চলতি মাসেই বে-টার্মিনাল নির্মাণ কাজ শুরু

প্রাথমিক নির্মাণ করা হবে ইয়ার্ড ও ট্রাক টার্মিনাল চাপ কমবে বন্দরে আসা ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের এয়ারপোর্ট রোডের যানজটও কমার আশা

হাসান আকবর

মঙ্গলবার , ২ অক্টোবর, ২০১৮ at ৬:২২ পূর্বাহ্ণ
164

চট্টগ্রাম বন্দরের বহুল প্রত্যাশার বে-টার্মিনাল প্রকল্পের নির্মাণ কাজ শীঘ্রই শুরু হতে যাচ্ছে। চলতি মাসের শেষার্ধে অর্থ্যাৎ ১৫ তারিখের পর এই প্রকল্প উদ্বোধন প্রক্রিয়া শুরু করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রামে এসে এর উদ্বোধন করবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর দফতরে যোগাযোগ করেছে। শুরুতে ইয়ার্ড এবং ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণ করে বিদ্যমান বন্দরের বেশ কিছু কার্যক্রম বে-টার্মিনালে সরিয়ে নেওয়া হবে।
পণ্যের নিরাপত্তা এবং পরিবহনসহ বহুমুখী সুবিধার ফলে বিশ্বব্যাপী কন্টেনারে পণ্য পরিবহন আগের তুলনায় বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেনার হ্যান্ডলিং এর গড় প্রবৃদ্ধি ১৬ শতাংশ। গত অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দরে ২৮ লাখ ৮ হাজার ৫৫৪ টিইইউএস কন্টেনার হ্যান্ডলিং হয়েছে। বিদ্যমান প্রবৃদ্ধি এবং চলমান ধারা অব্যাহত থাকলে মাত্র বছর তিনেকের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরকে ধারণক্ষমতার চেয়ে ১০ লাখ ৫০ হাজার টিইইউএস কন্টেনার বেশি হ্যান্ডলিং করতে হবে। যা বর্তমান অবকাঠামোতে করা অনেকটাই অসম্ভব। ফলে বিষয়টি মাথায় রেখে ভবিষ্যতের বাড়তি চাপ সামলাতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ হালিশহর উপকূলে সাগরের বুকে জেগে উঠা চর এবং চ্যানেলে বে টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বে-টার্মিনাল নির্মাণে জার্মানির ‘শেলহর্ন এইচপিসি, কেএস, জেবি’ প্রতিষ্ঠানকে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিয়োগ দেয়। দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় পর প্রতিষ্ঠানটি বে-টার্মিনাল নিয়ে তাদের ফিজিবিলিটি স্টাডি রিপোর্ট প্রকাশ করে। রিপোর্টে বলা হয়, বে-টার্মিনাল দেশের আগামী একশ’ বছরের চাহিদা মেটাবে। পাশাপাশি এই বন্দর ডিপ সী-পোর্টের অভাবও ঘুচাবে। চট্টগ্রাম বন্দরের বহুমুখী সীমাবদ্ধতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত বে-টার্মিনাল দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
বিদেশী পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের রিপোর্ট পাওয়ার পর বন্দর কর্তৃপক্ষ টার্মিনালটি নির্মাণে ব্যাপক তৎপরতা শুরু করে। এ লক্ষ্যে হালিশহরের উপকূলে জেগে উঠা চর এবং চর সংলগ্ন ৯০৭ একর ভূমি প্রথামকিভাবে চিহ্নিত করা হয়। পরবর্তীতে এই টার্মিনালের বিস্তৃতি আরো বাড়ানোর সুযোগও রয়েছে। প্রথম দফায় চিহ্নিত ৯০৭ একর ভূমির মধ্যে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি রয়েছে ৬৮ একর। বাকি ৮৩৯ একর ভূমি সরকারি খাস জমি। বন্দর কর্তৃপক্ষ শুরু থেকে সরকারি খাস জমি বন্দোবস্তি পাওয়ার চেষ্টা করেছিল। তবে প্রক্রিয়াটিতে দীর্ঘ জটিলতা থাকায় পরবর্তীতে বন্দর কর্তৃপক্ষ সরকারি খাস জমি কিনে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। একই সাথে ব্যক্তি মালিকানাধীন ৬৮ একর ভূমিও হুকুম দখলের মাধ্যমে কিনে নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে। ইতোমধ্যে ব্যক্তি মালিকানাধীন ভূমির মূল্য জেলা প্রশাসনকে হস্তান্তর করা হয়। জেলা প্রশাসনও ভূমির দখল বন্দর কর্তৃপক্ষকে হস্তান্তর করে।
