চিন্তা-চেতনায় থাকতে হবে দূরদর্শিতার প্রতিফলন

চুয়েটে ৪র্থ সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতি

রাউজান প্রতিনিধি

শুক্রবার , ৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৫:৩৩ পূর্বাহ্ণ

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, ‘প্রকৌশলীগণ উন্নয়নের কারিগর। তাদের মেধা, মনন ও সৃজনশীল চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসে টেকসই উন্নয়নের রূপরেখা। তাদের চিন্তা-চেতনায় থাকতে হবে দূরদর্শিতার সুস্পষ্ট প্রতিফলন। আগামী ২০৫০ সাল বা ২১০০ সালে বাংলাদেশের উন্নয়ন কেমন হওয়া উচিত বা বাংলাদেশের অবস্থান কোন স্তরে পৌঁছাবে তা বিবেচনায় রেখেই উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টিকেও যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। বিশ্বায়নের এই যুগে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে আমাদের জ্ঞান ও দক্ষতাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, আমরা আজ স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের নাগরিক। আমাদের আত্মমর্যাদা সমুন্নত রাখতে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে হবে। আমি আশা করি, আজকের নবীন প্রকৌশলীরা বিষয়টি গুরুত্বের সাথে উপলব্ধি করবে এবং তাদের সৃজনশীল চিন্তা ও লব্ধ জ্ঞানকে এ লক্ষ্যে কাজে লাগাবে।’
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) এর চতুর্থ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশকে একটি অপার সম্ভাবনাময় দেশ উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমাদের এ দেশে রয়েছে বিপুল মানবসম্পদ, উর্বর কৃষি জমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ। বর্ধিত জনসংখ্যার এ দেশকে আরো সমৃদ্ধশালী করতে হলে দরকার পরিকল্পিত উপায়ে সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার করা। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকায় এগিয়ে আসতে হবে প্রকৌশলীদের।’ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ। সমাবর্তন বক্তা ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ. কে. আজাদ চৌধুরী। স্বাগত বক্তব্য দেন চুয়েটের ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রফিকুল আলম। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. ফারুক-উজ-জামান চৌধুরী। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, রেলপথ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভাপতি এ বি এম ফজলে করিম এমপি ও এম মাসুদা রশিদ চৌধুরী এমপি উপস্থিত ছিলেন।
নবীন গ্রাজুয়েটবৃন্দের উদ্দেশে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘সমাবর্তন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি মাইলফলক, একইসাথে তা স্নাতকদের জন্যও একটি স্মরণীয় দিন। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের দীর্ঘ শ্রম ও সাধনার ফলে অর্জিত ডিগ্রির আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ও তার আপন কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন করতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘জীবন চলার পথে তোমরা আজ একটা গুরুত্বপূর্ণ সোপান অতিক্রম করলে। জীবনের আসল সংগ্রাম এখন থেকে শুরু হলো। আজকের এ সনদপ্রাপ্তি সেই সংগ্রামে অবতীর্ণ হবার স্বীকৃতিপত্র। এ সনদের সম্মান তোমাদের রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, তোমাদের এ অর্জনে দেশের মানুষের অনেক অবদান রয়েছে। তোমরা তোমাদের সেবা, সততা, নিষ্ঠা ও দেশপ্রেম দিয়ে এ সনদের মান সমুজ্জ্বল রাখবে।’
আচার্য বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, যেখানে ছাত্রদের অন্তর্নিহিত মেধার সৃজনশীল বিকাশের সকল আয়োজন নিশ্চিত করা হয়। কেবল পুঁথিগত বিদ্যা নয়; বরং দেশ বিদেশের সর্বশেষ তথ্যসমৃদ্ধ শিক্ষা, গবেষণা এবং সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে যাতে শিক্ষার্থীরা সম্পৃক্ত হতে পারে তার দ্বার উন্মোচন করবে বিশ্ববিদ্যালয়। প্রকৌশল শিক্ষা যদিও হাতে-কলমে শিক্ষা, তা সত্ত্বেও এতে সৃজনশীলতার প্রচুর সুযোগ রয়েছে।
