চন্দনপুরা রাজাকার ক্যাম্প অপারেশন

নাসিরুদ্দিন চৌধুরী

মঙ্গলবার , ১৪ জানুয়ারি, ২০২০ at ৫:২৬ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম শহরের মুক্তিযুদ্ধের একটি উল্লেখযোগ্য অপারেশন হলো চন্দনপুরা রাজাকার ক্যাম্প অপারেশন। এই অপারেশনটি করেছিলাম ৮নং এফএফ গ্রুপ কমান্ডার মাহবুব আর আমি। মাহবুব ছিলো অপারেশনের কমান্ডার। অপারেশনের তারিখ ১৮ নভেম্বর ’৭১। একাত্তর সালের জুন মাসে পূর্ব পাকিস্তানে রাজাকার অর্ডিন্যান্স ’৭১ জারি হয়। এই অর্ডিন্যান্স-এর ক্ষমতাবলে ১৯৫৮ সালের আনসার অ্যাক্ট বাতিল ঘোষণা করা হয়। আনসার ও মুজাহিদ বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করার কারণে সরকার নতুন করে আইন জারি করতে বাধ্য হয়। সেই আইন হলো রাজাকার আইন। সেই আইনে পূর্ব পাকিস্তানের সকল ব্যক্তিকে রাজাকার বাহিনীতে ভর্তি করে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অস্ত্রে সজ্জিত করা হবে বলে ঘোষণা দিলে জামায়াতে ইসলামী ও মুসলিম লীগের উগ্রপন্থী হানাদার দোসররা রাজাকার বাহিনীর জন্ম দেয়। চট্টগ্রামে রাজাকার বাহিনীর নেতা হয় চট্টগ্রাম কলেজের ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি এনামুল হক মঞ্জু (চকরিয়া নিবাসী, স্বাধীনতার পর নব্বইয়ের দশকে সে চকরিয়া থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলো)। তার তত্ত্বাবধানে চন্দনপুরায় একটি রাজাকার ক্যাম্প স্থাপিত হয়। এই ক্যাম্পের রাজাকাররা রাস্তায় একটি চেকপোস্ট বসিয়েছিল। শুধু চেকপোস্ট বসিয়ে তারা ক্ষান্ত হয়নি। রাস্তা থেকে সাধারণ মানুষদের ধরে ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে তাদের টাকা-পয়সা কেড়ে নিয়ে নিজেরা ভাগবাটোয়ারা করে নিতো। অক্টোবরের প্রথম দিকে তারা চন্দনপুরা মসজিদে মাইকের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের ঘোষণা প্রচার করতে থাকে। চন্দনপুরার রাজাকার ক্যাম্পের রাজাকারদের অত্যাচার চরমে উঠলে সেদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। এছাড়া প্রায় প্রতিদিন চন্দনপুরা অঞ্চল দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য পটিয়া থেকে অস্ত্র আসতো। রাজাকার বাহিনীর এ ক্যাম্পের কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র আনা-নেয়াতে অসুবিধা সৃষ্টি হয়েছিলো। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডাররা চিন্তিত হয়ে পড়লেন। এ অস্ত্র চট্টগ্রাম শহরে প্রবেশ করতে না পারলে অনেকগুলো অপারেশন বন্ধ হয়ে যাবে।
