চ্যালেঞ্জের মুখে পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান

মুহাম্মদ মুসা খান

মঙ্গলবার , ১০ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৪:৪৩ পূর্বাহ্ণ
58

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান আহমদ খান নিয়াজি ওরফে ইমরান খান ক্রিকেটের মাঠে ছিল অপ্রতিদ্বন্ধি, প্রতিপক্ষের আতংক। ক্রিকেট বল হাতে নিয়ে যখন দৌড়ে যেতেন তখন প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানের হৃৎকম্পন শুরু হতো। ৮৬.৭৭ মাইলে স্পীডে বোলিং করেই ১৯৯২ সনে পাকিস্তানকে ক্রিকেট বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন। ক্রিকেট হতে অবসর নিয়ে ইমরান রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯৯৬ সনে গঠন করেন পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) নামের রাজনৈতিক দল। প্রথমদিকে তেমন সুবিধা করতে পারেননি। ১৯৯৭ সনে ২টি আসন হতে নির্বাচন করে পরাজিত হন। কিন্তু ২০০২ সনে প্রথম ১টি আসনে বিজয়ী হন। ২০০৮ সনের নির্বাচন বয়কট করেন। এবং ২০১৩ সনের নির্বাচনে তাঁর দল ৩৪টি আসনে বিজয়ী হয়ে পাকিস্তানের দ্বিতীয় বৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সর্বশেষ ২০১৮ সনের নির্বাচনে ১৬.৯ মিলিয়ন ভোট পেয়ে সরাসরি ভোটের ২৭২ আসনের মধ্যে ১১৫টি আসনে বিজয়ী হন। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার না পেলেও (একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য আরও ২২ আসন প্রয়োজন ছিল) মুত্তাহিদা কওমী মুভমেন্ট (এমকিউএম)-এর সাথে কোয়ালিশন সরকার গঠন করে পাকিস্তানের ২২ তম প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহন করেন।
তাঁর দল পিটিআই খাইবার পাখতুয়ান প্রদেশ ও পাঞ্জাবে ২০১৮ সনের নির্বাচনে অধিকাংশ আসনে জিতে কোয়ালিশন সরকার গঠন করে এবং বেলুচিস্তানে জোট সরকারের অংশীদার হয়। সিদ্ধু প্রদেশে প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করছে। অভিযোগ রয়েছে তিনি পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর আশীর্বাদপুষ্ট হয়েই নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়েছেন। সেনাবাহিনীর আশীর্বাদেই হোক আর জনগণের ভোটেই হোক ইমরান খান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এটাই আজ বাস্তবতা। পাকিস্তানের সরকার প্রধানদের (জুলফিকর আলী ভুট্টো, বেনজির ভুট্টো, নেওয়াজ শরীফ, প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশারফ, জিয়াউল হক, আসিফ আলী জারদারি প্রমুখ) নামের পাশে এখন তাঁর নামও শোভা পাচ্ছে।
রাজনৈতিক অভিজ্ঞজনদের ধারণা ছিল, ইমরান খান হয়তো পাঁচবছর নির্বিঘ্নে সরকার পরিচালনা করতে পারবেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের এই ধারণা মিথ্যা প্রমান করার জন্য রাজনীতির মাঠে সর্বশক্তি নিয়ে নেমে পড়েছেন, বিরোধী রাজনীতিক ”উলেমা-ই-ইসলামের” আমির ফজলুর রহমান। মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ে পাক প্রধানমন্ত্রীর কড়া সমালোচনা করে তিনি সরকার বিরোধী আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন। এই আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ ও বিলাওয়েল ভুট্টোর নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল গুলো। ফজলুর রহমানের অভিযোগ- দেশ হতে দূর্নীতি দূর করা ও ভেঙ্গে পড়া অর্থনীতিকে টেনে তোলার আশ্বাস দিলেও ইমরান বিগত এক বছরের বেশী সময় ধরে তেমন কিছুই করতে পারেন নি। বরং মূল্য বৃদ্ধি চরম সীমায় পৌঁছেছে। সাধারণ মানুষ দু’বেলা খাবারের জন্য সংগ্রাম করছে। এমন পরিস্থিতিতে গত ২৭ অক্টোবর ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে লাখো জনতার ”আজাদি মার্চ” বা স্বাধীনতার মিছিলটি করাচি হতে বিভিন্ন শহর ঘুরে ৩১ অক্টোবর রাজধানী ইসলামাবাদে এসে পৌঁছায় এবং পরদিন আজাদি মার্চের নেতৃত্ব দেয়া ফজলুর রহমান পদত্যাগের জন্য ইমরান খানকে দুই দিনের সময় বেঁধে দেন। কিন্তু ইতোমধ্যে আমরা জেনেছি যে, বিরোধীদের দাবীর মুখে ইমরান পদত্যাগ করেননি। দাবীর ব্যাপারে ইমরান বলেন, ”কিছু সরকার বিরোধীর বিক্ষোভের কারণে সাংবিধানিক বৈধ সরকারের পতন হবে না। তিনি বলেন, সরকার বেশ কিছু বিষয়ে সমঝোতা করছে। কিন্তু বিরোধীরা যদি সমঝোতা না মেনে বা সংবিধান লংঘন করেন বা জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দেয়ার চেষ্টা করে, তাহলে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে”। পাক গনমাধ্যম ‘ডন’ এর মারফত জানা যায়-গিলগিট-বালটিস্তানে এক সমাবেশে ইমরান আজাদি মার্চ-এ অংশ নেয়া জনতাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘তোমাদের খাবার শেষ হয়ে গেলে জানাবে, আমরা তোমাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করবো। কিন্তু তোমাদের নেতাদের ছাড় দেয়া হবে না’। তিনি আরও বলেন, ‘ইসলাম ধর্মকে ব্যবহার করে পাকিস্তানে ক্ষমতায় যাওয়ার দিন শেষ হয়ে গেছে, এটি নতুন পাকিস্তান’। এদিকে সরকার বিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষিতে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ইমরান খানের প্রতি তাঁদের সমর্থন ব্যক্ত করেছে বলে জানা গেছে। ২ নভেম্বর পাক সেনাবাহিনীর মুখপাত্র লে. জেনারেল আসিফ গফুর বলেন, আমরা বিরোধীদের আন্দোলনের মুখে ইমরান খান সরকারকে সমর্থন দিয়ে যাবো। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী সংবিধান সমুন্নত রাখতে বদ্ধপরিকর।
পাকিস্তানে লাখো জনতার আজাদি মার্চ সত্বেও ইমরান খান সরকারের তেমন অসুবিধা না হওয়াতে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল বিস্মিত হয়নি। কারণ পাকিস্তান সরকারের মূল শক্তি এখন সেনাবাহিনীর সমর্থন। সেনাবহিনীর সমর্থনপুষ্ট সরকারকে কুপোকাত করা অসম্ভবই বলা যায়। কিন্তু প্রবীণ রাজনীতিক ফজলুর রহমানের অতীত ইতিহাস যারা জানেন, তাঁরা একেবারে তাঁর চ্যালেঞ্জকে উড়িয়ে দিতে চাচ্ছেন না। ৬৬ বছর বয়সী ফজলুর রহমান ১৯৭৭ সনে তরুণ বয়সেই তাঁরা বাবা মুফতি মাহমুদকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকর আলী ভুট্টোর বিরুদ্ধে জনপ্রিয় আন্দোলনের নেতৃত্বে দিতে দেখেছেন। তাঁরা বাবা মুফতি মাহমুদ বর্তমান খাইবার পাখতুয়ান রাজ্যের প্রথম নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। মুফতি মাহমুদের আন্দোলনে ভুট্টো দিশেহারা হয়ে তিনটি শহরে মার্শাল’ল জারি করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ১৯৮০ সনে বাবার মৃত্যুর পর হতে ফজলুর রহমান তাঁর আদর্শকে ধারন করে রাজনীতিতে সক্রিয় আছেন। পাকিস্তানের রাজনীতিতে অনলবর্ষী বক্তা ফজলুর রহমান জেনারেল জিয়াউল হকের আমলে কারাবরণ করেন। ফজলুর রহমানই একমাত্র ধর্মীয় রাজনীতিক যিনি ২০০২ সনে পাকিস্তানের সকল ইসলামি দল নিয়ে ‘মুত্তাহিদা মজলিসে আমল (এমএমএ)’ নামে একটি জোট গঠন করেন। এতে মওদূদি ও শিয়াসহ সকল মতের লোকদের ঐক্যবদ্ধ করেন এবং কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে এই জোট (এমএমএ) ৭২টি আসন লাভ করে। ২০০২ সনের নির্বাচনে অনেকে মনে করেছিলেন তিনি (ফজলুর রহমান) পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিরোধী দলের প্রধান হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল।
পাক কলামিষ্ট হামিদ মীর-এর মতে, ‘পাকিস্তানের সবচেয়ে ধীমান রাজনীতিবিদ ফজলুর রহমান’। তিনি বিবিসি কর্তৃক এশিয়ার পঞ্চম এবং বিশ্বের উনিশতম ধীমান রাজনীতিবিদ নির্বাচিত হয়েছিলেন। সুতরাং এই যাত্রায় যদিও ইমরান খান পাক সেনাবাহিনীর সমর্থনপুষ্ট হয়ে গদি রক্ষা করতে পেরেছেন। কিন্তু পাকিস্তানের বিরোধী দল গুলো যেভাবে ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে একজোট হচ্ছে তাতে আগামীতে ইমরান খানকে কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে-যা সহজে অনুমেয়। ইমরান খান যতই বলুক ”ধর্মকে পূঁজি করে পাকিস্তানের রাজনীতিতে সুবিধা আদয়ের সময় শেষ”। কিন্তু পাকিস্তানী রাজনীতির ইতিহাস হলো, ধর্মকে পূঁজি করে রাজনীতির ইতিহাস। অঙফোর্ডে লেখাপড়া করা ইমরান যতই পাকিস্তানের রাজনীতিকে ধর্মীয় প্রভাবমুক্ত রাখার চেষ্টা করুক না কেন, তা হতে মুক্ত করা বেশ কঠিনই মনে হয়।
বলাবাহুল্য যে, ইমরান খান নিজেও কিন্তু ধর্মান্ধ। এবং তাঁর ধর্মান্ধতার কারণেই বৃটিশ ধনকুবের স্ত্রী জেমিমা গোল্ডস্মিথ তাঁকে ছেড়ে গিয়েছিলো। বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধিদের বিচারের সমালোচনা করেও ইমরান বক্তব্য দিয়েছিলেন। অবশ্য সরকার গঠন করে কিছুটা উদারতা দেখাচ্ছেন তিনি। ভারতে বাবরি মসজিদ সম্পর্কিত সুপ্রীম কোর্টের বিতর্কিত রায়ের প্রাক্কালে ইমরান পাকিস্তানে শিখদের তীর্থস্থান পাঞ্জাবে ‘দেরা বাবা নানক’-ও লাহোরে ‘দরবার সাহিব গুরুদ্বার’-এ আসা-যাওয়ার জন্য চার কিলোমিটার দীর্ঘ দু’টি করিডোর খুলে দিয়েছেন। যেটা দিয়ে শিখরা তাঁদের তীর্থস্থানে যেতে পারবে। তাঁর উদারতা বিশ্বব্যাপী প্রশংসা পেয়েছে। তাছাড়া ফজলুর রহমানের নেতৃত্বাধীন লাখো জনতার আজাদি মার্চকে কোন রূপ বাধা না দিয়ে নির্বিঘ্নে রাজধানী ইসলামাবাদে প্রবেশ করতে দিয়ে তিনি প্রশংসিত হয়েছেন। বিরোধীদের প্রতি তাঁর এই উদারতা তৃতীয় বিশ্বে বিরল ঘটনা বলে অনেকে মনে করেন। এদিকে ভারতের কাশ্মির নীতির কড়া সমালোচনা করে জাতিসংঘে বক্তৃতা দিয়ে ইমরান খান পাকিস্তানি জনগণের আস্থার স্থানে কিছুটা স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন।
একথা স্বীকার্য যে, পাকিস্তানের রাজনীতিতে অদ্যাবধি সেনাবাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শেষ পর্যন্ত যদি সেনাবাহিনীর আস্থা ইমরানের উপর থাকে, তাহলে ফজলুর রহমানের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ও ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতিবিদদের আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশী। এমনও হতে পারে যে, পরবর্তী পাঁচ বছরও ইমরানই থাকবেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী।
লেখক : কলামিস্ট, সমাজকর্মী।