প্রকৌশলীদের জ্ঞানের ভিত্তি সুদৃঢ় করতে যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম এবং উন্নত পাঠদানের ব্যবস্থা থাকতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরিতে ছাত্র-শিক্ষকের মাঝে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকা আবশ্যক। শিক্ষকদের হতে হবে স্নেহশীল ও অভিভাবকতুল্য। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মহান উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে এবং একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে অবদান রাখবে এটাই সকলের প্রত্যাশা।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘১৯৬৮ সালে চট্টগ্রাম প্রকৌশল মহাবিদ্যালয় হিসেবে এ প্রতিষ্ঠান যাত্রা শুরু করে। পরবর্তীতে ১৯৮৬ সালে বিআইটি এবং ২০০৩ সালে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। অর্ধশতাব্দী ধরে প্রতিষ্ঠানটি ধারাবাহিকভাবে দেশের প্রকৌশল শিক্ষায় অনন্য অবদান রেখে চলেছে। যোগ্য প্রকৌশলী তৈরির ক্ষেত্রে আপনাদের নিরলস প্রচেষ্টা আমাকে মুগ্ধ করেছে।’ সমপ্রতি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ম্যাটেরিয়ালস সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ চালু হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানান রাষ্ট্রপতি। ভবিষ্যতে নতুন নতুন গবেষণায় বিভাগ দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেন, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রামের লালদীঘি মাঠে লক্ষ জনতার সামনে ঐতিহাসিক ৬ দফা ঘোষণা করেছিলেন। বাঙালির মুক্তির সনদ হচ্ছে এই ৬ দফা। এরই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে ও নানা চড়াই-উৎরাই এর মধ্যে দিয়ে জাতির পিতা ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। চট্টগ্রামের কৃতী সন্তান এমএ হান্নান ঐদিন চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। আমাদের মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এ ঘটনা চিরদিন স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকবে।’ তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে আমাদের স্বাধীনতার আটচল্লিশ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধে রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক মুক্তির যে লক্ষ্য ছিল তা আজো আমরা পুরোপুরি অর্জন করতে পারিনি। এর বহুবিধ কারণও রয়েছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে আমাদের উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের পথ রুদ্ধ হয়। বন্ধ হয় মানুষের বাক, মতামত ও চিন্তার স্বাধীনতা। নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে দেশে আজ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীকে সামনে রেখে একটি তথ্য-প্রযুক্তি নির্ভর জ্ঞানভিত্তিক সুখী-সমৃদ্ধ দেশ গঠনে ‘রূপকল্প ২০২১’ ও ‘রূপকল্প ২০৪১’ ঘোষণা করেছেন। এ রূপকল্প বাস্তবায়নে আমাদের নিরলস প্রচেষ্টা চালাতে হবে। এরই মধ্যে আমরা স্বল্প মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার মধ্য দিয়ে উন্নয়নের রূপকল্প বাস্তবায়নে এগিয়ে চলেছি। আজকের শিক্ষিত তরুণরাই এ কার্যক্রমকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস।’
তিনি বলেন, ‘জাতির পিতা বলেছিলেন- স্বাধীনতা সংগ্রামের চাইতেও দেশ গড়ার সংগ্রাম বেশি কঠিন। দেশ গড়ার সংগ্রামে আরো বেশি আত্মত্যাগ, আরো বেশি ধৈর্য্য, আরো বেশি পরিশ্রম দরকার। জাতির পিতার এই আহবানকে তোমরা বুকে ধারণ করে দেশ গড়ার কাজে ব্রতী হবে- এ প্রত্যাশা করি। কর্মজীবনে তোমরা সফল হও, সার্থক হও। তোমাদের ভবিষ্যৎ চলার পথ সাফল্যে ভরে উঠুক- এই কামনা করি।’
মানুষের রক্ত শোষণ করে বড় লোক হওয়া ঠিক নয় উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেন, ‘মানুষকে ঠকিয়ে খাওয়া কোনো ধর্মেই বৈধ নয়। ইসলাম এটাকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। কিন্তু মজুদদাররা এটি করে যাচ্ছে। খাবারে ফরমালিনের বিরুদ্ধে ও মজুদদারদের বিরুদ্ধে মাঠে নামতে হবে। রাজনৈতিক নেতাদের উচিত উন্নয়ন কাজের পাশাপাশি মজুদদারদের মোটিভেট করে সঠিক পথে আনা।’
তিনি বলেন, এখন বিভিন্ন জায়গায় ধান উঠছে। যখন ধানকাটা শুরু হয় তখন চালের দাম বাজারে কমে যায়। একদিকে ধান উঠছে, অন্যদিকে কৃষকরা হাহাকার করছেন ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। অপরদিকে যারা ব্যবসা করছেন হাজার হাজার টন ধান চাল মজুদদার তারা প্রতি কেজিতে ৪-৫ টাকা করে দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। এটা আসলেই খুব দুঃখজনক। তারা একদিকে পেঁয়াজের দাম বাড়ান অন্যদিকে পেঁয়াজ পচিয়ে কর্ণফুলী নদীতে ফেলে দেন। তাদের এ ধরনের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে।’ তিনি ব্যবসায়ী সিণ্ডিকেটের কারসাজিতে দ্রব্য মূল্যবৃদ্ধিতে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে সর্বোচ্চ সিজিপিএধারী ৪ জনকে ‘বিশ্ববিদ্যালয় স্বর্ণপদক’ প্রদান করা হয়। স্বর্ণপদকপ্রাপ্তরা হলেন, ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী ই.এম.কে. ইকবাল আহমেদ, ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী রুবাইয়া আবসার, ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী সঞ্চয় বড়ুয়া এবং ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী মো. রাশেদুর রহমান।
এছাড়া সমাবর্তন অনুষ্ঠানে দুই হাজার ১৪৮ জন গ্র্যাজুয়েট এবং ৮৩ জন পোস্ট-গ্র্যাজুয়েটসহ মোট প্রায় দুই হাজার ২৩১ জন ছাত্র-ছাত্রীকে সমাবর্তন ডিগ্রি প্রদান করা হয়।

x