চসিকের উন্নয়ন প্রকল্পে শুভংকরের ফাঁকি!

হাসান আকবর

বুধবার , ২০ নভেম্বর, ২০১৯ at ৩:০৫ পূর্বাহ্ণ
1570

কাজ করেন ঠিকাদার। বুঝে নেন প্রকৌশলী। কী কাজ করলেন আর কী বুঝে নিলেন তা জানেন না সংশ্লিষ্ট কাউন্সিলর। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার এবং মাঠ পর্যায়ের প্রকৌশলী মিলে যেভাবে রিপোর্ট তৈরি করেন সেভাবেই বিল উত্তোলন এবং টাকার ভাগ বাঁটোয়ারা হয়।
এভাবে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) উন্নয়ন কার্যক্রমে কোটি কোটি টাকা লোপাট হয় বলে অভিযোগ একাধিক কাউন্সিলরের। তারা বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পের বিল অব কোয়ান্টিটি (বিওকিউ) কাউন্সিলরদের না দেয়ায় প্রতিটি প্রকল্পেই শুভংকরের ফাঁকি দেয়া হচ্ছে।
তবে সিটি মেয়র বিষয়টি অস্বীকার করে বলেছেন, এভাবে ঢালাও কথা বলে লাভ নেই। সুনির্দিষ্ট কোনো প্রকল্পের ব্যাপারে কেউ বললে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।
সূত্র বলেছে, প্রতি বছর বড় ধরনের কাজ বাদ দিলেও চসিক নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে অন্তত ৪শ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ পরিচালনা করে। বিশেষ করে রাস্তাঘাট, নালা, ড্রেন প্রভৃতিতে এ টাকা ব্যয় করা হয়। নগরীতে বর্তমানে ৮১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ১৩৭৩টি সড়ক রয়েছে। এগুলোর গড় প্রস্ত ৯.২০ মিটার। বর্তমান সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন ২০১৫ সালের ২৫ জুলাই থেকে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এই সময়ের মধ্যে ২৫৬ কিলোমিটার লম্বা ৩১৭টি পিচ ঢালা রাস্তা বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রস্থ বৃদ্ধি করা হয়েছে ২.১১৮ মিটার।
নগরীতে ৩২৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ১৩১০টি কংক্রিটের রাস্তা রয়েছে। এগুলোর গড় প্রস্থ ৩.৫৫ মিটার। বর্তমান মেয়রের সময়কালে ১০৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ২৫৫টি কংক্রিটের রাস্তা বেড়েছে। এই রাস্তার দৈর্ঘ্য বেড়েছে ০.১৫ মিটার। বর্তমানে ব্রিক সলিং সড়ক রয়েছে ১৭৩টি। বর্তমান মেয়রের সময়কালে ব্রিক সলিং রাস্তার সংখ্যা ১৮৬টি কমেছে। দৈর্ঘ্য কমেছে ৫২.৯৩ কিলোমিটার।
নগরে ১৪৬.০৭ কিলোমিটার লম্বা ১৪৪টি ফুটপাত রয়েছে। বর্তমান মেয়রের আমলে ২৬টি রাস্তায় ১৩১.৯৩ কিলোমিটার ফুটপাত বেড়েছে। পাকা ড্রেন রয়েছে ৯৪৬. ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ। বর্তমান মেয়রের আমলে ড্রেন বেড়েছে ২৬২.৯৫ কিলোমিটার। রিটেইনিং ওয়াল রয়েছে ৯৯ কিলোমিটার। এই মেয়রের আমলে রিটেইনিং ওয়াল ১৮.৮ কিলোমিটার বেড়েছে। মোট ব্রিজ রয়েছে ২১৯টি। এই মেয়রের আমলে ব্রিজ বেড়েছে ৩১টি। কালভার্ট রয়েছে ১০৪৮টি। বর্তমান মেয়রের সময়কালে বেড়েছে ১১৬টি কালভার্ট। এভাবে রাস্তা, ড্রেন, খাল, রিটেইনিং ওয়াল, ব্রিজ, কালভার্ট, ফুটপাতসহ শত শত কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ পরিচালিত হচ্ছে।
একাধিক কাউন্সিলর বলেছেন, প্রতিটি ওয়ার্ডের জন্য উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। প্রকল্প গ্রহণ থেকে শুরু করে সব কাজই করা হয় প্রকৌশল বিভাগ থেকে। টাকা বরাদ্দ থেকে বিল প্রদান পর্যন্ত কাজ চলে সিটি কর্পোরেশনে। প্রতিটি প্রকল্পের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের বলা হয়। কিন্তু কোনো প্রকল্পের বিল অব কোয়ান্টিটি বা বিওকিউ প্রদান করা হয় না। এতে ওয়ার্ড কাউন্সিলরেরা শুধু জানেন, আগ্রাবাদের বেপারিপাড়া মসজিদ গলিতে কিংবা আন্দরকিল্লা কমিশনার গলিতে পিচ ঢালাই করা হবে। এই কাজ কোন ঠিকাদার করবেন সেই তথ্যও কাউন্সিলররা জানেন না। এই রাস্তার ঢালাই কাজে কী পরিমাণ ঢালাই দেয়া হবে, রাস্তার দৈর্ঘ্য বা প্রস্থ কত, ম্যাকাডম করা হবে কিনা, ইত্যাদির তথ্য কাউন্সিলরের কাছে দেয়া হয় না।
