চার দশকে চট্টগ্রামে ছাত্র রাজনীতির বলী ৫০ জন

মোরশেদ তালুকদার

বৃহস্পতিবার , ১০ অক্টোবর, ২০১৯ at ৫:০৮ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রামে গত চার দশকে অন্তত ৫০ জন ছাত্র রাজনীতির বলী হয়েছেন। যারা প্রাণ হারিয়েছেন প্রতিপক্ষের হামলায়। নিহতদের সবাই দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগী ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মী। তবে নিহতদের বেশিরভাগই আওয়ামী লীগের সহযোগী ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ এবং বিএনপি’র ছাত্রদলের নেতাকর্মী। এর বাইরে জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ছাত্রশিবির এবং ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী রয়েছেন।
ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, প্রত্যেকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে। এইক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের ওপর আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা যেমন ছিল তেমনি নিজ সংগঠনের অন্য নেতাকর্মীদের সঙ্গে আভ্যন্তরীণ বিরোধও ছিল। এছাড়া ভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতি অশ্রদ্ধা থেকেও কয়েকটি হত্যাকাণ্ড হয়েছে। অভিযোগ আছে, রাজনৈতিক সহিংসতার জন্য দায়ীদের শাস্তি না হওয়ায় বারবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি প্রফেসর জাকির হোসেন দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘বর্তমানে ছাত্ররা যা করছেন সেটাকে ছাত্র রাজনীতি বলা যাবে না। মূলত জাতীয় রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি ও নেতাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।’
চট্টগ্রাম মহানগর : ১৯৮১ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সিটি কলেজ ছাত্রলীগ নেতা তবারক হোসেন ও ১৯৮৪ সালের ২৮ মে ছাত্র ইউনিয়নের চট্টগ্রাম জেলা নেতা শাহাদাত হোসেনকে হত্যা করে ছাত্র শিবিরের কর্মীরা। ২০০০ সালে গর্ভমেন্ট কমার্শিয়াল কলেজের ভিপি হেলাল ও জিএস সোহেল খুন হন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে কমার্স কলেজ ছাত্রলীগের মুবিন ও কুদ্দস, চট্টগ্রাম টেকনিক্যাল কলেজে ছাত্রলীগের বিপুল সাহা খুন হন প্রতিপক্ষের হাতে। ২০১৮ সালে নগরীর পাহাড়তলীতে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের উপ-প্রচার সম্পাদক মহিউদ্দিন সোহেল, ২০১৭ সালের ৬ অক্টোবর নগর ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক সুদীপ্ত বিশ্বাস প্রতিপক্ষের হাতে খুন হন।
২০১৮ সালের পুলিশের ধাওয়া খেয়ে পালানোর সময় নগরে মারা যায় এক ছাত্রদল কর্মী। এছাড়া ১৯৯৬ সালে প্রবর্তক মোড়ে ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক আপেল, ১৯৯৫ সালে জাহাঙ্গীর ও ফরিদ, ১৯৯০ সালে শাহ মোয়াজ্জেম মিঠু, ১৯৯৩ সালে মিজান ও বোরহান প্রতিপক্ষের হাতে খুন হয়েছিলেন। ২০১৬ সালের ২৯ মার্চ নগর ছাত্রলীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএ (মার্কেটিং) শেষ বর্ষের ছাত্র নাছিম আহমেদ সোহেল ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে নিহত হয়েছিলেন। ১৯৯৬ সালে ছাত্রদলের কর্মী নিটোল খুন হন নগরীর কোতোয়ালী থানার গুডস হিলের সামনে।