এ পরিস্থিতিতে চন্দনপুরা রাজাকার ক্যাম্প নিয়ে কি করা যায় সে সম্পর্কে আলোচনার জন্য বৈঠকে বসলেন ইঞ্জিনিয়ার আফছার উদ্দিন মো. আলী ও কাজী ইনামুল হক দানু। তারা বৈঠক করে মাহবুবকে ডেকে নেন এবং সিদ্ধান্ত হয় যে অপারেশনটি পরিচালনা করবেন ৮নং এফ এফ গ্রুপ কমান্ডার মাহবুব উল আলম। এই অপারেশনের জন্য মাহবুব পরদিন তার গ্রুপ নিয়ে আবার পৃথকভাবে গোপন বৈঠকে বসেন জয়নগর সেকান্দার আলীর বাসায়। বৈঠকে মাহবুবের সাথে ছিলেন সেকান্দার আলী, শান্তনু চক্রবর্তী, মোহাম্মদ হোসেন (বাবুইয়া) ও শাহ আলম। তখন রমজান মাস এবং ঈদের দু’চারদিন পূর্বে এ পরিকল্পনা হয়েছিলো। কোন সময় কীভাবে অপারেশনটা করলে সুবিধা হবে সে ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা হয়। আলোচনায় তারা সিদ্ধান্ত নিলেন যে, ইফতারের সময় আক্রমণ হবে এবং মোহাম্মদ হোসেন বাবুইয়া অপারেশনে যাওয়ার জন্য ট্যাঙি চালাবে।
আমি তখন ঘাটফরহাদবেগে মাহবুবের বাসায় ছিলাম। মাহবুবের কাছে অপারেশনের কথা শুনে বললাম, আমিও তোমার সাথে অপারেশনে যাব। পরদিন মাহবুব আর আমি চকবাজারে সেকান্দরের শেল্টারে উঠলাম। সেখানে মাহবুব তাঁর অস্ত্র ৯ এম এম কার্বাইন ও ৪টা ম্যাগজিন সেকান্দরকে দিলেন। আমাকেও একটা ৯ এম এম কার্বাইন সে দিলো। সম্ভবত ঈদের পূর্বদিনই ১৮ নভেম্বর আমরা অপারেশনটি করেছিলাম। অপারেশনের আগে আমরা শান্তুনুর বাসায় যাই। সেখানে শহরের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় এ কথা ওঠে আসে যে, ঈদের কারণে শহরে এখন কড়া পাহারা বসানো এবং বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি সৈন্যরা টহল দিচ্ছে। এমতাবস্থায় তখন অপারেশন না করার পক্ষে সবাই মতামত দিয়েছিলেন। আমি মাহবুবকে বলেছিলাম কেউ না করলেও চল তুমি আর আমি অপারেশনটা করি। মাহবুব আমার কথায় রাজি হয়। মোহাম্মদ হোসেন বাবুইয়ার ট্যাঙি করে আমরা রাজাকার ক্যাম্প আজম ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ আক্রমণ করার জন্য রওনা দিলাম। আমরা দুজনে সন্ধ্যা ৬টায় ইফতারের সময় এ ওয়ার্কশপে অতর্কিত আক্রমণ করি। আক্রমণের জন্য যে পরিকল্পনা স্থির হয়েছিলো তাতে মাহবুব দরজা দিয়ে আক্রমণ ওপেন করবে আর আমি জানালায় দাঁড়িয়ে তাকে কাভার দেব। কিন্তু প্যারেড কোণায় ট্যাঙি চলন্ত অবস্থায় দাঁড় করিয়ে দৌড়ে রাস্তা পার হয়ে আমরা যখন ওয়ার্কশপে পৌছে যার যার অবস্থান নিই, তখন দেখি মাহবুব দরজা দিয়ে ঢোকার সময় চৌকাঠে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেছে। আর সেটা দেখে ভিতর থেকে রাজাকাররা দাঁড়িয়ে তাকে ধরার জন্য দরজার দিকে ছুটে আসছে। আমি এ দৃশ্য দেখে এক মুহূর্তও দেরি না করে আমার কার্বাইন থেকে ব্রাশফায়ার করে যখন নিশ্চিত হলাম যে, ভিতরে আর কেউ অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে নেই, তখন মাহবুবকে নিয়ে দৌড়ে রাস্তা পার হয়ে ট্যাঙিতে উঠে দ্রুত সে স্থান ত্যাগ করে চলে আসি। পরদিন চট্টগ্রামের সংবাদপত্রে এই মর্মে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিলো যে, চন্দনপুরায় দুষ্কৃতকারীদের হামলায় ৬/৭জন নিহত হয়েছে।
