চার উপজেলায় বিশেষ নজর

নিরাপত্তার চাদরে চট্টগ্রাম, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র নেই আছে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ ও ‘বিশেষ কেন্দ্র’

হাসান আকবর

রবিবার , ৩০ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ৫:৩৬ পূর্বাহ্ণ
190

নিরাপত্তা বলয়ে ঘেরা চট্টগ্রামের কোন ভোটকেন্দ্রকেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখছে না প্রশাসন। তবে এক হাজারেরও বেশি কেন্দ্রকে ‘গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। উপকূলীয় এলাকার কেন্দ্রগুলোকে বলা হচ্ছে ‘বিশেষ কেন্দ্র’। এই দুই ক্যাটাগরির বাইরের তিন শতাধিক কেন্দ্রকে বলা হচ্ছে সাধারণ কেন্দ্র। গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ ও সাধারণ কেন্দ্রের নিরাপত্তায় বেশ গোছানো পরিবর্তন করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভোটারদের নির্বিঘ্নে ও উৎসবের মেজাজে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। বলা হচ্ছে, পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পুরো চট্টগ্রামই বিশেষ চাদরে ঢাকা। এই চাদর ভেদ করে কোন সন্ত্রাসী গ্রুপ পার পাবে না। অবশ্য প্রশাসনের এমন আশ্বাসের পরও চট্টগ্রামের সরকারি স্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্রগুলোর ইমার্জেন্সিতে লোকবল তিনগুণ বাড়ানো হয়েছে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ফায়ার সার্ভিসের আট শতাধিক সদস্যকে সরাসরি নির্বাচনী মাঠে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের ১৬টি আসনে প্রায় সাড়ে ৫৬ লাখ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ ও নগর পুলিশের আওতাধীন ১ হাজার ৮৯৯টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১ হাজার ৩২টি কেন্দ্রকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ এবং দ্বীপাঞ্চলের ৭৯টি কেন্দ্রকে বিশেষ কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিগত সংসদ নির্বাচনসহ বিভিন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময় ব্যালট পেপার ছিনতাই, কেন্দ্র দখল, হামলা, সংঘাত ও সহিংসতার বিষয়টি মাথায় রেখে চট্টগ্রামের ভোট কেন্দ্রগুলোকে তিনটি পৃথক ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে জেলার সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, বাঁশখালী এবং সীতাকুণ্ডের কেন্দ্রগুলোকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া প্রশাসনের বিশেষ নজরদারিতে রয়েছে উক্ত চার উপজেলা। পুলিশ এসব কেন্দ্রকে তাদের তালিকায় গুরুত্বপূর্ণ বললেও কার্যত: কেন্দ্রগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে বিশেষ নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। এর বাইরে দ্বীপাঞ্চলের কেন্দ্রগুলোতে নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড সদস্যদের সহায়তায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। এর বাইরে চট্টগ্রামে মাত্র ৩৯১টি কেন্দ্রকে সাধারণ কেন্দ্র এবং ঝুঁকিমুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, সাতকানিয়া থানা এলাকায় ৮৮টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৬৬টি কেন্দ্রই গুরুত্বপূর্ণ। এই থানা এলাকায় সাধারণ কেন্দ্র রয়েছে ২২টি। লোহাগাড়া থানাধীন ৫৯টি কেন্দ্রের সবগুলোকেই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাঁশখালীর ১১০টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ৭৮টি ও সাধারণ ৩২টি । সীতাকুণ্ডের ৮০টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ৬৩টি ও সাধারণ কেন্দ্র রয়েছে ১৭টি। মিরসরাইয়ে ৩৪টি গুরুত্বপূর্ণ ও ১৫টি সাধারণ, জোরারগঞ্জে ৫২টি গুরুত্বপূর্ণ ও ৩টি সাধারণ, ফটিকছড়িতে ৭৮টি গুরুত্বপূর্ণ ও ৯টি সাধারণ, ভূজপুরে ৪৪টি গুরুত্বপূর্ণ ও ৫টি সাধারণ, সন্দ্বীপে ২৯টি গুরুত্বপূর্ণ ও ৫০টি সাধারণ, হাটহাজারীতে ৭৩টি গুরুত্বপূর্ণ ও ৩৩টি সাধারণ, রাউজানে ২১টি গুরুত্বপূর্ণ ও ৬৩টি সাধারণ, রাঙ্গুনিয়ায় ৬০টি গুরুত্বপূর্ণ ও ২৮টি সাধারণ, বোয়ালখালীতে ৪১টি গুরুত্বপূর্ণ ও ৩৬টি সাধারণ, পটিয়ায় ৪২টি গুরুত্বপূর্ণ ও ৬৯টি সাধারণ, আনোয়ারায় ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ ও ৩৪টি সাধারণ, চন্দনাইশে ৫৮টি গুরুত্বপূর্ণ ও ১০টি সাধারণ এবং আসন হিসেবে চন্দনাইশের সঙ্গে সংযুক্ত সাতকানিয়া উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের ৩৬টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ২৬টিকে গুরুত্বপূর্ণ ও ১০টিকে সাধারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। চট্টগ্রাম মহানগরীর তিনটি সংসদীয় আসনে ৫৯৭টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ২০০টি কেন্দ্রকে গুরুত্বপূর্ণ এবং বাকি ৩৯৭ কেন্দ্রকে সাধারণ কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
নগর পুলিশের তালিকায় নগরীর কোতোয়ালী থানাধীন ২৬টি গুরুত্বপূর্ণ ও ৪৫টি সাধারণ ভোটকেন্দ্র, চান্দগাঁও থানায় ২৫টি গুরুত্বপূর্ণ ও ৩৬টি সাধারণ কেন্দ্র, পাঁচলাইশ থানায় ২৪টি সাধারণ ও ৯টি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র,
