চিকিৎসাসেবায় নতুন দিগন্ত ও চট্টগ্রামবাসীর প্রত্যাশা

সোমবার , ১৭ জুন, ২০১৯ at ৫:১১ পূর্বাহ্ণ
333

চট্টগ্রাম নগরীতে গত শনিবার উদ্বোধন হয়েছে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও বিশ্বমানের একটি হাসপাতাল ‘ইম্পেরিয়াল হাসপাতাল’। পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতালের পাশে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা হয়েছে ৩৭৫ শয্যার এই হাসপাতাল। ভারতের প্রখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ও নারায়ণা হেলথের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ডা. দেবী প্রসাদ শেঠী এ হাসপাতালের উদ্বোধন করেন। হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের চিকিৎসাসহ এ বিভাগের যাবতীয় কার্যক্রম তাঁর তত্ত্বাবধানেই পরিচালিত হবে বলে জানা গেছে। এই হাসপাতাল উদ্বোধনের ফলে চট্টগ্রামে চিকিৎসাসেবায় নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিরা অভিমত প্রকাশ করেছেন।
চট্টগ্রাম নানা ক্ষেত্রে অবহেলিত। দেশের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নগরী হিসেবে যে সকল সুযোগ সুবিধা এখানে থাকার কথা, তার অর্ধেকও চট্টগ্রামে নেই। চিকিৎসা সুবিধা খুবই অপ্রতুল। ঢাকার ইউনাইটেড, স্কয়ার ও ল্যাবএডের মতো উন্নতমানের হাসপাতাল চট্টগ্রামে নেই। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনসহ জেলা, পার্বত্য চট্টগ্রাম, কঙবাজারসহ এই বিভাগের প্রায় পাঁচ কোটি লোককে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছে চট্টগ্রাম শহর। কিন্তু সে তুলনায় মানসম্মত স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান নেই বললেই চলে। বৃহত্তর চট্টগ্রামের এই কোটি কোটি লোকের চিকিৎসা সুবিধা এখন কেবল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, জেনারেল হাসপাতালসহ প্রধানত ৪/৫টি হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল। চক্ষুরোগ ছাড়া কোনো বিশেষায়িত হাসপাতাল নেই চট্টগ্রামে। হৃদরোগ, ক্যান্সারের মতো বিস্তার লাভকারী রোগের চিকিৎসার ন্যূনতম সুবিধাও গড়ে ওঠেনি এখানে। ঢাকার ওপরই নির্ভর করতে হয় দেশের জনসংখ্যাবহুল বৃহত্তর চট্টগ্রামকে।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রয়েছে ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত রোগী। সিট না থাকায় রোগীদের রাখা হচ্ছে বারান্দায়। পর্যাপ্ত ডাক্তার ও সুযোগ-সুবিধা না থাকায় হাজার হাজার রোগীকে কার্যকর চিকিৎসা সুবিধা দিতে পারছে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। যার কারণে বেশিরভাগ মানুষকে বেসরকারি হাসপাতালে বাধ্য হয়ে নিতে হচ্ছে চিকিৎসা সেবা। তবে অনুমোদন না থাকা এবং মানহীন ব্যবস্থাপনার কারণে অনেক বেসরকারি হাসপাতালে প্রতারিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। এরই মধ্যে প্রশাসনের অভিযানে অনিয়ম ধরা পড়েছে বেশ কয়েকটি নামকরা হাসপাতালেও। এসব হাসপাতালের কোনোটি অনুমোদন ছাড়াই পরিচালনা করছে