চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ড কর্মকর্তা কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক

বৈঠকে করোনা আক্রান্ত বৃদ্ধার ছেলের উপস্থিতি

আজাদী প্রতিবেদন

বৃহস্পতিবার , ২৬ মার্চ, ২০২০ at ৪:৩১ পূর্বাহ্ণ
93

এইচএসসি পরীক্ষা উপলক্ষে পরীক্ষা কেন্দ্রের কেন্দ্র সচিবদের নিয়ে কয়েক দফায় মতবিনিময় সভা করেছে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ড কর্তৃপক্ষ। ২২ মার্চ (রোববার) মতবিনিময় সভা হয় কক্সবাজার অঞ্চলের কেন্দ্র সচিবদের নিয়ে। ওই সভায় অংশ নেন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত সৌদি ফেরত নারীর এক ছেলে। তিনি কক্সবাজারের একটি কলেজের অধ্যক্ষ। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর শঙ্কা ভর করেছে শিক্ষাবোর্ড জুড়ে। নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ভীত হয়ে পড়েছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এ ঘটনায় অনেকেই নিজ থেকেই কোয়ারেন্টাইন ও আইসোলেশনে গেছেন।
শিক্ষাবোর্ড সূত্রে জানা যায়- ২২ মার্চ সভাটি হয় বোর্ড চেয়ারম্যানের কক্ষে। সেখানে চেয়ারম্যান প্রফেসর প্রদীপ চক্রবর্তী, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক নারায়ন চন্দ্র নাথসহ বোর্ডের আরো কয়েকজন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। আর কক্সবাজার অঞ্চলের ১৭টি কেন্দ্রের কেন্দ্র সচিবরা এতে অংশ নেন। যদিও কয়েকজন কেন্দ্র সচিব অনুপস্থিত ছিলেন বলে জানান পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক নারায়ন চন্দ্র নাথ। করোনা আক্রান্ত কক্সবাজারের ওই নারীর ছেলে কেন্দ্র সচিব হিসেবে ওই বৈঠকে অংশ নেন। বিষয়টি স্বীকার করে বোর্ড চেয়ারম্যান বলেন, আমরা দুরত্ব বজায় রেখেই বসেছি। আতঙ্কের কিছু নেই। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কোয়ারেন্টাইনে যাওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন বলে জানান তিনি। তবে বোর্ড কর্তৃপক্ষ অভয় দিলেও শঙ্কার কথা জানিয়েছেন ওই বৈঠকে অংশ নেয়া অন্যান্য কেন্দ্র সচিবরা। ঝুঁকির কথা বলেছেন বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও।
তাঁরা বলছেন- ওই কেন্দ্র সচিবের সাথে বৈঠকে যারা অংশ নিয়েছেন তাঁরা সবাই একে অপরের সাথে কুশল বিনিময় করেছেন। আর যে দুরত্বের কথা বলা হচ্ছে, প্রকৃতপক্ষে সেটি ঠিক নয়। কারণ, চেয়ারম্যানের কক্ষটি ততো বড় নয় যে, সেখানে ১৫-২০ জন দূরে-দূরে বসতে পারবেন। প্রতিবার কেন্দ্রসচিবদের নিয়ে মতবিনিময় হয় বোর্ডের নবম তলায় হল রুমে। সেখানে হলে যথেষ্ট দুরত্ব বজায় রেখে বসানো যেতো। কিন্তু এবার হয়েছে চেয়ারম্যানের কক্ষে। যেখানে তেমন দূরত্বে বসানোর সুযোগ নেই।
বিষয়টি জানতেন না বলেই ওনাকে বৈঠকে অংশ নিতে দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক নারায়ন চন্দ্র নাথ। তিনি বলেন, সভা হয়েছে ২২ তারিখ। কিন্তু করোনা সংক্রমনের বিষয়টি জানা গেছে ২৪ তারিখ। আমরা তো জানতাম না ওনার মা করোনায় আক্রান্ত। তাই এমন হয়েছে। তবে কাল (বৃহস্পতিবার) থেকে এমনিতেই সব বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, যার কারণে সবাই কোয়ারেন্টাইনে থাকতে পারবেন বলেও জানান পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক। তবে বোর্ডের বৈঠকে যোগ দেয়ার আগেরদিন (২১ মার্চ) ফোন করে উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক নারায়ন নাথকে মায়ের অসুস্থতার বিষয়টি অবহিত করেন বলে জানান কক্সবাজারের ওই নারীর ছেলে (কেন্দ্র সচিব)।
