চাল রফতানির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করুন

সোমবার , ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ at ৫:৩৪ পূর্বাহ্ণ

আমাদের দেশ কৃষি প্রধান উন্নয়নশীল দেশ। উন্নয়নশীল দেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানা কারণে ভর্তুকি দিতে হয় সরকারকে। এই ভর্তুকি দেওয়া হয় দেশের সাধারণ মানুষের স্বার্থে। তবে ভর্তুকি দেওয়ার আগে খতিয়ে দেখা উচিত ভর্তুকি যে ক্ষেত্রে দেওয়া হচ্ছে সেক্ষেত্রের মানুষ প্রদত্ত ভর্তুকিতে কতটা উপকৃত বা লাভবান হবে। সরকার গত সপ্তাহে চাল রফতানিতে ১৫ শতাংশ ভর্তুকি দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে। সরকার এমন একটা সময়ে চাল রফতানির ওপর ১৫ শতাংশ ভর্তুকি দেওয়ার ঘোষণা দিলো যখন চালের দাম বেড়েই চলেছে। এই ভর্তুকি সম্পর্কে সরকারের বক্তব্য হলো, এতে কৃষকরা ধানের উৎসাহজনক দাম পাবেন। সরকারের এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত হওয়া মুশকিল। চালের দাম বেশি থাকার পরও কৃষক যে কারণে ধানের দাম পাচ্ছে না, ঠিক সেই কারণেই রফতানির সুবিধাও পাবেন না। কারণ কৃষক সরাসরি ধান বা চাল রফতানি করেন না। রফতানি করেন ব্যবসায়ীরা অর্থাৎ মধ্য স্বত্বভোগীরা। রফতানিতে যে ভর্তুকি দেওয়া হবে সেটা তাদের পকেটেই যাবে। কৃষককে সেই কমদামেই ধান বিক্রি করতে হবে। মাঝখান দিয়ে চাল রফতানিতে প্রণোদনা অভ্যন্তরীণ বাজারকে আরো ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলবে বলে অতীত অভিজ্ঞতা বলে। এর আগেও সরকার কয়েক দফায় চাল রফতানির উদ্যোগ নিয়েছিল। তাতে স্থানীয় বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছিল। আসল কথা হলো, বাংলাদেশে চালের চাহিদা ও জোগান সম্পর্কিত প্রকৃত তথ্য মেলে না। তাই দেখা যায়, সরকার যে বছর চাল রফতানির উদ্যোগ নিয়েছে পরে চাল আমদানি করতে হয়েছে। তথ্য ও সিদ্ধান্তের অব্যবস্থাপনার কারণে ভোক্তা ও কৃষক উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বিগত সময়ে।
কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে কেনা ও বাজার তদারকির মাধ্যমে ভোক্তার কাছে ন্যায্য মূল্যে চাল পৌঁছে দেয়া এখানে সরকার যত দক্ষতা প্রদর্শন করতে পারবে বাজার ও তত দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হবে। সরকারকে কৃষিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ভর্তুকি দিতে হবে। সরকার বর্তমানে কৃষিতে বিনিয়োগ করছে যা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। খাদ্যশস্যের আমদানি ও রফতানি উভয় ক্ষেত্রেই আমাদের মুক্তচিন্তা নিয়ে নীতি প্রণয়ন করতে হবে। চাল উৎপাদন কম হলে আমরা আমদানি করব, উদ্বৃত্ত হলে করব রফতানি। পরিস্থিতি ভালোভাবে বিশ্লেষণ করেই গ্রহণ করতে হবে এ নীতি। কোন শ্রেণি বিশেষের চাপে পড়ে নয়। আমাদের কৃষকদের প্রতিরক্ষণের কথা সরকার না ভেবে চাল আমদানি অবারিত করে ভুল করেছিল। তাতে উচ্চমূল্যের বিদেশি চাল এসে বাজার সয়লাব করে দিয়েছে। এখন ধান বিক্রি করতে না পেরে পথে বসেছেন দেশের খাদ্য উৎপাদনকারী কৃষক। আবার ব্যবসায়ীদের চাপে বর্তমান নিম্নমুখী আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যে চাল রফতানির দুয়ার উন্মুক্ত করে দিয়ে যেন ভবিষ্যতে আমাদের নিম্ন আয়ের ভোক্তাদের ব্যয় বাড়িয়ে না তুলি সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। প্রয়োজনে চাল আমরা রফতানি করতে পারি কিন্তু তা হতে পারে খুবই সীমিত পরিমাণে। আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের তুলনামূলক সুবিধা বিবেচনা করেই এ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনা ও সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে চাল মজুদ করে রাখা। প্রয়োজনে এক্ষেত্রে চালকল মালিক ও ব্যবসায়ীদের সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা দিয়ে কৃষকদের কাছ থেকে ধান ক্রয়ে উদ্বুদ্ধ করা যেতে পারে। গত কয়েক বছরের হিসাব করলে দেখা যায় চাল উৎপাদন যে খুব বেড়েছে তা নয় । আমরা প্রচুর চাল আমদানি করেছি। এছাড়া চাল রফতানির ফলে যে দাম বেড়েছে তাতে কৃষক উপকৃত হননি। কারণ তারা ঋণ করে ধান উৎপাদন করে তখনই বিক্রি করে দেন। চাল রফতানি শুরু হয় দুমাস পর এ সুবিধা পান বড় কৃষক ও চালকল মালিকরা। তাই কৃষককে সুবিধা দেওয়ার নামে রফতানি করে চালের দাম বাড়ানোর যুক্তিটা সঠিক নয়। দেশে চালের উৎপাদন এখনও স্থিতিশীল জায়গায় পৌঁছেনি। কোন বছর উৎপাদন বেড়েছে কোন বছর কমেছে। এমন অস্থিতিশীল অবস্থার কথা বিবেচনা করে আমরা আশা করি চাল রফতানির সিদ্ধান্তটি পরিত্যাগ করবে বা স্থগিত করবে।

x