আইসিইউ। কোনোটিতে নেই দক্ষ ল্যাব টেকনিশিয়ান। কোনো কোনো বেসরকারি হাসপাতালে রোগী এলেই সিসিইউ কিংবা আইসিউতে ভর্তি করানোর অভিযোগ আছে। চট্টগ্রামে আধুনিক ও উন্নতমানের হাসপাতাল নির্মাণে এতোদিন তেমন যোগ্য মানুষের আগ্রহও পরিলক্ষিত হয়নি। ফলে বিদেশি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার চট্টগ্রামে বসবাস করতে তেমন ইচ্ছুক বলে মনে হয়নি। একটা হাসপাতালে প্রত্যেক বিভাগে প্রতিদিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার না থাকলে সেই হাসপাতালের প্রতি রোগীদের আস্থা থাকে না।
সেই অবস্থায় বিশ্বমানের ‘ইম্পেরিয়াল হাসপাতাল’-এর প্রতিষ্ঠাকে চট্টগ্রামবাসী আশীর্বাদ হিসেবে মনে করছে। দক্ষ চিকিৎসক ও রোগীদের উন্নত চিকিৎসা দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে শুরু হওয়া এই হাসপাতালে অনেক সুযোগসুবিধার কথা আমরা অবগত হতে পেরেছি।
দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত সংবাদে জানানো হয়েছে, যে কোনো ধরনের ইনফেকশন নিয়ন্ত্রণ, রোগীদের নিরাপত্তা এবং কর্মীদের নিরাপত্তা-এই তিনটি জিনিসকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে হাসপাতালটি গড়ে তোলা হয়েছে। এখানে রয়েছে উন্নতমানের সার্বক্ষণিক ইমার্জেন্সি সেবা এবং কার্ডিয়াক, ট্রান্সপ্ল্যান্ট, নিউরো, অর্থোপেডিক ও গাইনি অবস্‌ ইত্যাদি সম্বলিত ১৪টি মডিউলার অপারেশান থিয়েটার; আছে ১৬টি নার্স স্টেশন ও ৬২টি কনস্যালটেন্ট রুম সম্বলিত বহির্বিভাগ এবং আধুনিক গুণগত মানসম্পন্ন ৬৪টি ক্রিটিকাল কেয়ার বেড; নবজাতকদের জন্য ৪৪ শয্যাবিশিষ্ট নিওনেটাল ইউনিট এবং ৮টি পেডিয়াট্রিক আই সি ইউ। রোগী ও তার সাথে আগত স্বজনদের জন্য হাসপাতাল পরিধির মাঝে থাকার সুব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আর্থিকভাবে অসচ্ছল রোগীদের জন্য ১০ শতাংশ শয্যা সংরক্ষিত আছে। হাসপাতালে ৮৮টি সিঙ্গেল, ৭৬টি ডাবল কেবিন, ৮টি পেডিয়াট্রিক আইসিইউ, রোগীর স্বজনদের থাকার জন্য ৪০টি রুম এবং ২৭১ জন থাকার ডরমেটরি রয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ডা. দেবী শেঠী বলেন, বাংলাদেশ থেকে আর একজন মানুষও যেন চিকিৎসার জন্য বিদেশে না যান সেই লক্ষ্যে আমার এখানে আসা। এটিই আমার মিশন। চিকিৎসার জন্য মানুষের বিদেশগামিতা কমাতে বাংলাদেশে ক্যান্সার ও হৃদরোগসহ বিভিন্ন রোগের আরো বেশি সংখ্যক বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি। ডা. দেবী শেঠী বলেন, ৩০/৪০ বছর আগে ভারতের বহু রোগী লন্ডনে গিয়ে চিকিৎসা নিতেন। লন্ডনের ক্লিনিকগুলো ভারতীয় রোগীতে ঠাসা থাকতো। এখন ভারতীয়রা আর লন্ডন যান না। ভারতীয়দের চিকিৎসা ভারতীয়রাই করেন। আমি চাই বাংলাদেশের রোগীদের চিকিৎসা বাংলাদেশেই হোক।
আমরাও তাঁর মতো প্রত্যাশা করি যে এখানকার মানুষ এখানে যথাযথ চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করুক। চাই, এখানকার চিকিৎসা ব্যবস্থা ও চিকিৎসকের ওপর আস্থা তৈরি হোক। চাই ‘ইম্পেরিয়াল হাসপাতাল’ চট্টগ্রামসহ দেশের মানুষের আশা পূরণে সচেষ্ট হোক।

x