চন্দনাইশে শুক্লাম্ভর দিঘির মেলায় পুণ্যার্থীর ঢল

মুহাম্মদ এরশাদ, চন্দনাইশ

বৃহস্পতিবার , ১৬ জানুয়ারি, ২০২০ at ৫:৫১ পূর্বাহ্ণ

বিশাল দিঘির চার পাশে হাজার হাজার নর-নারী। দিঘির দক্ষিণ প্রান্তে বিশাল অশ্বত্থ গাছ। আর দিঘির জলে স্নান শেষে এই অশ্বত্থ গাছের ডালে বিভিন্ন রংয়ের সুতো বাঁধছেন শিশু থেকে শুরু করে যুবক-যুবতী, বয়স্ক পুরুষ-মহিলা সবাই। গতকাল ১৫ জানুয়ারি দিনব্যাপী এমন দৃশ্য দেখা গেছে চন্দনাইশের বাইনজুড়ির ঐতিহ্যবাহী শুক্লাম্বর দিঘির মেলায়। জনশ্রুতি আছে প্রায় সহস্রাধিক বছর আগে শুক্লাম্বর ভট্টাচার্য্য ত্রিপাঠি নামক এক সাধক ভারতের নদীয়া থেকে উপজেলার বরমার বাইনজুড়িতে আসেন। নির্জন এলাকায় তিনি নিজে অশ্বত্থের চারা রোপণ করে সেখানে শক্তির আরাধনা শুরু করেন। কঠোর আরাধনায় তিনি ত্রিপুরা দেবীর কৃপা লাভ করে সেই অশ্বত্থমূলেই সিদ্ধি লাভ করেন। পরবর্তীতে সেখানে খনন করেন বিশাল দীঘি, কালক্রমে যা শুক্লাম্বর দিঘি নামে পরিচিতি পায়। এই দিঘিকে ঘিরেই সনাতনী সমপ্রদায়ের লোকজনের বিশ্বাস যে কোন মনোবাসনা নিয়ে শুক্লাম্বর দিঘিতে পূণ্যস্নান করে অশ্বত্থ গাছের ডালে সুতো বাঁধলে মনোবাসনা পুরণ হয়। এ বিশ্বাসেই মানত নিয়ে পৌষ সংক্রান্তির এসময়ে লাখো পুণ্যার্থী পূণ্যস্নান করেন দিঘির জলে। পাশাপাশি শুক্লাম্বর ভট্টাচার্য্যের উদ্দেশে দিঘির জলে দুধ, বিভিন্ন রকমের ফল উৎসর্গ করেন। অশ্বত্থ গাছের ডালে সুতা বাঁধেন। এছাড়াও অসংখ্য পুণ্যার্থী নিয়ে আসেন ছাগল, হাজার হাজার কবুতর। উৎসর্গ করেন শুক্লাম্বর ভট্টাচার্য্যের উদ্দেশে। সনাতনী সম্প্রদায়ের লোকজন মনে করেন ধর্মগুরু শুক্লাম্বর ভট্টাচার্য্য ত্রিপাঠি এখনো এ দিঘিতে জাগ্রত আছেন। তাই তারা বিভিন্ন মানত নিয়ে প্রতিবছর এ মেলায় আসেন। তাদের বিশ্বাস এ দিঘিতে স্নান করলে পূণ্য অর্জন হয়। বিগত বছরের পাপ মোচন হয়।
এদিঘিকে ঘিরে বসে বিশাল মেলা। মেলায় পুরোনো জিনিসপত্রসহ প্রয়োজনীয় সকল প্রকার পণ্য পাওয়া যায়। সামুদ্রিক মাছও মেলায় নিয়ে আসেন বিক্রেতারা।
আনোয়ারা থেকে রূপশ্রী দাশ তার স্বামীকে নিয়ে এসেছেন দিঘীর জলে পূণ্যস্নান শেষে অশ্বত্থ গাছে রঙিন সুতো বাঁধতে। তিনি বলেন, খুব ভোরে সড়ক পথে এসে প্রথমে পূণ্যস্নান শেষ করেন এবং মনোবাসনা পূরণে দু’জনে একসাথেই রঙিন সুতো অশ্বত্থ গাছের ডালে বেঁধে দেন। তিনি আরো জানান, তাদের মনোবাসনা পুরণ হলে পরবর্তীতে মেলায় এসে সে সুতো খুলে দেবেন।
বাঁশখালী থেকে এসেছেন দশম শ্রেণির ছাত্রী প্রিয়াংকা দাশ। তিনি বলেন, শুনেছি শুক্লাম্বর দিঘির জলে পূণ্যস্নান করে মানত করে সুতো বেঁধে দিলে মনোবাসনা পূরণ হয়। তাই তিনিও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে এসেছেন তার একটি মানত নিয়ে।
সাতকানিয়া থেকে আসা মনোরঞ্জন দাশ নামে একজন জানালেন, তার ছেলের জেএসসি পরীক্ষা উপলক্ষে গত বছর দিঘির জলে পূণ্যস্নান শেষে পবিত্র অশ্বত্থ গাছে সুতো বেঁধে দিয়েছিলেন এবং পরীক্ষায় ভাল ফলাফল অর্জন করে। তাই এবছর আবার এসেছেন গত বছরের বেঁধে দেয়া সুতো খুলে দেয়ার উদ্দেশে। এভাবে দিনব্যাপী হাজার হাজার পুণ্যার্থী আসেন মনোবাসনা নিয়ে। তাদের পূজা অর্চনায় মুখরিত হয়ে উঠেছিল পুরো বাইনজুড়ি এলাকা।