সাকা চৌধুরীর ওপর হামলার দুদিন পর পাকিস্তানি সেনারা মাহবুবের ঘাটফরহাদবেগের বাড়ি রেইড করে এবং তাঁর মা-বাবার সাথে অত্যন্ত অশোভন ও অপমানজনক আচরণ করে। মাহবুবকে হাজির করার জন্য তার মা-বাবাকে আলটিমেটাম দিয়ে পাক সেনারা মাহবুবের পার্শ্ববর্তী আরেকটি শেল্টারে রেইড করে। সেই বাড়ি থেকে তারা মাহবুবের বড়ভাই এস এম শামসুল আলম ও তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং ঐ শেল্টার মাস্টার আবু বক্কর চৌধুরীকে রাতে পাক সেনারা গ্রেপ্তার করে এবং চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে নিয়ে গিয়ে অমানুষিক নির্যাতন চালায়। পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়ে তাদেরকে আধমরা করে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে হস্তান্তর করে। নির্যাতনে মারা গেছে ভেবে পাক সেনারা তাদের উভয়কে চট্টগ্রাম কারাগারে প্রেরণ করে। কারা হাসপাতালে দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর তারা জীবন ফিরে পান এবং দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মাহবুবরা তাদের কারাগার থেকে মুক্ত করে আনেন।
এর দুদিন পর পাকসেনারা খেজুরতলা মাস্টারপুল এলাকার আরও একটি শেল্টারে আবার রেইড করে এবং ঐ বাড়ির শেল্টার মাস্টার শহীদ তফজুল আলী, শহীদ আবু বক্কর লাবু ও শহীদ মো. কমর আলী- এ তিনজনকে ধরে নিয়ে যায়। মাহবুবকে হাজির করার জন্য তাদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়। তারা বলেছিল তারা মাহবুবকে চেনে না। মাহবুবের খোঁজ নেওয়ার জন্য পাক সেনারা এ তিনজনকে নির্মমভাবে নির্যাতন করে। আজ অবধি তাদের ব্যাপারে পরিবার তাদের কোনো খোঁজখবর পায়নি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাদের লাশও খুঁজে পায়নি পরিবারের সদস্যরা।
মাহবুব যেভাবে মুক্তিযুদ্ধে জড়িত হলেন : ১৯৪৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন এস এম মাহবুব উল আলম। তাঁর পিতা বিশিষ্ট ব্যবসায়ী হাজি মোহাম্মদ ইসহাক মিয়া। মাতা কুলছুমা খাতুন। ছয় ভাই দু’বোনের মধ্যে মাহবুব তৃতীয়।
মাহবুব ১৯৭৩ সালে ওয়াজেদিয়া থেকে এসএসসি ও ১৯৭৪ সালে সিটি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। তিনি ছাত্রজীবনে রাজনীতি করতেন, সে রাজনীতি বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতি। তাঁকে রাজনীতিতে দীক্ষা দেন ছাত্রলীগ নেতা শহীদ স্বপন চৌধুরী। স্বপন চৌধুরী পরে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক হয়েছিলেন। তিনি স্বাধীনতার পূর্বে ছাত্রলীগের কার্যকরি কমিটির সভায় স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ-এর প্রস্তাব উত্থাপন করে বিখ্যাত হন। মুক্তিযুদ্ধে তিনি দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কঙবাজারের বিএলএফ’র দায়িত্ব নিয়ে ভারত থেকে দেশে আসার পথে কাউখালিতে পাক বাহিনীর হাতে ধরা পড়লে তাকে হত্যা করা হয়।
