ছোট্ট রাজপুত্র

আনন্দময়ী মজুমদার

শনিবার , ১ জুন, ২০১৯ at ১০:৫৯ পূর্বাহ্ণ
74

১.
ছোট্ট রাজপুত্র যখন অনুবাদ করতে লাগলাম তখন পদে পদে বিস্ময়। আমার ঘরে এক বিস্ময়কর শিশু ছিল যাকে দেখে আমার কলমে বাকস্ফূর্তি ঘটে, আর ছিল হৃদয়কে জল দেবার মত কতিপয় মানুষ। বরাবর ভেবে এসেছি, আমার মতো লোককে কে-ই বা কবে গোড়ায় জল দিয়ে যেতে চায়, একনাগাড়ে। এভাবে, চলতে লাগি, বাঁচতে লাগি।
ছোট্ট রাজপুত্র জানায়, যে আকাশে অগুনতি তারা, সে তারার ঝাঁকে একটা ছোট্ট গ্রহে তার একটা ফেলে আসা প্রিয় ফুল আছে। আকাশের তারার দিকে তাকালে সেই ফুল মনে পড়ে বলেই আকাশ ভরা তারা, তার কাছে এতো প্রিয়।
অমনি আমার কাছে অনেক কিছু জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল।
কেন কাজলা, বিনোদপুর, মহেশ্বরপাশা, সাহেব বাজার, কাটাখালি, বেজপাড়া, ফুলতলা, খালিশপুর এই সব নামে একটা অর্থপূর্ণ ঝংকার আছে।
কেন কোলকাতা, কাম্পালা, এন্টেবে, ওয়ান্ডেগেয়া, আফ্রিকা, কানেটিকাট, পেন্সিল্‌েভনিয়া, মিশিগান, চ্যাপেল হিল, ডারহ্যাম, স্কটসডেল, প্লেনো, নাম সমূহের মধ্যে একটা টানটান বাজনা আছে। ইত্যাদি।
২.
দীর্ঘদিন প্রবাসে ছিলাম। আবার কখনো দীর্ঘদিন স্বদেশে ছিলাম। কখনো প্রতিবেশী রাষ্ট্রে। যখন যেখানে থাকিনি, তখন সেই জায়গার মানুষের কথা ভেবে সেই জায়গা আমার প্রিয় হয়ে উঠত। ছোটোবেলায় আফ্রিকা থাকার সময় স্বদেশের নস্টালজিয়া আমার পরিবারের কথা ভেবে প্রত্যেকটা ধূলিকণা আমাকে টানত। এসবই, দেশপ্রেমের মানে। যারা আমার পরিবারের লতাপাতায় আছেন, আমাদের সঙ্গে বহুদিন কথা নেই, সংযোগ নেই, তারা জানবেন না, শিশু আমার কাছে তাঁদের উপস্থিতি কতো মিনিংফুল ছিল। আর সে কারণেই এক একটা শহর আমার কাছে ঠিকানা। খুলনা, যশোর, নাকতলা, হালিশহর, নিউ আলিপুর, রাজশাহী, ঢাকা, আমার মায়ের আদি বাড়ি হদ, সেখানে একটা বাড়ি ছিল, সে বাড়ির ওপর আমার অগাধ আকর্ষণ, যদিও সেখানে বহুবার ইচ্ছে থাকলেও যাবার সুযোগ হয়নি।
কিন্তু এখন তো অনেক দেশে থেকে ভালোবাসার মানুষ সব জায়গায় আছে, তাই সেই সব জায়গার জন্য আমার ভালোবাসা আছে। সেখানে দৈবাৎ বেড়াতে গেলে সেই ভালোবাসা আমাকে কাতর করে। এমনকি সস্তা সাবওয়ে স্যান্ডুইচের চেইনের দোকানে গিয়ে আমি আমার বহুবার খাওয়া টুনা স্যান্ডউইচ খেয়ে নিই, কারণ ছাত্র অবস্থায় এই স্যান্ডউইচ ছিল প্রায় দিনের দিবাহার। লেটুস পাতা, কাঁচা পেয়াজ, টমেটো, শশা, হানি মাস্টারড, গোল মরিচের গুড়ো, হুইট ব্রেড।
ছাত্র পড়িয়ে পাওয়া এসিস্টেন্টশিপের টাকায় আমাদের স্বনির্ভর, স্বস্তিকর ভুড়িভোজ।
কতো দিন ক্যাম্পাসের বরফপড়া শাদা ন্যাড়া প্রান্তর, অথবা বসন্তের আপেল, চেরি ফুল বা সবুজ ঘাসের পথে হেঁটে হেঁটে বেড়ানোর কত অভিজ্ঞতার মধ্যে এই টুনা স্যান্ডউইচের একটা জায়গা আছে। ৭ বছর পর সে দেশে ফিরে প্রথম সেখানে একটা ছবি তুলে নিলাম। দোকানদার মজা পেলেও একটুও বিব্রত করেননি।
৩.
এমন মানুষের সঙ্গে দেখা হয়, যার নিজের দেশের জন্য, অথবা ফেলে আসা আবাস বা স্বজনদের আবাসস্থল, বা স্মৃতির পীঠস্থানের প্রতি, একটুও টান নেই। যেখানে কিছুদিন থাকল, সেখানে অন্তত আরেকবার ফিরে এসে মাটি ছুঁয়ে যাবার কোনও ইচ্ছে নেই। তাঁদের শেকড় এমন আলগা। অথচ তাদের নাকি অনেক বন্ধু।
বুঝতে পারি, কখনো একটা ভালো বন্ধুত্বের, একটা ছোট স্মৃতির কদর, তারা করতে পারেনি।
অন্যরা যখন করার চেষ্টা করে, তারা বুঝতে পারে না, বাধাও দেয়।
৪.
কবি পাবলো নেরুদা রাষ্ট্রদূত হিসেবে সারা বিশ্বে ঘুরেছেন ছোটোবেলায়, আর যেখানে গেছেন সেখানে শেকড় গজিয়ে গেছে তাঁর। অনুকম্পা, শ্রদ্ধা আর দরদ নিয়ে তাঁর স্মৃতিকথায় লাইনে লাইনে তা হীরাপান্নার মতো ঝলসাতে থাকে। এমনকি, দুঃখের স্মৃতি, সংকটের স্মৃতিও। এসব তাঁর অনবদ্য কবিতায় ঝর্ণার জলের সঙ্গে নুড়ি হয়ে ঝরে ঝরে পড়ে।

x