তবে রোববারের ওই বৈঠকের পর সোমবার (২৩ মার্চ) উত্তর জেলার কেন্দ্রগুলোর সচিবদের নিয়েও বৈঠক করে শিক্ষাবোর্ড কর্তৃপক্ষ। সেখানেও অন্তত ২০-২৫ জন কেন্দ্র সচিব অংশ নেন। আর চেয়ারম্যান ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকসহ যথারীতি বোর্ডের কয়েকজন কর্মকর্তা বৈঠকে ছিলেন। এসব বৈঠকে অংশ নেয়া কেন্দ্র সচিবরাও ঝুঁকির কথা বলেছেন। তাঁরা বলছেন- রোববারের বৈঠকে বোর্ডের যেসব কর্মকর্তারা ছিলেন, সোমবারের বৈঠকেও তাঁরা ছিলেন। কোন ভাবে যদি এদের একজনের মাঝেও ভাইরাস সংক্রমিত হয় তবে সবাই তো ঝুঁকিতে। এছাড়া বৈঠকে উপস্থিত থাকা বোর্ডের কর্মকর্তাদের কক্ষে বিভিন্ন কাজে বোর্ডের প্রায় সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে যেতে হয়। এতে করে রোববার থেকে (বুধবার) টানা চারদিন এসব কর্মকর্তাদের কারো না কারো কাছে যাওয়ার ঘটনা বোর্ডের অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য খুব অস্বাভাবিক নয়। এ নিয়েই বেশি ভীতি কাজ করছে বোর্ডের অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে। বৈঠকে অংশ নেয়া কর্মকর্তারাও এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। আশঙ্কা থেকে বোর্ডের সচিব প্রফেসর আব্দুল আলীম ইতোমধ্যে আইসোলেশনে গেছেন। যা তিনি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে জানিয়েছেন। আরো বেশ কয়জন কর্মকর্তা কোয়ারেন্টাইনে থাকছেন বলে জানিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন- বিষয়টি জানার পর খুব দুশ্চিন্তা কাজ করছে। এখন বাসায় পরিবারের সদস্যদের নিয়েও টেনশান হচ্ছে।
যদিও এঘটনায় বোর্ডের পরীক্ষা শাখাকে দোষারোপ করছেন বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাঁরা বলছেন- দেশের দুর্যোগকালে যেখানে সবকিছু বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, সেখানে কেন্দ্র সচিবদের নিয়ে এই বৈঠক স্থগিত করে পরে করলেও চলতো। এছাড়া এইচএসসি পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়েছে। এর আগেই সব ধরণের সভা-সমাবেশ, এমনকি সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মানুষের জড়ো হওয়ায় নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। একদিন আগে সোমবারের নির্ধারিত মন্ত্রীসভার বৈঠক পর্যন্ত স্থগিত করে সরকার। এমন পরিস্থিতিতে কেন্দ্র সচিবদের এ বৈঠক স্থগিত না করে বোর্ড পরিপক্কতার পরিচয় দেয়নি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এমন সময়ে বৈঠক করাটা সঠিক হয়নি বলে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বিও। যদিও আগে থেকেই নির্ধারিত থাকায় এবং দূর থেকে কেন্দ্র সচিবরা চলে আসায় বৈঠক করতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন বোর্ড চেয়ারম্যান প্রফেসর প্রদীপ চক্রবর্তী।
কিন্তু রোববারের পর সোমবারও আরো একটি বৈঠক করেছে বোর্ড কর্তৃপক্ষ। এতে পরীক্ষা শাখার দায় দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এই অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্তের কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারী সবাই এখন ঝুঁকিতে বলেও আক্ষেপ বোর্ড সংশ্লিষ্টদের।
পাশাপাশি দুই বৈঠকে অংশ নেয়া প্রায় ৩০-৩৫ জন কেন্দ্র সচিবও তাদের পরিবার নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন।
প্রসঙ্গত, ওই কেন্দ্র সচিবের বৃদ্ধা মা ওমরাহ শেষে সৌদি আরব থেকে ফিরে নগরীর বহদ্দারহাটের নিউ চান্দগাঁও আবাসিক এলাকায় ছোট ছেলের বাসায় উঠেন। সেখানে একরাত থাকার পর এলাকায় চলে যান। পরে কক্সবাজারে এই ছেলের বাসায় যান ১৭ মার্চ। ১৭ মার্চ থেকেই কলেজের এই অধ্যক্ষ এবং তাঁর পরিবার মায়ের সান্নিধ্যে ছিলেন। পরে অসুস্থ বোধ করলে তাঁকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ২৪ মার্চ পরীক্ষার রিপোর্টে ওই নারীর শরীরে করোনাভাইরাসের অস্তিত্ব ধরা পড়ে। এরপর কক্সবাজারের ওই বাড়ির পাশাপাশি নগরীতে ছেলেদের দুটি বাসা লকডাউন ঘোষণা করে প্রশাসন। তাঁরা এখন সবাই লকডাউন অবস্থায় কোয়ারেন্টাইনে আছেন।