প্রাথমিক ভাবে ব্যক্তি মালিকানাধীন ৬৮ একর ভূমিতে বন্দর কর্তৃপক্ষ কন্টেনার ইয়ার্ড এবং ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণ কাজ শুরু করবে। আর এর মাধ্যমেই শুরু হবে বে-টার্মিনাল নির্মাণ কাজ। প্রথমে ইয়ার্ড এবং ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণ করা হলেও পরবর্তীতে জেটি নির্মাণের কাজ শুরু করা হবে। আগামী ১৫ অক্টোবরের পর সুবিধাজনক সময়ে বে-টার্মিনালের নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান কমডোর জুলফিকার আজিজ দৈনিক আজাদীকে বলেন, আমরা বে-টার্মিনাল নির্মাণ কাজ শুরু করছি। চলতি মাসের ১৫ তারিখের পর এই কাজের উদ্বোধন করা হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই প্রকল্পের উদ্বোধন করবেন বলে আশা করছি। তবে এখনো তাঁর সিডিউল পাওয়া যায়নি। তাই দিনক্ষণ ঠিক করতে পারিনি। প্রধানমন্ত্রীর সময় পাওয়ার পরই দিনক্ষণ ঠিক করা হবে বলে জানান বন্দর চেয়ারম্যান। তিনি আরো বলেন, শুরুতে ব্যক্তি মালিকানাধীন যেই ৬৮ একর ভূমি আমরা জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে হুকুম দখল করেছি সেখানে কাজ শুরু করব। এগুলো একেবারে নির্ভেজাল জমি। কোন বাড়িঘর নেই। নেই কোনো অবকাঠামো বা গাছপালা। এতে আমাদের বাড়তি কোনো ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে না। আমাদের সুবিধাজনক সময়ে আমরা কাজ শুরু করতে পারব।
বন্দর চেয়ারম্যান কমডোর জুলফিকার আজিজ বলেন, প্রথমে আমরা ইয়ার্ড নির্মাণ করব। একই সাথে নির্মাণ করা হবে ট্রাক টার্মিনালও। এর মধ্যে ইয়ার্ড নির্মিত হলে আমরা বন্দরের অভ্যন্তর থেকে এলসিএল কন্টেনার বে-টার্মিনালে নিয়ে যাব। ওখান থেকেই ডেলিভারি দেওয়া হবে। এতে বন্দরে দৈনিক যে ৫/৬ হাজার ট্রাক-কাভার্ডভ্যান প্রবেশ করে সেগুলোকে আর আসতে হবে না। ওগুলো ফৌজদারহাট টোল রোড ধরে চলাচল করবে। এতে বন্দরের ভেতরের কাজে যেমন শৃঙ্খলা ও গতি আসবে তেমনি বিমানবন্দর সড়কের যানজটও অনেকাংশে কমে যাবে। ফলে বে-টার্মিনাল পুরোপুরি নির্মিত হওয়ার আগেই আমরা এর সুফল পাব।
উল্লেখ্য, বে-টার্মিনালের দৈর্ঘ্য ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার এবং প্রস্থ প্রায় ৬০০ মিটার। বন্দর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বে-টার্মিনল বিদ্যমান চট্টগ্রাম বন্দর থেকে প্রায় তিনগুণ বড়। এই টার্মিনালে ১২ মিটার ড্রাফটের এবং যেকোনো দৈর্ঘের জাহাজ অনায়াসে ভিড়ানো যাবে। নতুন এই টার্মিনালে গড়ে পাঁচ হাজার টিইইউএস কন্টেনারবাহী একই সাথে ৩৫টি পর্যন্ত জাহাজ বার্থিং দেয়ার সুযোগ থাকবে। যেখানে চট্টগ্রাম বন্দরে দু’দফা জোয়ারের সময় মাত্র ঘণ্টা চারেক জাহাজ হ্যান্ডলিং করা যায়, সেখানে বে-টার্মিনালে রাত-দিন ২৪ ঘণ্টায় জাহাজ ভিড়ানো যাবে। বিদ্যামান চট্টগ্রাম বন্দরের বহুমুখী সীমাবদ্ধতা বে-টার্মিনালে থাকবে না বলেও মন্তব্য করেন বন্দর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

x