চবিতেও হোক ডে-কেয়ার সেন্টার

মাধব দীপ

শনিবার , ৯ নভেম্বর, ২০১৯ at ৫:২৭ পূর্বাহ্ণ
15

দীর্ঘদিন ধরেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র’ কিংবা ‘ডে-কেয়ার সেন্টার’ না থাকা নিয়ে লেখার কথা ভাবছি। নানা কারণে, হয়ে ওঠেনি। কিন্তু, গেলো সপ্তাহে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সহকর্মীর কাছ থেকে যা শুনলাম; এরপর মনে হলো এটার তীব্রতা কিংবা প্রয়োজনীয়তার বিষয়টা নিয়ে লেখা দরকার। এই লেখার ফলাফল কী হবে সেটা জানি না তবে আওয়াজ তো তোলা জরুরি। হয়তো কর্তৃপক্ষ এই লেখা পড়ে সেই উদ্যোগ নিতেও পারে।
সে যাই হোক, আমাদের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বিটের সাংবাদিকতা চর্চায় এই ‘ডে-কেয়ার সেন্টার’ না থাকার বিষয়টি নিয়ে কেন কেউ কখনো কলম ধরেনি জোরের সাথে- সেটি এখনো আমার কাছে বিরাট বিস্ময়! যদিও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন কম করে হলেও এমন শতাধিক নারী-সহকর্মী আমাদের রয়েছেন- যাঁরা শহর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরত্ব পাড়ি দিয়ে ক্যাম্পাসে প্রতিদিন যাতায়াত করছেন।
মাতৃত্ব যেখানে অধিকার সেখানে সেই অধিকার রক্ষার পথটা সুগম হবে কবে? আমি ব্যক্তিগতভাবে ২০১৭ সালের দিকে যখন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক ছিলাম তখন আমি ও আমার কিছু সম্মানিত সহকর্মী নিয়ে এ ব্যাপারে বেশ দেন-দরবার করেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাথে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি। আশ্বাস-প্রশ্বাসের মধ্যেই থেকে গেছে সব।
অথচ, আমরা সকলেই জানি- কতোটা ত্যাগ-তিতীক্ষার মধ্য দিয়ে একজন মা কীভাবে এই সমাজে তাঁর মাতৃত্ব ও পেশাগত দায়িত্ব যুগপৎ পালন করেন। একাধিক গবেষণায়ও দেখা গেছে- একজন মা কম করে হলেও আড়াইটা ফুল টাইম জবের সমান পরিশ্রম করেন এই সমাজে। এবং এই চিত্র পুরো পৃথিবীতে একই। এ কারণেই বলা হয়ে থাকে- নারীরা আসলে দশহাত নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন; যে হাতগুলোর কোনোটিই আমৃত্যু অবসরে যায় না।
মাস দুয়েক আগে পত্রিকায় এবং টেলিভিশনে দেখলাম- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদে একটি ‘ডে-কেয়ার সেন্টার’ চালু হয়েছে। সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক সাদেকা হালিম এ ব্যাপারে বলেন, ‘ডে-কেয়ার সেন্টার প্রতিষ্ঠায় আমার ব্যক্তিগত অনুপ্রেরণা আছে। তাছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক অনুপ্রেরণাও আছে। আমি সবসময় নারীর ক্ষমতায়নে কাজ করি এবং শিক্ষকতার মধ্য দিয়েও আমি অনুধাবন করতে পেরেছি যে, বর্তমান সমাজে একক পরিবারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। যৌথ পরিবারগুলো ভেঙে যাচ্ছে। বেশিরভাগ পরিবারেই পিতা-মাতা দুজনে কর্মজীবী। দুজনকেই কর্মক্ষেত্রে যেতে হচ্ছে। তখন তাদের মধ্যে টানাপোড়ানের সৃষ্টি হচ্ছে। তাদের বাচ্চাকে কে দেখবে। বর্তমানে পিতা-মাতারা আধুনিক; তাদের চাহিদাগুলোও আধুনিক। তারা সন্তানকে এমন একটি জায়গায় রেখে যেতে চায় যেখানে তারা নিরাপদে থাকবে’ (সূত্র: দৈনিক আমাদের সময়, প্রকাশকাল: ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯)।
এর আগে অবশ্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও দুটি ‘ডে-কেয়ার সেন্টার’ চালু করা হয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে এবং এবং অন্যটি ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদে। আরও একধাপ এগিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে নেওয়া হয়েছে আরও অভিনব উদ্যোগ। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ডে-কেয়ার সেন্টারে’ তো শিক্ষার্থীদের সন্তানদেরও ভর্তির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে ইতোমধ্যে। আগে যেখানে কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী সন্তানদের ভর্তির ব্যবস্থা ছিল। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডে-কেয়ার সেন্টারটিতে শিশুদের জন্য থাকা, খাওয়া, ঘুমানো, প্রাাথমিক চিকিৎসা ব্যবস্থা, খেলাধুলা, বিনোদন এবং প্রি-স্কুল সুবিধাসহ সব অত্যাধুনিক সুবিধা রয়েছে। এর জন্য অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি-ও নেওয়া হচ্ছে। হয়তো দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বা নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।
যখন এই সমাজে এখনও সন্তানের জ্বর হলে বা সন্তান অসুস্থ হলে মাকে-ই কর্মস্থল থেকে ছুটি নিতে হয়; যখন এই সমাজে পিতৃত্বকালীন ছুটি বলে কোনো ছুটি নেই; যখন এই সমাজে কোনো বাবাকে দেখিনি অসুস্থ কোনো সন্তানকে নিয়ে একান্ত বাধ্য হয়ে কর্মস্থলে গেছে- সেখানে এই কর্মজীবী মায়েদের জন্য ‘ডে-কেয়ার সেন্টার’-র উপযোগিতা কতোটুকু তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
উপরন্তু, বর্তমান সমাজ কাঠামোয় যেখানে একক পরিবারের সংখ্যা দিন-দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। শহরাঞ্চলের বেশিরভাগ পরিবারে যেখানে পিতা-মাতা দুজনেই কর্মজীবী; সেখানে শিশু সন্তানকে কার কাছে রেখে কাজে বের হবেন- কর্মজীবী বাবা-মায়ের কাছে সেটা আজ একটা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। পরিণতিতে, সন্তানদের স্বাস্থ্য সচেতনতা ও নিরাপত্তার দুশ্চিন্তায় ভোগা মায়েদের সংখ্যা এখন বাড়ছেই। বিশেষ করে, আমাদের নারী সহকর্মীরা যে পরিমাণ দুশ্চিন্তা পোহান সন্তানকে ঠিকমত খাবার খাওয়ানো নিয়ে সেটা তাঁর চেয়ে আর কে বেশি বোঝে? এই অবস্থায় কি একজন নারী সহকর্মীর পক্ষে সবসময় ঠিকমতো ক্লাস বা পরীক্ষা নেয়ায় পুরোপুরি মন বসানো সম্ভব হয়?
সবশেষে বলবো- চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য হিসেবে গত ৪ নভেম্বর যোগ দিয়েছেন অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতার ম্যাডাম। মানে একজন নারী এখন দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে বড় বিদ্যাপীঠের সর্বোচ্চ ব্যক্তি। এটা সুখ জাগানিয়া খবর। আমি বিশ্বাস করি- বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি অনুষদে ছোটো করে হলেও একটি করে ‘ডে-কেয়ার সেন্টার’ স্থাপন করে তিনি তাঁর নারী সহকর্মীদের মনে সবচেয়ে বেশি জায়গা করে নেবেন। এই প্রত্যাশায় রইলাম।

x