চ্যালেঞ্জের মুখে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য করণীয় নিয়ে ভাবতে হবে

বুধবার , ১৩ নভেম্বর, ২০১৯ at ৪:২৮ পূর্বাহ্ণ
35

দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য বর্তমানে চ্যালেঞ্জের মুখে বলে দাবি করেছেন ব্যবসায়ী সংগঠনের শীর্ষস্থানীয় নেতারা। তাঁরা মনে করেন, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ কমে গেছে। ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হারের জন্য উৎপাদন খরচ বেড়েছে। শিল্প খাতের গ্যাসের দাম ভারত, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার চেয়ে বেশি। সুশাসনের অভাবে পুঁজিবাজারের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য চ্যালেঞ্জের মুখে।
গত ৯ নভেম্বর ঢাকা চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি’র উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে উল্লিখিত অভিমত ব্যক্ত করা হয়। বেসরকারি খাতের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ চিত্র শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে নেতৃবৃন্দ বলেন, নানা কারণে শিল্প উৎপাদকেরা লাভের মুখ দেখছেন না। পণ্য বহুমুখী থাকায় বড় ব্যবসায়ীরা কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় থাকলেও ছোটরা আছেন বেশ চাপে। ব্যবসা-বাণিজ্যের চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি করণীয় তুলে ধরেছেন চেম্বারের নেতারা।
‘খেলাপি ঋণ’ সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে অতি উচ্চারিত শব্দ। দেশের অর্থবাজারে ঋণ খেলাপি অত্যন্ত ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে, যে-কারণে ঋণ খেলাপিরা শুধু আইনের চোখেই দোষী নন, সামাজিকভাবেও নিন্দিত। দেশের ছোট বড় সকল মানুষ তাঁদের সঞ্চয় ব্যাংকে জমা রাখেন। ব্যাংক সেই সঞ্চয়ের অর্থ থেকে ঋণ প্রদান করে। কাজেই ঋণ সময়মতো পরিশোধ না করলে সঞ্চয়কারীদের অর্থ উত্তোলনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে। তাছাড়া ঋণ তহবিল সীমিত বিধায় ঋণ খেলাপ ঘটলে নতুন উদ্যোক্তা ঋণ নিতে পারেন না। ফলে অর্থনীতির গতিশীলতা বাধাপ্রাপ্ত হয়। আমাদের মনে রাখতে হবে যে মূলধন অধিক উৎপাদনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। বৃহদায়তন শিল্পের প্রসারের ক্ষেত্রে মূলধনের প্রয়োজনীয়তা বাড়ে। ঋণ নিয়ে মূলধন জোরদার করলেও ঋণ ফেরতের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিতে হয়। অন্যদিকে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার এবং শিল্পায়নে বিঘ্ন সৃষ্টি হলে চলমান অর্থনীতির চাকা বাধাপ্রাপ্ত হয়। অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিগণ শিল্পের বিকাশ ও প্রবৃদ্ধির পথে কয়েকটি অন্তরায় চিহ্নিত করেছেন। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে : পুঁজি ও দীর্ঘমেয়াদি মূলধন প্রাপ্তিতে সংকট, ব্যাংকিং খাতে সুদের উচ্চ হার, রাজনৈতিক পরিস্থিতি বা স্থিতিশীলতার অভাব, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো সহায়তা, শুল্ক পর্যায়ে অনিয়ম, সরকারের বিভিন্ন নীতি ও পরিকল্পনায় অসঙ্গতি, সুশাসনের অভাব প্রভৃতি।
ঢাকা চেম্বারের সংবাদ সম্মেলনেও সুশাসনের বিষয়টিকে গুরুত্বারোপ করা হয়। ১৯৯০ এর দশকের গোড়ার দিকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাবিকাঠি হিসেবে সুশাসনের গুরুত্বকে হিসেবে আনা হচ্ছে। সুশাসন-এ কথাটি ব্যক্তি মানুষের জ্ঞানগত পরিমণ্ডলের ব্যাপ্তির ভিত্তিতে নানাজনের কাছে নানা অর্থ ও তাৎপর্য বহন করে। এজন্য প্রত্যেকের কাছে সুশাসনকে বোধগম্য করে তুলতে এই পারিভাষিক শব্দটির বহু ব্যাখ্যা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উপযোগী সংজ্ঞা হলো : দক্ষতা বাড়াতে দেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়াবলি এবং লভ্য সম্পদের যথার্থ ব্যবস্থাপনা। সুশাসনের ধারণা উন্নয়ন প্রক্রিয়ার যথার্থ ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও সম্পর্কিত। আর এই যথার্থ ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্র, জনসাধারণ, সুশীল সমাজ ও বেসরকারি খাতগুলোও সম্পর্কিত।
চেম্বার নেতারা বলেন, ছয় বছর ধরে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ জিডিপির ২২-২৩ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। বিনিয়োগ বাড়াতে তারা সড়ক রেল, বিমানবন্দর ও নদীপথে মানসম্মত বিনিয়োগের উপর জোর দেন, যাতে ব্যবসার খরচ কমে। তাঁরা বলেন, সমুদ্র বন্দরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন লাগবে। ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করতে প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতি সংস্কারের পাশাপাশি প্রতিযোগী দেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে করপোরেট কর পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। এক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দরের সুযোগ-সুবিধা আরো বর্ধিত করা দরকার। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসে ৪-৫ দিন সময় লাগে, যেখানে ভারতে লাগে মাত্র ২ দশমিক ১৪ দিন। গভীরতার স্বল্পতা, পলিমাটি ও কন্টেনার ব্যবস্থাপনার অপর্যাপ্ততা বন্দরের মূল প্রতিবন্ধকতা বলে তাঁরা মনে করেন।
সার্বিকভাবে ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। শিল্পায়নে বাড়াতে হবে বিনিয়োগ। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বিনিয়োগের সমন্বয় সাধন প্রয়োজন বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। পরিবেশ যত উন্নত হবে, ব্যবসা-বাণিজ্যের তত বেশি প্রসার ঘটবে।

x