জঙ্গি হামলা মামলার রায় দেশের বিচার ব্যবস্থায় মাইলফলক

শুক্রবার , ২৯ নভেম্বর, ২০১৯ at ৫:০১ পূর্বাহ্ণ
15

গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে নজিরবিহীন জঙ্গি হামলায় ২২ জনকে হত্যার দায়ে জেএমবির সাত সদস্যের ফাঁসির রায় দেশবাসী সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। গত বুধবার ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মজিবুর রহমান জনাকীর্ণ আদালতে আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। সর্বোচ্চ সাজার আদেশ পাওয়া জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে র‌্যাশ, আব্দুস সবুর খান, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, হাদিসুর রহমান, শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ ও মামুনুর রশিদ রিপন এ সময় কাঠগড়াতেই উপস্থিত ছিলেন। আলোচিত এই মামলার রায়ে এই পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন আদালত। বলা হয়েছে, হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার মধ্য দিয়ে জঙ্গিবাদের উন্মত্ততা, নিষ্ঠুরতা ও নৃশংসতার জঘন্য বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। জঙ্গিরা শিশুদের সামনে হত্যাকাণ্ড চালায়। তারা অসামপ্রদায়িক বাংলাদেশের চরিত্র হরণের চেষ্টা করেছে। এই আসামিরা কোনো ধরনের অনুকম্পা বা সহানুভূতি পেতে পারে না। আদালত বলেছেন, হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার মূল পরিকল্পনা করেছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডার নাগরিক তামিম চৌধুরী, যিনি ২০১৭ সালের ২৭ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের এক জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের অভিযানে নিহত হন।
এ রায় প্রত্যাশিত, সময়োচিত ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বলে আমরা মনে করি। এই রায় সন্ত্রাসীদের জন্য একটা বার্তা।
বহুল আলোচিত এ জঙ্গি হামলা মামলার রায়কে বাংলাদেশের জন্য মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। রায় ঘোষণার পর পরই ঢাকার মার্কিন দূতাবাস এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘এ রায়ের ফলে সেদিনের নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের কিছুটা হলেও কষ্টের লাঘব হবে। এই বিচার বাংলাদেশের জন্য মাইলফলক স্বরূপ।’ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র এই হামলার তদন্তকাজে বাংলাদেশ সরকারকে সহায়তা করতে পেরে সম্মানিত। বাংলাদেশকে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই এবং বিশেষ করে আইনের শাসন পরিস্থিতির উন্নয়নে সহায়তা অব্যাহত রাখার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র অঙ্গীকারাবদ্ধ। এতে আরও বলা হয়, এই ভাবগম্ভীর মুহূর্তে হত্যাকাণ্ডের শিকার সাধারণ নাগরিক এবং ঘৃণ্য ওই সন্ত্রাসী হামলার মোকাবেলায় হতাহত আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তাদের প্রিয়জনদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় গভীর শোক প্রকাশ করছে।
সাত আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায়কে দ্রুততার সঙ্গে সঠিক বিচারের প্রমাণ হিসেবে দেখেছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। তিনি বলেছেন, ‘সারা বিশ্বের কাছে প্রমাণ করতে পেরেছি যে, বাংলাদেশে এ রকম হত্যাকাণ্ড হলে তার বিচার অত্যন্ত দ্রুত হয়। আইনি সব প্রক্রিয়া ফলো করে বিচার সম্পন্ন করা হয়।’ রায়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘সেখানে ইতালীয়, জাপানি ও বাংলাদেশি নাগরিকসহ পুলিশ বাহিনীর কর্মকর্তারা ছিলেন। ঘটনা ঠেকাতে চেষ্টা করতে গিয়ে নিজেরা প্রাণ দিয়েছেন।’ এ রায়ের ফলে বিচার বিভাগ নিয়ে বিশ্বের সামনে দেশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার হবে কিনা জানতে চাইল আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমার মনে হয়, আমরা সারা বিশ্বকে প্রমাণ করতে পেরেছি যে, বাংলাদেশে এ রকম হত্যাকাণ্ড হলে তার বিচার অত্যন্ত দ্রুত হয়’। বিচারে এক আসামির খালাসের রায়ের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়া হবে কিনা- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি এখনও জাজমেন্ট পড়িনি। কেন খালাস পেল জাজমেন্ট দেখে নিই তারপর সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’ আইনমন্ত্রী জানান, ‘মৃত্যুদণ্ডের রায় ডেথ রেফারেন্স হিসেবে সাতদিনের মধ্যে উচ্চ আদালতে চলে যাবে। সেখানে গেলে পেপারবুক তৈরি হবে। এটার বিচার সেখানেও যাতে দ্রুত শেষ হয় আমি চেষ্টা করব। এর আগেরবার নুসরাত হত্যা মামলায় রায়ে যে কথা বলেছি, দ্রুত পেপারবুক তৈরি করে হাইকোর্টের তালিকায় আনা যায় সেই ব্যবস্থা করা হবে।’ এ রায়ে সবাই সন্তুষ্ট হলেও ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত সাত আসামি আপিল করবেন বলে পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা গেছে। তবে আইনমন্ত্রীর সঙ্গে সুর মিলিয়ে আমরাও বলতে পারি, ‘এরকম চাঞ্চল্যকর যে সব মামলা দেশের শেকড়ে গিয়ে ধাক্কা দেয়, সে সব মামলা দ্রুত শেষ করা গেছে। সেটা বড় সন্তুষ্টির কারণ।’ এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল হলেও দরকার যত দ্রুত সম্ভব ন্যক্কারজনক হত্যাকাণ্ডের বিচার শেষ করা।

x