অভিযোগ আছে, ২০১১ সালের ১৯ অক্টোবর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ছাত্রদল কর্মী ও ডেন্টাল বিভাগের চর্তুথ বর্ষের ছাত্র আবিদুর রহমানকে ছাত্রলীগের কর্মীরা ধরে নিয়ে ছাত্রসংসদে আটকে রাখে। সেখানে তাকে মারধর করে আহত করা হয়। এর দুইদিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় আবিদ। এ ঘটনায় চমেকে একবছর ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি’র সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘বুয়েটের আবরারকে যেভাবে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেলের আবিদকেও একই স্টাইলে খুন করা হয়েছিল।’ ২০১১ সালের জুলাইয়ে নগরীর পাহাড়তলীতে জাহেদ নামে এক ছাত্রদল কর্মী খুন হন।
উত্তর ও দক্ষিণ জেলা : ২০১৮ সালের মার্চ মাসে হাটহাজারীতে সোহেল রানা নামে এক ছাত্রদল কর্মীকে প্রতিপক্ষ ইট দিয়ে থেতলিয়ে খুন করে বলে অভিযোগ আছে। ২০১৭ সালের এপ্রিলে চকবাজারস্থ বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হওয়া কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহ-সম্পাদক নুরুল আলম নুরুকে। এর ১২ ঘণ্টা পর তার লাশ পাওয়া যায় রাউজান উপজেলার বাগোয়ান ইউনিয়নের খেলারঘাট এলাকায়।
১৯৯৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর রাউজানের কমলারদীঘি পাড় এলাকায় খুন হন উত্তর জেলা ছাত্রলীগ নেতা ইকবাল হোসেন ও ছাত্রলীগ কর্মী জামিল। এর আগে ১৯৮৯ সালের ৫ এপ্রিল চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ফখরুদ্দিন মোহাম্মদ বাবর ও রাউজান কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি মুজিবুর রহমানকে রাউজানের হলদিয়া ইউনিয়নের আমিরহাটে খুন করা হয়।
এছাড়া বিভিন্ন সময় রাউজনে প্রতিপক্ষের হামলায় খুন হন ছাত্রলীগ কর্মী এমদাদ, শফিউল আলম, টিটু-বিটু, রফিক, আসলাম ও রাউজান কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি ফারুক। এর মধ্যে টিটু ও বিটুকে একটি মেহেদি অনুষ্ঠানে ব্রাশফায়ার করে এবং ফারুক ডিগ্রি পরীক্ষা দিয়ে বের হওয়ার সময় গুলি করে খুন করা হয়।
২০১৩ সালের ৪ জানুয়ারি নগরীর আন্দরকিল্লাস্থ দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে সংগঠনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে হামলার শিকার হন দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের তৎকালীন আহ্বায়ক আবদুল মালেক জনি। এর চারদিন পর ৮ জানুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান জনি। আভ্যন্তরীণ বিরোধের জের ধরে হামলার শিকার হন তিনি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় : প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ২১টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠনগুলো এ হত্যাকাণ্ড ঘটায়।
জানা গেছে, ২০১৬ সালের ২০ নভেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২নং গেটসংলগ্ন নিজ বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক দিয়াজ ইরফান চৌধুরীর মরদেহ। দুই দফা ময়নাতদন্তের পর জানা গেল, দিয়াজকে হত্যা করা হয়েছে। ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি ছাত্রলীগের সাথে সংঘর্ষ চলাকালে প্রাণ হারায় শাহ আমানত হলের ছাত্র শিবিরের সাধারণ সম্পাদক এবং মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র মামুন হোসেন। একইবছরের ১৪ ডিসেম্বর ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান ছাত্রলীগ কর্মী তাপস সরকার।