জন্মভূমিতে লম্বা ফরমেটের বিশ্বকাপ

নজরুল ইসলাম

বৃহস্পতিবার , ৩০ মে, ২০১৯ at ১০:৫৫ পূর্বাহ্ণ

আবার জন্ম ভূমিতে বিশ্বকাপ। ১৮৭৭ সালে ক্রিকেট খেলা আন্তর্জাতিক রূপ লাভ করে। তবে সেটি ছিল টেস্ট ক্রিকেট। ক্রিকেটের দুই অভিজাত সদস্য ইংল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়া অংশ নিয়েছিল এই টেস্ট ম্যাচে। এরপর ১৯৭২ সালে সীমিত ওভারের ক্রিকেটের আবির্ভাব ঘটে। তাও ইংল্যান্ডে। এখানেও প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়া। আবির্ভাবের তিন বছরের মাথায় বিশ্বকাপে রূপ নেয় ওয়ানডে ক্রিকেট। ১৯৭৫ সালে ইংল্যান্ডে প্রথমবারের মত আয়োজিত হয় বিশ্বকাপ ক্রিকেটের প্রথম আসর। এরপর একে একে ১২টি আসরে পা রেখেছে নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওা ক্রিকেট বিশ্বকাপ। ঠিক ২০ বছর পর আবার জন্মভূমিতে ফিরেছে বিশ্বকাপ। আর এটি তাদের পঞ্চম আয়োজন। প্রথম তিন আসরের পর ১৯৯৯ সালে সব শেষ আয়োজনটি হয়েছিল ইংল্যান্ডে। তার ২০ বছর পর আবার বিলেতের মাটিতে বিশ্বকাপ ক্রিকেট।
পাশাপাশি এবারের বিশ্বকাপ ফিরে গেছে ২৭ বছর আগে। প্রশ্ন জাগতে পারে ২৭ বছরের আগের সাথে এবারের বিশ্বকাপের সম্পর্কটা কি। অব্‌শ্যই আছে। আর সেটি হচ্ছে ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপের পর এবারই প্রথম সে ফরমেটে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিশ্বকাপ ক্রিকেট। ১৯৯২ সালে অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে প্রতিটি দল একে অপরের বিপক্ষে খেলেছিল। যাকে বলা হয় সরাসরি লিগ ভিত্তিক আয়োজন। এরপর শীর্ষ চারটি দল খেলেছিল সেমিফাইনালে। ২৭ বছর পর এবারে আবার সে ফরমেটে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিশ্বকাপ ক্রিকেট। ফলে সেদি থেকেও সেই পুরানো যুগে ফিরে গেছে ক্রিকেট বিশ্বকাপ। সব মিলিয়ে নতুন এক ফরমেটে পুরানো ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছেঁ এবারের বিশ্বকাপ। যার পর্দা উঠবে আজ।
১৯৯২ সালের বিশ্বকাপে এসেছিল অনেক পরিবর্তন। সে আসরেই প্রথম রঙিন পোশাকে ক্রিকেট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সে সাথে সাদা বল এবং দিবা-রাত্রির ম্যাচ ছিল সে আসরে। এর আগে ফ্লাস লাইটের আলোয় কোন ক্রিকেট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়নি। আর সে আসরেই প্রথম দশটি দল অংশ নিয়েছিল। সে আসরেই প্রথম বৃষ্টি আইনের প্রচলন হয়েছিল। সব মিলিয়ে ১৯৯২ সালের বিশ্ব্‌কাপ আসরটি ছিল স্মরণীয়। আবার সে আসরে ফিরে যাচ্ছে এবারের বিশ্বকাপ আসর। এবারের বিশ্বকাপে আরেকটি নতুন ঘটনা ঘটেছে। আর তা হচ্ছে বিশ্বকাপের্‌ প্রথম দুই আসরের চ্যাম্পিয়ন এবং টানা তৃতীয় আসরের ফাইনালিস্ট ওয়েস্ট ইন্ডিজকে খেলতে হয়েছে বাছাই পর্বে। যা তাদের জন্য প্রথম ঘটনা। পাশাপাশি বিশ্বকাপের নিয়মিত অতিথি জিম্বাবুয়ে নেই এবারের আসরে। বলা হচ্ছে সেরা দশটি দলই অংশ নিচ্ছে এবারের বিশ্বকাপের আসরে।
বলা হচ্ছে এবারের বিশ্বকাপটা সবচাইতে একেবারে ওপেন একটি টুর্নামেন্ট। এখানে পরিষ্কার ফেভারিট বলতে কেউই নেই। যদিও স্বাগতিক ইংল্যান্ডকে এগিয়ে রাখছে সবাই। তার পরে রাখা হচ্ছে ভারতকে। তারপরও যেহেতু টুর্নামেন্টটি একেবারেই সরাসরি। একে অপরের সাথে খেলবে দশটি দল তাই এই লম্বা আয়োজনে কোন দল কতটা নিজেদের শক্ত রাখতে পারে সেটাও দেখার বিষয়। যেহেতু এবারের আসরে সরাসরি লিগ ভিত্তিতে হবে সেহেতু কারা খেলবে শেষ চারে সেটাও বলতে পারছেননা ক্রিকেট বোদ্ধারা। বলা হচ্ছে এবারের বিশ্বকাপটি একেবারে ওপেন একটি মঞ্চ। যেখানে যে কেউ জিতে নিতে পারে স্বপ্নের ট্রফিটা।

