বীজের জন্য তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয়েছে বলে খবর মেলে না। বাজারে ভেজাল বা নিম্নমানের বীজ ও সার সরবরাহ করা হলে মনিটরিং কমিটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে অভিযুক্তকে জেল-জরিমানা করতে পারে। তবে গত এক বছরে সার, বীজ মনিটরিং কমিটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে শাস্তি দিয়েছে এমনটি জানা যায় নি সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে। আবার সাধারণ বীজ প্যাকেটজাত করে তার গায়ে নকল ভিত্তি বা প্রত্যায়িত বীজের ট্যাগ লাগিয়েও কৃষককে প্রতারিত করা হচ্ছে। এগুলো বন্ধ করতে হবে। আমরা যে খাদ্য ও সবজি উৎপাদনে সাফল্য অর্জন করেছি, তার নেপথ্যে মানসম্মত বীজের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা ব্যাখ্যা নিষ্প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, একদিকে জনসংখ্যা বাড়ছে আর অন্যদিকে নগরায়ণ ও শিল্পায়নসহ নানা কারণে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ কমছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লবণাক্ততাসহ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব। স্বভাবত বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এতসব প্রতিকূলতার পাহাড় ঠেলে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে উন্নতমানের বীজের ব্যাপারে বিন্দুমাত্র শৈথিল্য প্রদর্শনের সুযোগ নেই। পরম্পরাগত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে ঐতিহ্যগতভাবে আমাদের কৃষকই নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী বীজ সংরক্ষণ করতেন। কিন্তু সে বাস্তবতা বদলেছে বহুলাংশে। বীজের চাহিদাই শুধু বাড়েনি, সে সঙ্গে সামনে আসছে বাস্তবতার নিত্য নতুন চাহিদাও। তার মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই সর্বাধিক গুরুত্ব পাচ্ছে উচ্চ ফলনশীলতা ও বিরূপ পরিবেশ সহিষ্ণুতার বিষয়টি। নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন করে আমাদের কৃষি বিজ্ঞানীরা এক্ষেত্রে চমকপ্রদ সাফল্যও দেখিয়েছেন। তা সত্ত্বেও বাস্তবতা হলো, চাহিদার অতি অল্প অংশই নিশ্চিত করতে পারে বিএডিসি। ভালো বীজের চাহিদা বা সংকট বছরের পর বছর থেকে যায়। কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে বীজ ব্যবসার জন্য ৩২ হাজার বীজ ডিলারকে নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। প্রায় ৯০ হাজার চুক্তিবদ্ধ চাষির মাধ্যমে সারা দেশে সরকারি ও বেসরকারি খাতে বীজ উৎপাদন করা হচ্ছে। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের চাষিদের হাতের নাগালে এখন উন্নত জাত ও মানের বীজ পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশেও হাজার হাজার টন বীজ ব্যবহার হচ্ছে, অনেক বড় দেশি ও বহুজাতিক কোম্পানি বীজ ব্যবসা করছে। বীজ ব্যবসার সফলতার মূল ভিত্তি বীজ প্রযুক্তির সফল বাস্তবায়ন। দরকার কৃষক রক্ষার যথাযথ নীতিমালা প্রণয়ন। ভেজাল ও নিম্নমানের বীজ বিক্রেতারা জাতির শত্রু। এসব বন্ধে সরকারের সার্বক্ষণিক তদারকি দরকার। ফসলের ক্ষতি হলে কৃষক যেন শস্যবীমার সুযোগ পান সে উদ্যোগ নেওয়াও জরুরি। দেশের মোট বীজ চাহিদার ২২ শতাংশ সরবরাহ করে বেসরকারি বীজ কোম্পানিগুলো। এক্ষেত্রে সরকারের বিশেষ দৃষ্টি দরকার। বীজ যদি নষ্ট হয় তাহলে উৎপাদন ব্যাহত হবেই। আর উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার অর্থ জাতীয় ক্ষতি আরো বেড়ে যাওয়া। কোনভাবেই এ ব্যাপারে উদাসীনতা ও কালক্ষেপণ কাম্য নয়। তাছাড়া নষ্ট বীজ আমদানিকারক ও বাজারজাতকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া একান্ত প্রয়োজন।
সার, বীজ ও কীটনাশক এ তিনটি ভেজাল মুক্ত করতে না পারলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হবেই। কৃষি প্রধান দেশে চাষাবাদ ঝুঁকিমুক্ত করতে না পারলে স্বনির্ভরতা অর্জন অসম্ভব। বীজ ও কীটনাশক ভেজাল মুক্ত করা খুবই জরুরি। দেশের কৃষি বিভাগকেই এ বিষয়টি দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কিছু ব্যক্তি নিযুক্ত থাকলেও দায়িত্ব পালনে যে শতভাগ স্বচ্ছতার যে অভাব রয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। আমরা চাই, শতভাগ মানসম্পন্ন বীজ নিশ্চিত করতে যথাযথ উদ্যোগ নিক সংশ্লিষ্ট দপ্তর।

x