চীনা প্রকল্প : চট্টগ্রামসহ পুরো দেশ সঙ্কটে

বৃহস্পতিবার , ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ at ৫:২২ পূর্বাহ্ণ

চীনের অর্থায়ন ও কারিগরি সহযোগিতায় চট্টগ্রামে কর্ণফুলী তলদেশের টানেলওয়ে, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন, মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ আরো কিছু মেগাপ্রকল্পের কাজ চলছে। তা’ছাড়া স্বপ্নের পদ্মাসেতু ও সেতুতে রেললাইন নির্মাণ মহাপ্রকল্প, পায়রা তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ দেশের আরো অনেক মেগাপ্রকল্প চীনা সহযোগিতা বা কারিগরি সহায়তায় বাস্তবায়নাধীন। ১২ ফেব্রুয়ারি দৈনিক আজাদীতে এ’নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পগুলোর আর্থিক মূল্য লক্ষ কোটি টাকার উপরে। চীনা নববর্ষ উপলক্ষে জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে প্রকল্পে নিয়োজিত অনেক চীনা বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী ও কারিগরি টিমের সদস্য ছুটি কাটাতে দেশে গিয়ে আর ফিরতে পারছেন না। চীনজুড়ে ইভেলা করোনাভাইরাসের ব্যাপক সংক্রমণ ও প্রাণহানিতে দেশটি এখন বিশ্ব থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন। চীনা বিশেষজ্ঞ ও কারিগরি দলের যারা চীনে অবস্থান করছেন, তাদের এখন আর বাংলাদেশে ফেরার উপায় নেই। বাংলাদেশ এরমাঝে চীনে অবস্থানরত বাংলাদেশিদেরও আর দেশে ফিরিয়ে আনবেনা বলে জানিয়ে দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। যারা দেশে ফিরতে চান, তাদের নিজ উদ্যোগে ফিরতে হবে। এ’ অবস্থায় চীনাদেরও ফেরার পথ বন্ধ। এতে মেগা প্রকল্পগুলোর কাজ ঝুলে গেছে বলে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন। করোনাভাইরাস সংক্রমণ আওতায় না আসলে দেশের মেগা প্রকল্পগুলো যথাসময়ে বাস্তবায়নের সম্ভাবনা একদম ক্ষীণ। করোনাভাইরাস এখন শুধু চীনের নয়, পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে। চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। পৃথিবীর সবখানে তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে আছে। আমাদের উন্নয়ন প্রকল্প ছাড়াও বিপুল পণ্য চীন থেকে আমদানি হয়। শিল্প কারখানার যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে বিপুল ভোগ্য পণ্য আমদানি হয় চীন থেকে। এ’ অবস্থায় চীনা পণ্য এবং চীনা নাগরিক বাংলাদেশকে এমনিতেই করোনাভাইরাস ঝুঁকির মাঝে রেখেছে। এরমাঝে বাংলাদেশ বিমানের যে বাণিজ্যিক ফ্লাইটটি ঝুঁকি নিয়ে হুবেই প্রদেশ থেকে কয়েক শ বাংলাদেশীকে দেশে এনেছিল, ওই বিমানটির অন্য দেশে উড্ডয়ন বন্ধ করে দিয়েছে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল তদারকি কর্তৃপক্ষ। বিমানটির পাইলট এবং ক্রূদের উড়ালও বন্ধ রয়েছে। চীনের আক্রান্ত হুবেই প্রদেশে আটকে পড়া আতঙ্কিত আরো ১৭১ শিক্ষার্থী বাঁচার আকুতি জানিয়ে দেশে ফেরার আবেদন জানালেও কর্তৃপক্ষ কোন পদক্ষেপ নিতে পারছেনা। স্বাভাবিকভাবে সামনে দেশবাসীকে আরো কঠিন পরীক্ষা দিতে তৈরি থাকতে হবে।
চীনা কারিগরি সহযোগিতা ও অর্থায়নে পরিচালিত মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে সরকারকে বিকল্প চিন্তা নিয়ে এগুতে হবে। অন্য বিকল্প উৎস যদি পাইপলাইন রাখা না হয়, তাহলে দেশের চলমান উন্নয়ন মহাযজ্ঞের গতি থমকে পড়ার শঙ্কা থাকবেই। শুধু তাইনা, আমাদের দেশের ফলমূলসহ বিপুল ভোগ্য পণ্যের যোগান আসে চীন থেকে। গৃহস্থালি সামগ্রীও এখন চীন নির্ভর। ইভেলা করোনাভাইরাস যেভাবে চীনসহ পাশের দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ছে, তাতে পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে এর ধাক্কা সামাল দিতে হবে। আমাদের মত উদীয়মান অর্থনীতির জন্য এটা বড় সতর্ক সংকেত। স্বাস্থ্য ঝুঁকি ও উন্নয়ন খাতের উদ্ভূত সংকট মোকাবেলায় সরকারের বিকল্প চিন্তা এখনো পরিষ্কার নয়। ওদিকে চীন করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে এখনো কার্যকর কোন প্রতিষেধক বের করতে পারেনি। ফলে একদিকে প্রতিদিন রোগটি বিশাল অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। বাড়ছে প্রাণহানি ও আক্রান্তের সংখ্যা। সর্বশেষ প্রাপ্ত খবরে মৃতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে গেছে। আক্রান্তের সংখ্যা ৪০ হাজার ছুঁইছুঁই। জাতিসংঘ স্বাস্থ্য দপ্তর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হু রোগ নির্মূলে প্রতিরোধে যে বাজেট দিয়েছে, ওই তহবিল এখনো যোগাড় হয়নি। বিশ্ব অর্থনীতি ও মানব সভ্যতাকে বাঁচাতে হলে ভয়াল করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক ও সমন্বিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা যত দ্রুত সম্ভব গ্রহণ করতেই হবে। শুধু চীন থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে বা চিনকে বিচ্ছিন্ন করে রেখে এই আপদ থেকে মুক্তির পথ খোঁজা হবে অন্ধের হাতি দর্শনের মতো হাস্যকর প্রয়াস।
বড় বিপদে এখন বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল বা ছোট অর্থনীতির দেশগুলো। কারণ উন্নত বিশ্বের পক্ষে চীন থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা যত সহজ, আমাদের মত দেশগুলোর জন্য ততটাই কঠিন। আমাদের প্রত্যেকের অন্দর মহলেও এখন চীনা পণ্যের ছড়াছড়ি। এগুলো ছুঁড়ে ফেলে নতুন উৎসর সন্ধান বা খুঁজে বের করা একেবারেই অসম্ভব। আশা করি, ছোট দেশগুলো বিশ্বসভা বা জাতিসংঘকে করোনাভাইরাস নির্মূলে সর্বোচ্চ শক্তি ও কারিগরি জ্ঞান নিয়ে তৎপর হতে একযোগে চাপ প্রয়োগে সক্রিয় হবে।

x