এ নিয়ে পঞ্চমবারের মত বিশ্বকাপ আয়োজন করছে ক্রিকেটের জন্মভূমি ইংল্যান্ড। কিন্তু সাফল্যের খাতা তাদের একেবারেই শূন্য। ইংলিশরা এরই মধ্যে তিনবার ফাইনালেও খেলেছে। কিন্তু তিনবারই ফিরতে হয়েছে খালি হাতে। তাই এবারের আসরটি নিজেদের করে নিতে প্রস্তুত ইংলিশরা। তাই বলে অন্যরা কি ছেড়ে দেবে। ইংলিশরা যদি পাঁচ বারের আয়োজক হয় তাহলে অস্ট্রেলিয়া কিন্তু পাঁচ বারের চ্যাম্পিয়ন। যদিও তাদেরকে অনেকেই ফেভারিটের তালিকায় রাখছেন না। কিন্তু দলটির নাম যখন অস্ট্রেলিয়া তখন তাদের বাদ দিয়ে শিরোপার জয়ী হিসেব করাটা বোকামিই হবে। আবার ভারতের বিশ্বকাপ জেতার সম্ভাবনা দেখছেন বেশিরভাগ ক্রিকেট বোদ্ধা। দলটি রয়েছে দারুণ ফর্মেও। তাই বলে অন্যরা কি ছেড়ে দেবে। তারপরও বিরাট কোহলির দলের সম্ভাবনা রয়েছে বিশ্বকাপ জয়ের। দলটির দারুণ ব্যাটিং লাইনের পাশাপাশি চমৎকার বোলিং সম্ভাবনায় তাদের এগিয়ে রাখছে।তাই ইংল্যান্ডের পর ভারতই বিশ্বকাপ জিতবে সে বাজি ধরার লোক অনেক। নিউজিল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং পাকিস্তানকে কেউই এবারে হিসিবের মধ্যে রাখছেনা। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না এই ফরমেটের ক্রিকেটে ১৯৯২ সালে সবাইকে চমকে দিয়েছিল ইমরান খানের পাকিস্তান। আর টুর্নামেন্টটি ইংল্যান্ডে বলে পাকিস্তানকে মোটেও হেলা করা যাবে না। দুই বছর আগেইতো এই ইংল্যান্ড থেকে চ্যম্পিয়ন্স ট্রফির শিরোপা জিতে এসেছে পাকিস্তান। আর নিউজিল্যান্ড কিংবা ওয়েস্ট ইন্ডিজ দু দলই বদলে দিতে পারে যেকোন কিছু। বিশেষ করে গেইল, রাসেল, হোল্ডার, লুইসদের নিয়ে দারুন এক দল প্রথম দুই আসরের চ্যাম্পিয়নরা।তাই ভিন্ন কিছু করে ফেললে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
১৯৯৯ সাল থেকে সরাসরি বিশ্বকাপের সব আসরেই খেলে আসছে বাংলাদেশ। আর গত কয় বছর ধরে বাংলাদেশ এগিয়েছে অনেকদূর। গত বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে খেলা টাইগাররা ২০১৭ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে খেলেছিল সেমিফাইনালে। তাছাড়া মাশরাফির দল এখন দারুণ ছন্দে। কাজেই বাংলাদেশকে নিয়ে ঝুঁকি নেওয়াটা যে উচিত হবেনা সেটা জানিয়ে দিয়েছেন অনেকেই। কারন টাইগাররা এখন নিজেদের দিনে যেকোন দলকে হারিয়ে দিতে পারে। আর সে নিজেদের দিনটা যাদের বিপক্ষে আসবে তাদের কপালে যে দুঃখ আছে সেটা বোধহয় আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজের শিরোপা জিতে বিশ্বকাপে খেলতে যাওয়া মালাফিরা রয়েছেন দারুণ ছন্দে। তাই বাঘ আসছে সাবধান তেমনটি বলতেই পারে বাংলাদেশের সমর্থকরা। বর্তমানে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে যেকোন অঘটন ঘটিেয়ে দিতে পারে আফগানিস্তান। দলটির স্পিনার রশিদ খান একাই যেন একশ। সে সাথে রয়েছে বেশ কয়েকজন অভিজ্ঞ ক্রিকেটার। যারা গত কয় বছর ধরে নানা চমক দেখাচ্ছে। এবারের বিশ্বকাপ শুরুর আগে প্রস্তুতি ম্যাচে পাকিস্তানকে উড়িয়ে দিয়ে আরো একবার চমক দেখাল মোহাম্মদ নবীরা। তাই আফগানদের একেবারে বাতিলের খাতায় রাখবেন কিভাবে ?
ফরমেটের কারনে এবারের বিশ্বকাপ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। আগের আসর গুলোর মত গ্রুপ পর্বে দু একটি ম্যাচ হারলে কোন দল বিদায় নেবে বা কোন দল সুপার এইট পর্বে যাবে তা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। যেহেতু প্রতিটা দল নয়টি করে ম্যাচ খেলবে সেহেতু খুব সহসা বলা যাবেনা কারা থাকছে শেষ চারে বা কারা বিদায় নিচ্ছে। তাই সব সম্ভাবনার বিশ্বকাপ হবে এবার। যেখানে সবাই ফেবারিট। তবে শেষ হাসিটার জন্য অপেক্ষা করতে হবে সেই ১৪ জুলাই পর্যন্ত। সেদিন লর্ডসের বেলকনিতে কার হাতে শোভা পাবে বিশ্বকাপ। কে উঁচিয়ে ধরবে স্বপ্নের ট্রফিটা। কে ঘোষণা করবে আমরাই বিশ্ব সেরা।

x