১৯৬৬ সালের একটি দিনে হাজারি গলিতে স্বপন চৌধুরীর সাথে মাহবুবের দেখা হয়। সেদিন পরিচয়ের পর তিনি মাহবুবকে তাঁর দেওয়ান বাজারের বাসায় যেতে বললেন। মাহবুব তার বাসায় যাওয়ার পর স্বপন চৌধুরী তাকে এমএ আজিজের বাসায় নিয়ে যান। সেখানে শওকত হাফিজ খান রুশ্নি’র সঙ্গে দেখা। রুশ্নি তাঁর পাড়ার ছাত্র এবং তাঁর বন্ধু। সেদিন এমএ আজিজ তাঁকে রাজনীতির অনেক কথা বললেন। এভাবে মাহবুব রাজনীতির পথিক হয়ে যান। পরে তিনি রেস্ট হাউজেও যান এবং পুরোপুরি ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে পড়েন। শহরের যেখানে মিটিং-মিছিল হতো সেগুলোতে মাহবুব অংশগ্রহণ করতেন। হাজারী গলিতে কাজী মনিরুজ্জামান মন্টুর বাসা ছিলো, মন্টু তাঁর বন্ধু, সে সুবাদে মন্টুর বাসায় যাতায়াত করতেন মাহবুব। সেখানে এবিএম নিজামুল হক, রুশ্নি এবং শামসুদ্দিনও থাকতেন। ফুইক্যা জাফর, এনায়েত বাজারের সালাউদ্দিন, দীপক, বশরজ্জামান চৌধুরী মাহবুবের বন্ধু ছিলো। জাফর-বশর-দীপক হাজারী গলির মুখে শামী হোটেল থেকে নাস্তা করে ইপিআরের রসদ নিয়ে যাওয়ার পথে চেরাগী পাহাড়ে পাকিস্তানি নৌকমান্ডোদের অতর্কিত হামলায় শহীদ হন। শামী হোটেলে মাহবুবও তাদের সঙ্গে নাস্তা করেন, তারা মাহবুবকে ডেকেছিলো কিন্তু মাহবুব যায়নি। ফলে মাহবুব বেঁচে যায়।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মাহবুব হাজারী গলির মুখে বিনোদা ভবনে যান। সেখানে তাকে আখতারুজ্জামান বাবু একটি ল্যান্ড ক্রুজার জিপ দিয়ে বলেন, তুমি হালিশহরে ইপিআর’র জন্য রসদ নিয়ে যাও। জিএম চৌধুরী মাল তুলে দিতেন, মাহবুব গাড়ি চালিয়ে তা হালিশহরে যুদ্ধরত ইপিআরদের কাছে পৌঁছে দিতেন। শহরের পতন হলে মাহবুব, জামালখানের এহসানুল করিম, ঘাটফরহাদবেগের মহসীন ভারতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রাউজানে হায়দার মিয়া চৌধুরীর বাড়িতে যান। হায়দার সাহেবের জ্যেষ্ঠপুত্র দুলাল ছিলো মাহবুবের বন্ধু। কনিষ্ঠপুত্র এহসানুল হায়দার বাবুল বর্তমানে রাউজান উপজেলার চেয়ারম্যান। সেখানে পাঁচদিন থেকে তারা রামগড় যান। রামগড়ে সাবের আহমদ আসগরী, স্বপন চৌধুরী, গোলাম রব্বান, শওকত হাফিজ খান রুশ্নি, বোরহান, ওমর ফারুকের সঙ্গে দেখা হয় মাহবুবের। ২৮ এপ্রিল মাহবুব ফেনী নদী পার হয়ে ত্রিপুরার সাব্রুমে যান। সেখানে চট্টগ্রাম কলেজের ভিপি জালাল উদ্দিন, এসএম ইউসুফ, মিরসরাইর মুকুলের সঙ্গে দেখা হয়। স্বপন চৌধুরী তাকে একটা স্লিপ দিয়ে বললেন, স্লিপটা নিয়ে মেজর জিয়ার সঙ্গে দেখা কর। জিয়ার সঙ্গে দেখা করলে তিনি বললেন, রাত ১২টার সময় এখানে আসবে। রাতে গিয়ে দেখেন একটি ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে, মেজর জিয়া বললেন, ট্রাকে ওঠে যাও, তোমাকে ট্রেনিং-এ পাঠাচ্ছি। সে ট্রাক মাহবুবকে বগাফা নিয়ে গেলো। সেখানে ১৫দিন ট্রেনিং-এর পর ওম্পিনগর পাঠানো হলো ১ মাসের ট্রেনিং-এর জন্য।