জানা যায়, শত শত বছর ধরে সনাতনী সমপ্রদায়ের মহামিলন ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিবছর মাঘ মাসের প্রচণ্ড শীতকে উপেক্ষা করে এখানে বসে ঐতিহ্যবাহী শুক্লাম্বর দিঘির মেলা। মনোবাসনা পূরনের মেলা হিসেবে সনাতনী সমপ্রদায়ের লাখো পুণ্যার্থীর ঢল নামে এ মেলায়। এ উপলক্ষে গত ১৪ জানুয়ারি থেকে দূর-দূরান্তের দেশি-বিদেশিসহ লাখো ভক্ত গাড়ি ও পায়ে হেঁটে মানতের উদ্দেশে মেলায় আসেন। বিশেষ করে ভারত, নেপাল, ভুটান থেকে অসংখ্য পূণ্যার্থী আসেন বলে জানান পুজা উদযাপন পরিষদ নেতা অরূপ রতন চক্রবর্ত্তী। তিনি বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম তীর্থ স্থান এই শুক্লাম্বর দিঘীর মেলা। মেলায় শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীরাই নয়, আসেন আশপাশের মুসলিম, বৌদ্ধসহ সব ধর্মাবলম্বীর মানুষ। ফলে মেলাটি একটি সার্বজনীন মেলায় রূপ নেয়। এলাকার চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম মেলা কমিটির সভাপতি। এছাড়াও এলাকার মেম্বার, জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতায় প্রতিবছর মেলাটি শান্তিপূর্ণভাবে সমাপ্ত হয়। তিনি বলেন এ মেলায় প্রতিবছর ভক্তের সংখ্যা বাড়ছে। এবছর ৩ লাখেরও অধিক মানুষের সমাগম ঘটে এ মেলায়।
মেলার সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও নিরাপত্তায় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নেয়া হয় ব্যাপক ব্যবস্থা। চন্দনাইশ থানার পুলিশ ছাড়াও চট্টগ্রাম জেলা থেকে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। চন্দনাইশ থানার ওসি কেশব চক্রবর্তী বলেন, মেলা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে গত ১৪ জানুয়ারি থেকে পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেছেন। পুরো উপজেলায় পুলিশি টহল বাড়ানো হয়। ফলে কোন ধরনের বিশৃংখলা ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে ঐতিহ্যবাহী এ মেলা সম্পন্ন হয়। মেলা পরিদর্শন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আ.ন.ম বদরুদ্দোজা, উপজেলা আ.লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু আহমদ জুনু, পূজা পরিষদ নেতা অরূপ রতন চক্রবর্তী, ড. বিপ্লব গাঙ্গুলী, পরিমল দেব, হারাধন দেব, ভিজন ভট্টাচার্য্য, ডা. কাজল কান্তি বৈদ্য, নিপেন্দু দত্ত, বলরাম চক্রবর্তী, মাষ্টার আহসান ফারুক, মেম্বার অমর কান্তি ভট্টাচার্য্য, আবু জাফর, মধুসুদন দত্ত, পরিমল মহাজন, আশিষ দেব, কৃষ্ণ চক্রবর্ত্তী, প্রদীপ দেব, রাম প্রসাদ ভট্টাচার্য্য, বিপ্লব চৌধুরী, জাবেদ মো. গাউছ মিল্টন, আ.ক.ম. মোজাম্মেল হক, রুবেল দেব প্রমুখ। এদিকে মেলায় আগত পুণ্যার্থীদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন নজরুল ইসলাম চৌধুরী এমপি।

x