এতে করে কতটুকু কাজের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়েছে তা কাউন্সিলরের জানা থাকে না। শুধু কোন প্রকল্পের কাজ এবং কত টাকার কাজ এটুকু তারা জানেন। কাজ করেন ঠিকাদার। কাজ বুঝে নেন প্রকৌশলী। কী কাজ করলেন আর কী বুঝে নিলেন তা সংশ্লিষ্ট কাউন্সিলর জানেন না। জানেন না এলাকার কেউ। এতে করে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার এবং মাঠ পর্যায়ের প্রকৌশলী মিলে যেভাবে রিপোর্ট তৈরি করেন সেভাবেই বিল উত্তোলন এবং টাকার ভাগ বাঁটোয়ারা হয় বলে একাধিক কাউন্সিলর জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট একজন কাউন্সিলর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদেরকে যদি উন্নয়ন প্রকল্পের বিওকিউ সরবরাহ করা হতো তাহলে প্রকল্পের কাজটি পুরোপুরি জানতে পারতাম। কত ফুটের কাজ, কী পরিমাণ ঢালাই হবে, কিংবা কত ইঞ্চি গাঁথুনি দিয়ে ওয়াল করা হবে, কত ইঞ্চি ঢালাই দিয়ে নালা নির্মাণ করা হবে, কত ফুট গভীর থেকে ওয়াল তোলা হবে ইত্যাদি জানা থাকলে কাজ তদারকি করতে পারতাম। কোথাও কাজ কম হলে বাড়তি করিয়ে নিতে পারতাম। কোনো রাস্তায় সারপ্লাস বরাদ্দ থাকলে তা পাশের কোনো গলিতে ব্যবহার করতে পারতাম। অথচ আমরা কিছুই জানি না।
তিনি বলেন, প্রতিটি প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ করে একটি বোর্ডে প্রদর্শন করার সুযোগ থাকলেও নগরীর কোনো প্রকল্পে তা করা হয় না। ঠিকাদার এবং প্রকৌশলীরা যেভাবে ইচ্ছে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে কাজ করে চলে যাচ্ছেন। এতে কোটি কোটি টাকার লুটপাট চলছে বলে অভিযোগ করে তিনি বলেন, বিভিন্ন প্রকল্পের ৭০ শতাংশ কাজও হয় না। বাকি টাকার হরিলুট চলে। তিনি বলেন, মেয়র মহোদয় অনেকবার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সিন্ডিকেটের কারণে তাঁর উদ্যোগ সফল হয়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অপর একজন কাউন্সিলর বলেন, বিষয়টি এত প্রকাশ্যে ঘটছে যে, কারো যেন কিছু করার নেই। আমাদের চোখের সামনে হরিলুট হচ্ছে। আমরা দেখছি। যতটুকু পারি চেপে-চুপে আদায় করি। কিন্তু পুরো কাজ আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না। আবার যত টাকা বরাদ্দ দেয়া হয় তার থেকে অনেক কম টাকায় ওই প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব। নানাভাবে অর্থ লোপাট করা হচ্ছে।
তবে সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, এভাবে ঢালাও কথা বলে লাভ নেই। সুনির্দিষ্ট কোনো প্রকল্পের ব্যাপারে কেউ বললে আমরা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। তিনি বলেন, নগরীতে বিভিন্ন ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। এডিবির প্রকল্পের পাশাপাশি জাইকার প্রকল্প হচ্ছে। আমরাও কিছু কিছু প্রকল্প করছি। আমাদের প্রতিটি প্রকল্পের ব্যাপারে সবকিছু দিবালোকের মতো পরিষ্কার। কোন প্রকল্পের কি কাজ তা পরিষ্কারভাবেই সিডিউলে উল্লেখ থাকে। টেন্ডার করা হয়। কাজ বুঝে নিয়ে সেই কাজের হিসেব করে বিল দেয়া হয়। আমাদের নিজস্ব অডিট আছে। মন্ত্রণালয়ের অডিট আছে। কেউ ইচ্ছে করলে যেভাবে ইচ্ছে সেভাবে প্রকল্পের কাজ করে টাকা নিয়ে যাবে, তা হয় না।
সিটি মেয়র বলেন, কাউন্সিলরদের বিস্তারিত দেয়া হয় না-এ কথাও ঠিক নয়। উনারা চাইলে সবই দেখতে পারেন। শুধু কাউন্সিলর কেন, যেকোনো নাগরিকই সব দেখতে পারেন। সব তথ্যই আমাদের কাছে থাকে।
তিনি বলেন, আমাদের সব উন্নয়ন কার্যক্রম যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হয়। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে আমি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সততার ব্যাপারে কোনো কম্প্রোমাইজ করিনি, করব না।

x