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম রাজনৈতিক সহিংসতা ঘটে ১৯৮৬ সালে। ওই বছরের ২৬ নভেম্বর বিকেলে সোহরাওয়ার্দী হলের সামনে এরশাদ সমর্থিত জাতীয় ছাত্র সমাজের নেতা আবদুল হামিদের ওপর হামলা করে ছাত্রশিবির কর্মীরা। কেটে ফেলা হয় তার হাতের কব্জি। কাটা কব্জি নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে মিছিলও করেছিল ছাত্রশিবিরের কর্মীরা। এরপর ১৯৮৮ সালের ২৮ এপ্রিল নগরীর বটতলী স্টেশনে শিবিরের সঙ্গে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের সংঘর্ষ হয়। একপর্যায়ে উভয় দলের পাল্টাপাল্টি গুলিতে পরিসংখ্যান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আমিনুল হক প্রাণ হারান। পরে আমিনুলকে ছাত্রশিবির ও ছাত্রঐক্য নিজ নিজ দলের কর্মী বলে দাবি করেছিলেন।
পরবর্তীতে ১৯৯০ সালের ২২ ডিসেম্বর শিবিরের সঙ্গে সংঘর্ষে গুরুতর আহত হন ছাত্রমৈত্রীর কর্মী ফারুকউজ্জামান। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৪ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে (চমেক) তিনি মারা যান। ১৯৯৪ সালের ২৯ অক্টোবর ক্যাম্পাস সংলগ্ন রেলস্টেশন মাজারের কাছে শিবির ক্যাডারদের হাতে নিহত হন ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক নুরুল হুদা মুছা।
১৯৯৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রিত মোজাম্মেল কটেজে হামলা চালায় শিবির কর্মীরা। ওই সময় ছাত্রলীগ কর্মী সন্দেহে আবৃত্তিকার বকুলকে শিবির কর্মীরা হত্যা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ১৯৯৮ সালের ৬ মে শাহ আমানত হলে আক্রমণ চালায় শিবির কর্মীরা। এ সময় আমানত হলের ৪শ’ ১৯ নম্বর কক্ষে অবস্থান করছিলেন বরিশাল থেকে ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসা আইয়ুব। আইয়ুবকেও ছাত্রলীগ কর্মী সন্দেহে শিবির কর্মীরা হত্যা করার অভিযোগ রয়েছে।
১৯৯৮ সালের ১৮মে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল শিবিরের অবরোধ কর্মসূচি। এ দিন বালুছড়া এলাকায় শহরগামী একটি শিক্ষক বাস লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ে শিবির কর্মীরা। গুলিতে প্রাণ হারান চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র মুশফিক-উস-সালেহীন। ১৯৯৮ সালের ২১ আগস্ট পুরাতন বটতলী স্টেশন এলাকায় ছাত্রশিবির-ছাত্রলীগ কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ চলছিল। এ সময় ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র সঞ্জয় তলাপাত্র নিহত হন। ২০০১ সালের ২৯ ডিসেম্বর ক্যাম্পাসের বাইরে ফতেয়াবাদ এলাকায় ছাত্রশিবিরের ব্রাশফায়ারে নিহত হন ছাত্রলীগের নেতা আলী মর্তুজা।
বিভিন্ন সময়ে মারা যায় শিবির কর্মীরাও। এরমধ্যে ১৯৮৮ সালে আইনুল হক নামে শিবিরের এক কর্মী নিখোঁজ হন। পরে ছাত্রলীগ নেতারা তাকে হত্যা করে লাশ গুম করেছে বলে অভিযোগ করে থানায় মামলা দেয় শিবির। ১৯৯৯ সালের ১৫ মে ছাত্রশিবির কর্মী জোবায়েরকে ফরেস্ট্রি ছাত্রাবাসের পিছনে নিয়ে গিয়ে ছাত্রলীগ কর্মীরা গুলি করে হত্যা করে বলে অভিযোগ উঠে। একইবছর ১৯ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দী হল দখলে হামলা চালায় ছাত্রলীগ কর্মীরা। এসময় মাহমুদুল হাসান ও মো. রহিমুদ্দিন নামে ছাত্র শিবিরের দুই কর্মী মারা যান। ২০১২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ছাত্রলীগ এবং ছাত্র শিবিরের মধ্যকার সংঘর্ষে প্রাণ হারান ছাত্র শিবিরের সোহরাওয়ার্দী হল সাধারণ সম্পাদক মাসুদ বিন হাবিব ও জীব বিজ্ঞান অনুষদের প্রচার সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম। এছাড়া ১৯৯৮ সালের ২৪ মে অসতর্কাবস্থায় নিজ গুলিতে প্রাণ হারান ছাত্রলীগ কর্মী ও পরিসংখ্যান বিভাগের স্নাতকোত্তর শেষ বর্ষের ছাত্র সাইফুর রহমান।

x