ওম্পি নগর থেকে আবার হরিণা ক্যাম্পে নেওয়া হয়। সেখানে সেক্টর হেডকোয়ার্টারে মেজর জিয়ার কাছে রিপোর্ট করলে তিনি মাহবুবকে বললেন, চট্টগ্রাম সিটির মুক্তিযোদ্ধাদের একটি তালিকা দেওয়ার জন্য। মাহবুব তাঁকে ষোলজনের একটি তালিকা দিলে তিনি তাকে ঐ ষোলজনের গ্রুপ লিডার মনোনীত করেন। ২/৩ দিন পর তিনি নিজেই তাদের শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন এবং পাঁচদিনের ছুটি দেন বিশ্রামের জন্য। এ সময় মাহবুবকে কিছু টাকা-পয়সা এবং তালিকাভুক্ত সহযোদ্ধাদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ বুঝিয়ে দেন।
অতঃপর রামগড় দিয়ে তার গ্রুপ নিয়ে মাহবুব বাংলাদেশে ঢোকেন। হরিণা থেকে রামগড় হয়ে চট্টগ্রাম শহরে ঢুকতে তাদের সাত/আট দিন লেগে যায়। শহরে এসে প্রথম আশ্রয়কেন্দ্রে উঠলেন তার গ্রুপের মুক্তিযোদ্ধা পাথরঘাটার রফিকের বাসায়। দুই/তিনদিন সে বাড়িতে সবাই ছিলেন। এরপর মাহবুব গ্রুপ ভাগ করে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন শেল্টারে পাঠিয়ে দেন। ২য় শেল্টার ছিল তার বাসা অর্থাৎ হাজি ইসহাক মিয়া সওদাগরের বাড়ি। ৩য় শেল্টার ছিল ঘাটফরহাদবেগে বজলুর রহমান চৌধুরীর প্রতিষ্ঠিত চৌধুরী কলোনীতে আবু বকর চৌধুরীর বাসায়। ৪র্থ শেল্টার ছিল খেজুরতলা (মাস্টারপুল বাকলিয়া) শহীদ তফজল আলী সওদাগরের বাড়ি। ৫ম শেল্টার ছিল কোরবানীগঞ্জ মকবুল আলী সওদাগর (শেল্টার মাস্টার ছালামত আলী) বাড়ি । ৬ষ্ঠ শেল্টার ছিল বাকলিয়া হাজি ইব্রাহিম সওদাগরের বাড়ি (শেল্টার মাস্টার মো. ইউনুছ)। ৭ম শেল্টার ছিল চকবাজার জয়নগর সেকান্দার আলীর বাড়ি। ৮ম শেল্টার ছিল চন্দনপুরা আবু এন্ড কোম্পানিতে কাজী নুরুল আবছারের বাড়ি। ৯ম শেল্টার ছিল নন্দনকানন হাজি বাদশা মিয়া চৌধুরীর বাড়ি (শেল্টার মাস্টার ডা. মঈনউদ্দিন খান) । ১০ম শেল্টার ছিল আগ্রাবাদ ডা. জাফর আহমেদের বাড়ি (শেল্টার মাস্টার জাহেদ আহমদ, পাঠানটুলি)। ১১তম শেল্টার ছিল জয়নগর চকবাজার শান্তনু চক্রবর্তীর বাড়ি। মাহবুবের গ্রুপের মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ দিয়ে ষোলজনকে ১১টি শেল্টারে ভাগ করে দেওয়া হয়। কিছুদিন সবাই বিশ্রামে ছিলেন। এদের মধ্যে প্রায় আটজনকে তাদের মা-বাবার সাথে দেখা করার জন্য ছুটি দেওয়া হয়।
পাক সেনাদের তৎপরতা তখন খুব একটা জোরদার ছিল না বলে তারা প্রায় আঠারো/বিশ দিন চুপচাপ ছিলেন এবং এখানে-সেখানে চলাফেরা করেছিলেন। তারপর তার গ্রুপ সদস্যরা একত্রিত হয় এবং ভারত থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের আরও বিভিন্ন গ্রুপ দেশে ঢুকতে শুরু করে। এ পর্যায়ে ইঞ্জিনিয়ার আফছার উদ্দিন মোহাম্মদ আলী ও মৌলভী সৈয়দ আহমদ যৌথভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ পরিচালনা করার জন্য সিটি কমান্ড গঠন করেন এবং এ দুজনের যৌথ কমান্ডের অধীনে সকল মুক্তিযোদ্ধা সামগ্রিকভাবে বিভিন্ন অপারেশনে অংশগ্রহণ করেন। মাহবুবের গ্রুপের তৎপরতার উল্লেখযোগ্য দিক ছিল তারা একই দিনে শহরের বিভিন্ন স্থানে ১২টি গ্রেনেড চার্জ করে শহরময় ত্রাস সৃষ্টি করে জানান দিয়েছিলেন যে মুক্তিযোদ্ধারা শহরে ঢুকে পড়েছে এবং অপারেশন শুরু করেছে।
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক

x