চকবাজার থানায় ৭টি গুরুত্বপূর্ণ ও ১৩টি সাধারণ কেন্দ্র, বাকলিয়া এলাকায় ১১টি গুরুত্বপূর্ণ ও ২৮টি সাধারণ, বায়েজিদ বোস্তমী থানায় ১২টি গুরুত্বপূর্ণ ও ৩৭টি সাধারণ কেন্দ্র, সদরঘাট থানায় ৯টি গুরুত্বপূর্ণ ও ১৬টি সাধারণ কেন্দ্র,খুলশী থানায় ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ ও ২৪টি সাধারণ, হালিশহর থানায় ১০টি গুরুত্বপূর্ণ ও ২০টি সাধারণ কেন্দ্র, ডবলমুরিং থানায় ১৪টি গুরুত্বপূর্ণ ও ৩১টি সাধারণ কেন্দ্র, পাহাড়তলী থানায় ১১টি গুরুত্বপূর্ণ ও ১৫টি সাধারণ, আকবর শাহ থানায় পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ ও ১৩টি সাধারণ কেন্দ্র, বন্দর থানায় ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ ও ২৮টি সাধারণ, ইপিজেড থানায় ১২টি গুরুত্বপূর্ণ ও ২২টি সাধারণ কেন্দ্র, পতেঙ্গা থানায় ৫টি গুরুত্বপূর্ণ ও ১৯টি সাধারণ কেন্দ্র এবং কর্ণফুলী থানায় ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ ও ২৬টি সাধারণ ভোটকেন্দ্র চিহ্নিত করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা কেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। চট্টগ্রামের নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেছেন, চট্টগ্রামের ভোট কেন্দ্রগুলোকে ঘিরে পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। একটি কেন্দ্রকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করার আগে বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করা হয়েছে। ভৌগলিক অবস্থান, অতীত রেকর্ডসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে এসব কেন্দ্রে নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে।
জেলা পুলিশের প্রায় ৪হাজার সদস্য ১৩টি সংসদীয় আসনে দায়িত্ব পালন করবেন। চট্টগ্রাম নগরীর তিনটি সংসদীয় আসনে দায়িত্ব পালন করবেন ৪হাজারেরও বেশি সদস্য। নগরী ও জেলা ১৬টি সংসদীয় আসনে ৮ হাজারেরও বেশি পুলিশ সদস্যের বাইরে সেনা ও নৌবাহিনীর ১ হাজার ৪২৮ জন সদস্য দায়িত্ব পালনে মাঠে রয়েছেন। এর মধ্যে নগর ও জেলার ১৫টি আসনে ১ হাজার ৩২৭ জন সেনা সদস্য এবং সন্দ্বীপে ১০১ জন নৌ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। সন্দ্বীপে কোস্টগার্ডের ১৩৪ সদস্যও মাঠে রয়েছেন। চটগ্রামের ১৬টি আসনে ২১৩০ জন বিজিবি সদস্যও দায়িত্ব পালন করছেন।
সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, বিজিবি ছাড়াও ৪৬০ সদস্যের র‌্যাবের ৪৬টি টহল টিম মাঠে রয়েছেন। এর বাইরে প্রতিটি কেন্দ্রে ১২ জন আনসার ভিডিপি সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। এদের মধ্যে ৬ জন পুরুষ এবং ৬ জন মহিলা। আনসার ভিডিপি সদস্যদের মধ্যে দুইজনের কাছে অস্ত্র থাকবে।
পাঁচস্তরের মধ্যে প্রথম স্তরে একজন এএসআই, দুইজন কনস্টেবল ও ১০ জন আনসার ও গ্রাম পুলিশ থাকবে। দ্বিতীয় স্তরে একজন এসআই’র নেতৃত্বে মোবাইল টিম থাকবে প্রতিটি ইউনিয়ন ও পৌরসভাভিত্তিক। তৃতীয় স্তরে থাকবে পরিদর্শক, সহকারী পুলিশ সুপার ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপারদের সমন্বয়ে গঠিত স্ট্রাইকিং রিজার্ভ টিম ও তদারকি টিম। চতুর্থ স্তরে বিজিবি ও কোস্টগার্ড এবং পঞ্চম স্তরে সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনী টহলের দায়িত্বে থাকবে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার নুরে ই আলম মিনা বলেন, এত আয়োজনের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ বলতে কিছু নেই। আমরা কিছু কেন্দ্রকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে বিশেষ এ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করেছি। তিনি পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে কোন কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ বলার কোন মানে হয় না বলেও মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, আমরা যে কোন ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুত। জনগণ আনন্দের সাথে যাতে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন সেই ব্যবস্থা আমরা করেছি। নিরাপত্তা নিয়ে কোন ধরনের সংশয় ব্যক্ত করা না হলেও ভোটের দিন সম্ভাব্য নাশকতা, অগ্নিসংযোগ এবং সহিংসতার মতো ঘটনা তাৎক্ষণিক মোকাবেলায় চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের ৪৯টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অবস্থান নিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। দেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোন নির্বাচনে ফায়ার সার্ভিসকে অন্তর্ভুক্ত করে মাঠে নামানো হলো। চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের একজন কর্মকর্তা দৈনিক আজাদীকে বলেন, তাদের ৮ শতাধিক সদস্য প্রয়োজনীয় ইক্যুপমেন্টসহ মাঠে রয়েছেন। একইভাবে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ সরকারি হাসপাতালগুলোতে ব্যাপক প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেঙে কন্ট্রোলরুম খোলার পাশাপাশি জরুরি বিভাগে লোকবল তিনগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে।

x